আওয়ামী যুব মহিলা লীগের সদ্য বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউর নামে-বেনামে ঢাকায় ও নরসিংদীতে বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়িসহ বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। পাপিয়া ছিলেন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠজন। এ ঘনিষ্ঠতার সূত্রে অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি। পুলিশের এসআই পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থও হাতিয়ে নিয়েছেন পাপিয়া। এ ছাড়া অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে তিনি বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। পাপিয়া এখন টক অব দ্য সিটি বা কান্ট্রি তো বটেই সারা বিশ্বের বাঙালি বাংলাদেশিদের ঘরে ঘরে আলোচনারও বিষয়। পাপিয়া কে, পাপিয়া কী এবং পাপিয়া কেন? এ প্রশ্ন যত সহজ উত্তর তত কঠিন। দেশে গিয়ে আমি বদ্ধমূল ধারণা পেয়েছি আর যা কিছুর অভাব থাক নেশার মাদক, বিকৃত লালসার সামগ্রী আর অর্থের কোনো অভাব নাই। এ উপচে পড়া জঞ্জালের ওপর তলার এক চরিত্র পাপিয়া।
প্রয়াত লেখক বুদ্ধিজীবী ওয়াহিদুল হকের কাছে শোনা একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি অসাধারণ বিশ্লেষণ জানতেন। তার মতে, বাঙালি ঘরে ঘরে নানা চিন্তা আর্থিক অনটন টেনশনের কারণে ক্লান্ত স্ত্রীর ছিপছিপে শরীরে যখন একঘেয়েমিবোধ করে তখন তার পছন্দ অন্যদিকে যায়। আজকাল নারীবাদীদের যুগ। তারা কোন কথা যে কোথায় টেনে নিয়ে দাঁড় করায় বোঝা মুশকিল। কিন্তু এটা মূলত স্থুলতা প্রিয়তার একটা কারণ ছাড়া আর কিছু না।
পাপিয়া দেখতে তেমন এক রমণী। তাতে আপত্তির কিছু নাই। কিন্তু তাকে দেখে স্পষ্টই বোঝা যায়, তার জীবনে সুখের সীমা ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে পাপিয়া কীভাবে এত শক্তিধর হয়েছিল? কারা ছিল এর নেপথ্যে? আমরা কিছুদিন থেকেই দেখছি এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অনিবার্যভাবে যুবলীগের নাম যোগ হচ্ছে। যুবলীগ সংগঠনটা আসলে কতটা দরকারি? আমরা বিএনপি আমলেও দেখতাম যুবদল নামে সংগঠনের উৎপাত। বিএনপি বিপাকে পড়ার পর এরা ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার নৃশংস রাতে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনিও সস্ত্রীক নিহত হয়েছিলেন। সেদিনও আমরা যুবলীগের কোনো চিহ্ন দেখিনি। মাঠে নামেনি কেউ। এসব ইতিহাস সত্য হওয়ার পরও যুগ যুগ ধরে যুবলীগ-যুবদল চলে আসছে। এবার দেখছি মূল দল আওয়ামী লীগের নেতাদের নামে যত অপবাদ বা অপকীর্তি তার চৌদ্দগুণ বেশি যুবলীগ নিয়ে। মহিলা যুবলীগের অস্তিত্বই আমার কাছে কেমন কেমন লাগে। নামের মতো খটকা পূর্ণ। এর পেছনে যারাই থাকুক এটি একটি শাখা সংগঠন ছাড়া আর কিছুই না। যেখানে এখন কর্মী-সমর্থক বা নেতার চেয়ে শাখামৃগের সংখ্যাই বেশি মনে হচ্ছে।
এর বদনাম আর একের পর এক ক্যাসিনো কাণ্ড, ভিসি পর্বের পর এবার যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা কি এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে না মূলত মাথার ওপর শক্ত নেতৃত্বের সরাসরি প্রভাব বা ছায়া না থাকাতেই এমন বেপরোয়া সবকিছু? খেয়াল করবেন মূল দলের মাথার ওপর আছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যার চোখে পড়ে না এমন কিছুই নাই। হয়তো সে কারণে মূল দলে নিয়ম শৃঙ্খলা ভাঙা কঠিন। কিন্তু যুবলীগে সহজ। তাই অনুমান করা যায় বহু এলিট নন এলিট আর ডাকসাইটে লোকজন সেখানেই তাদের মনের আশা চরিতার্থ করতেন। আমাদের রাজনীতি ও সমাজ বাস্তবতায় এদের ধরা যায় না। তাই অলৌকিক কিছু না ঘটলে পাপিয়ার আসল জবানবন্দি বা মনের কথা আমজনতা জানতে পারবে না।
যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কিংবা আওয়ামী বিরোধিতার কারণে ঢালাওভাবে বড় বড় নেতাদের দিকে আঙুল তুলছেন তাদের মতলবও বুঝি। এখনকার সময়ে কারও সঙ্গে ছবি থাকা কোনো ঘটনা না। তা ছাড়া ফটোশপ পারে না এহেন কোনো কাজ নাই। ফটো দিয়ে কোনো কিছু প্রমাণ হয় না। তবে চাইলেই আসল দায়ীদের খুঁজে বের করা সম্ভব। যা হওয়ার না বলেই ধরে নিতে পারি। আর যারা এ সুযোগে পাপিয়ার নাম করে নারী জাতির ওপর বিষ ঢালছেন তাদের বলব নিজের চেহারা আয়নায় দেখুন একবার। নিজের ফেসবুক ইনবক্সটাও দেখুন। তারপর কথা বলুন। ঢালাওভাবে নারীকে গালাগাল করে পাপিয়াকে অন্ধকার জগতের নেতা বলাও অপরাধ। ভাষা অসংযত করার ভেতর নিজের গ্লানি আর নিচুতা ছাড়া কিছু নাই।
মূলত এটি এখন আমাদের সামাজিক রোগ। রাজনৈতিক আবরণে ঢাকা অপরাধ জগতের এক বাস্তবচিত্র। এখানে কে খদ্দের আর কে যে দেয় তাও বোঝা মুশকিল। সবমিলে মিশে একাকার। ভয়টা এই এসব অপরাধের পেছনে আছে বড় বড় মানুষরা। সমাজে এখন যেকোনো বয়সি গার্ল ফ্রেন্ড থাকা ইজ্জতের ব্যাপার। এ তালিকায় কে নাই? আমলা থেকে লেখক শিল্পী রাজনীতিবিদ সবাই আছেন। হঠাৎ খুলে যাওয়া মিডিয়া আর সামাজিক মিডিয়ার হাত ধরে ঢুকে পড়েছে নানা উপকরণ। আগে যা আড়ালে আবদালে হতো তার প্রকাশ্য এক রূপের নাম পাপিয়া। আমি কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিনন্দন জানাতে চাই। তারা যেভাবেই হোক রাজনীতি বড় মানুষের চাপ বা দম্ভ ও পাওয়ারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাপিয়াকে ধরেছে। আর সে কারণেই আমরা জানতে পেরেছি।
ভয় হয় আগামী প্রজন্মকে নিয়ে। ভয় আমাদের সামাজিক দিকটায়। এভাবে যদি যৌনতা আর পাপ আমাদের মজ্জাগত হতে থাকে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যৎ? তখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন কি অকেজো ও ঠুনকো মনে হবে না? আমরা নিশ্চয়ই থাইল্যান্ডের কথা মনে রাখব। মনে রাখব সেসব সমাজের কথা যেখানে আয় উন্নতি থাকলেও মূল্যবোধ আর নৈতিকতার অভাব প্রকট। আমাদের বড় শক্তি পরিবার সমাজ আর নৈতিকতা। সে পাপ-পুণ্যবোধ যদি এভাবে আক্রান্ত হয় আর তার পাহারাদার হিসেবে থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার হয় রাজনীতি সমাজ কি আদৌ ঠিক থাকবে? পাপিয়া রহস্যের বেড়াজাল
ভেদ হোক। মানুষ জানুক কারা এর পেছনে। তাহলেই গড়ে উঠবে প্রতিকার। তা কি
হবে আদৌ? আমরা চাই পাপিয়ার কাছ থেকে সত্য উন্মোচিত হোক।।
