পরকীয়া নিঃসন্দেহে দাম্পত্য জীবন, সন্তান-সন্ততির ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি। এটি নিজের বৈধ স্ত্রীর/স্বামীর সাথে আমানতের খেয়ানত, প্রতারণা ও জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের অবমূল্যায়ন। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ হয়। স্বামী-স্ত্রীর কেউ এই অসামাজিক কাজে জড়িয়ে গেলে ইসলাম তাকে তা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছে। এক্ষেত্রে উভয়ই কিছু নির্দেশনা মানলে আশা করি, পরকীয়া থেকে বাঁচা সম্ভব হবে-
১. আল্লাহমুখী হওয়া: বান্দার ওপর যেকোনো বিপদ আসলে মনে করতে হবে, নিজের কোনো বদ আমলের কারণে তা এসেছে। তাই তার প্রধান কর্তব্য হলো, আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। তার কাছে কাকুতি-মিনতি করা ও কান্নাকাটি করা। খাঁটি দিলে তওবা করা। নিজের আমলকে সংশোধন করা। সাধ্য অনুযায়ী দান খায়রাত করা।
২. হেদায়েতের জন্য দোয়া করা: মনে রাখতে হবে বান্দার কলব আল্লাহর দুই কুদরতি আঙ্গুলের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে। মুহূর্তেই তার দিলকে আল্লাহ তায়ালা পরিবর্তন করতে সক্ষম।
৩. পছন্দনীয় কাজগুলো বেশি বেশি করা, অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা: যে কাজগুলো জীবন সঙ্গীর কাছে অপছন্দীয় তা থেকে বিরত থাকা। পছন্দনীয় কাজগুলো অধিক পরিমাণে করার চেষ্টা করা। যথাসাধ্য তাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা। দাম্পত্য জীবনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক স্বামী-স্ত্রী এ বিষয়ে অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে সময়ের ব্যবধানে তারা দাম্পত্য জীবনের উষ্ণতা ও আবেদন হারিয়ে ফেলে। ফলে দুজনের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে ঈমানী দুর্বলতা, কুপ্রবৃত্তির তাড়না এবং শয়তানের কুমন্ত্রণায় তারা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।
৪, সহনশীল হওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা: যখন টের পাবে যে, তার সঙ্গী পরকীয়ায় জড়িয়ে গেছে তখন সে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিবে। বুঝেও না বোঝার ভান করবে। তার সাথে অতিরঞ্জন-বাড়াবাড়ি এবং রাগারাগি করবে না। আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রকাশ করবে। সহনশীলতা ও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেবে।
৫. কোমল ও নম্র ভাষায় বোঝানো: সঙ্গীকে পরকীয়া, অবৈধ প্রেম-প্রীতি ও যিনা-ব্যাভিচারের ভয়াবহতা ও পরিণতি, আল্লাহর অসন্তুষ্টি, পরকালে কঠিন শাস্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো নম্র ও কোমল ভাষায় বোঝাবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হবে-কোন দ্বীনি পরিবেশে কিছু দিন অবস্থান করা।
৫. উভয় পক্ষের সালিশ ডাকা: স্বামী-স্ত্রী নিজেরা পরস্পর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তারা তাদের হিতাকাঙ্খী ও দূরদর্শী অভিভাবকদের শরণাপন্ন হবে অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী উভয় পক্ষের মুরব্বিরা বসবেন। বসে তারা উভয়ের বক্তব্য ও অভিযোগগুলো শুনবেন। যাকে ধমক দেয়া দরকার, শাসানো দরকার তা করে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবেন। অভিভাবকরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করলে আল্লাহ তায়ালা এই সালিসের বদৌলতে অবশ্যই তাদেরকে সংশোধন করে দেবেন এবং তাদেরকে সুখী দাম্পত্য জীবন দান করবেন।
৬. বিবাহ বিচ্ছেদ: এগুলোর মাধ্যমে কোনো উপকার না হলে সন্তানাদির দিকে তাকিয়ে হলেও ধৈর্য ধারণ করবে এবং জীবন সঙ্গীকে পরকীয়া থেকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলে অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদের পথে হাঁটবে। তবে সেক্ষেত্রেও শরীয়ত নির্দেশিত পন্থা অবলম্বন করবে।
দুজনের যে পরকীয়ায় জড়িয়ে গেছে সে নিন্মোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে
১. নিজেকে প্রশ্ন করুন: কেন আল্লাহ তায়ালা আমাকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন? কতদিন এখানে থাকবো? তারপর আমার ঠিকানা কোথায় হবে? কোন মরিচিকার পেছনে আমি দৌড়াচ্ছি? ক্ষণিকের সুখ-শান্তির জন্য চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি কেন আমি জলাঞ্জলি দিচ্ছি?
২. নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: কেন আমি অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি? তার দেহ উপভোগের জন্য নাকি মানসিক প্রশান্তির জন্য? সে আবেগ কতদিন থাকবে? বরং সেখানে মিলবে সামাজিক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, তিরস্কার ও ভৎর্সনা। তার কাছে যা আছে এখানেও তো তাই রয়েছে। বরং এটা বৈধ আর ওটা অবৈধ। মনে রাখবেন, আত্মিক প্রশান্তি আল্লাহর দান। আর তা কেবল অনুগত বান্দাকেই তিনি দান করেন।
৩. নিজের এবং সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করুন: তৃতীয় ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার পরিণতি কী হতে পারে, নিজের সন্তানাদির ভবিষ্যৎ কী হবে? সন্তান আল্লাহ পক্ষ থেকে দেয়া এক মহান নেয়ামত ও আমানত। এর যথাযথ হেফাজত করতে না পারলে পরকালে আল্লাহর আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তখন আপনাকে কে রক্ষা করবে? সেটা ভেবে দেখুন। নিজেকে বোঝান, পরকীয়ার ফলে শুধু দুটো সম্পর্কই নয়, দুটো পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাস্তবের মাটিতে পা রেখে সিদ্ধান্ত নিন।
৪. সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করুন:যারা পরকীয়া করে অন্যত্র চলে যায় তারা সামাজিকভাবে ছোট হয়ে যায়। নিজের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী কেউ তাদেরকে ভালো চোখে দেখে না। ফলে দুনিয়া প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার কাছে সংকুচিত মনে হয়। এমনকি তারা একসময় আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথ অবলম্বন করতে করতে বাধ্য হয়। ফলে এ জগতেও শান্তি পায় না, পরকালেও শান্তি পাবে না।
৫. নিজেকে দোষ দেবেন না: ভুল সবারই হয়। এবার আপনারও হয়েছে। তবে এ নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করে অবসাদে চলে যাবেন না। বরং নতুনভাবে সংসার শুরু করুন। আপনি চাইলে এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য অভিজ্ঞজন থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।
৬. সঙ্গীর সাথে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করুন: পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসার সবচেয়ে বড় উপায় হলো, কোনো লুকোছাপা না করে সঙ্গীর সাথে কথা বলা, নিজের আকাঙ্ক্ষাগুলোর কথা জানানো। খোলাখুলি কথা বলা। নিজের জমানো দুঃখগুলো প্রকাশ করা। কারণ পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন। সঙ্গীকে সব কথা খুলে বলার মতো মানসিক জোরও থাকে না। প্রয়োজনে বিশ্বাসযোগ্য কোনো মানুষকে সবটা খুলে বলা। তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা।
যারা এই সমস্যায় জর্জরিত আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তা থেকে বের হয়ে আসার এবং সুখময় দাম্পত্য জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন
লেখক : মুফতি ও মুহাদ্দিস, শেখ জনূরুদ্দীন রহ: দারুল কুরআন মাদরাসা
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।
