বাংলাদেশে পাটকে বলা হয় সোনালি আঁশ। কারণ এই পাট দেশে এবং বিদেশে রফতানি করার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে। কিন্তু বর্তমানে নানা রকম অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে পাটশিল্প আস্তে আস্তে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। সারা বিশ্বে আঁশ উৎপাদনকারী ফসল হিসেবে তুলার পরেই পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসল দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪৫ লাখ কৃষক পাট চাষাবাদ করছে এবং তা থেকে উৎপাদিত আঁশ বিদেশে রফতানি করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৪ শতাংশ অর্থাৎ ১ বিলিয়ন ডলার আসে পাট ও পাটজাতীয় পণ্য থেকে। বাংলাদেশের জলবায়ু পাট উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। বাংলাদেশের উৎপাদিত পাটের আঁশ বিশ্বমানের। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি করে থাকে।
দেশের কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এখনও পাট শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু এরই মধ্যে সরকার পঁচিশটি পাটকল বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা, ক্ষতিগ্রস্ত হন পাটকলের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরা। পাটের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। পাট পরিবেশ বান্ধব, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য আঁশ। টেক্সটাইল প্রচলিত বয়ন শিল্পে পাটের উল্লেখযোগ্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে- সুতা, পাকানো সুতা, বস্তা, চট, কার্পেট ব্যাংকিং ইত্যাদি। পর্দার কাপড়, কুশন কভার, কার্পেট, ইত্যাদি পাট থেকে তৈরি হয়। পাটখড়ি পাট চাষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। পাট আঁশের দ্বিগুণ পরিমাণ খড়ি উৎপাদিত হয়। ঘরের বেড়া, ছাউনি এবং জ্বালানি হিসেবে খড়ির ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি পাট থেকে জুট পলিমার যা ‘সোনালি ব্যাগ’ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের অনেক এলাকায় পাটের কচি পাতাকে শাক হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। সুতরাং আমরা এক কথায় বলতেই পারি- পাটের সব অংশই ব্যবহারযোগ্য। পাট যে জমিতে উৎপাদন করা হয়, সে জমিতে ৬০ শতাংশ পাতা ঝরে পড়ে এগুলো পচে জৈবসার উৎপাদন করে যা মাটিকে উর্বর করে এবং পরবর্তী ফসল উৎপাদনের জন্য অনেক সহায়ক হয়। পাটের আঁশ বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
আবার পাটের আঁশ দিয়ে উৎপাদিত বিভিন্ন সুতা, ব্যাগ এবং কাপড় এগুলো দ্বারা আমরা অনেক উপকৃত হই। এসব পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সরকার ইতোমধ্যে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পলিথিনের পরিবর্তে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিতকরণের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাই পাটের এই হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে পাট শিল্পকে আবারও জাগ্রত করতে হবে এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য ফিরিয়ে দিতে হবে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের গবেষণার ফলে কৃষকদের বিভিন্ন রকম পরামর্শ এবং আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে পাট উৎপাদনে বেশি করে সংশ্লিষ্ট করতে হবে এবং তাদেরকে পরামর্শ দান করতে হবে। তাহলে আমাদের পাটশিল্প আবার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
পাট শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রচুর মানুষের আবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, কৃষকদের মুখে হাসি ফুটবে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হবে। সুতরাং সরকারের উচিত এসব বিষয়গুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা তাদেরকে সঠিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে এসে এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা করা যাতে করে পাটশিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ জন্য সরকারকে বিশ্ব পাটবাজারে চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পাট ও পাট পণ্য উৎপাদন, উচ্চ ফলনশীল জাত ও উন্নতমানের পাট চাষে পাটচাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং পাটচাষিদের ন্যায্যমূল্য প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকে সহায়তা প্রদান; পাট ও পাটপণ্যের বাজার সংরক্ষণ করে ওই পাটপণ্যের জোগান বাড়ানোসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
সর্বোপরি, দেশের কৃষক, শ্রমিকদের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে, দেশের উন্নতির ও অর্থনীতির চাকা সচল করার লক্ষ্যে সোনালি আঁশের দেশ বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য আবার তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাক- সর্বদা এই কামনা আমাদের।

