পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে গাজীপুর ও ঢাকার আশুলিয়া যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বেতনভাতা ও কারখানা খোলার দাবিতে গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ করে মিছিল, সমাবেশ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। আর আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে এবং বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। দেশজুড়ে করোনা পরিস্থিতির সতর্কতার মধ্যেই আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর পার্শ্ববর্তী দুই এলাকা এমন উত্তাল হয়ে ওঠে।
গাজীপুরে লে-অফ ঘোষণা করা এক পোশাক কারখানা চালু করার নির্ধারিত তারিখ ঘোষণা এবং শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করে। ওই কারখানার উত্তেজিত শ্রমিকরা পার্শ্ববর্তী কয়েকটি কারখানা ভাঙচুর করেছে। এসময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা তিনটি মোটরসাইকেল, আটটি বাইসাইকেল এবং টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশসহ অন্তত আট সদস্য আহত হয়েছেন। শিল্প পুলিশ ২৫ রাউন্ড টিয়ার শেল ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) সুশান্ত সরকার জানান, গত ৩১ মার্চ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গাজীপুর মহনগরীর ভোগড়া এলাকার স্টাইলিশ গার্মেন্টস কারখানা কর্তৃপক্ষ ১ এপ্রিল থেকে লে-অফ ঘোষণা করে। অথচ কারখানাটি ১ এপ্রিলের পরও কিছুদিন পর্যন্ত উৎপাদন অব্যাহত রেখেছিল। কারখানা কবে নাগাদ খোলা হবে তার ঘোষণা দেয়নি মালিকপক্ষ। কারাখানাটি লে-অফ করার আগে ৩০ জন শ্রমিকের বেতন এবং ৮০ জন স্টাফের ৬০ শতাংশ বেতন বকেয়া ছিল। শ্রমিকরা ওই কারখানা চালু করার নির্ধারিত তারিখ ঘোষণা এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতাসহ পাওনা পরিশোধের দাবিতে রবিবার বিক্ষোভ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে।
তিনি আরও জানান, তাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় এবং মালিকপক্ষের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা সোমবার সকাল ৮টার দিকে কারখানার সামনে এসে জড়ো হতে থাকে। কারখানায় কাজ না থাকায় লে-অফ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এরপরও শ্রমিকেরা কারখানা খোলা ও কিছু শ্রমিকের বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ ও অগ্নিসংযোগ করে। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) জালাল উদ্দিন জানান, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার পার্শ্ববর্তী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় বিক্ষোভকারীরা স্টাইলিশ কারখানার পাশের ভলমন্ট ফ্যাশন, ক্রাউন ফ্যাশন, টেকনো ফাইবার পোশাক কারখানার কর্মরত শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায় এবং ওইসব কারখানায় ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে ওই কারখানাগুলোর দরজা-জানালার কাচসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর হয়। একপর্যায়ে তারা ক্রাউন ফ্যাশন কারখানার সামনে মহাসড়কের পাশে পার্কিং করে রাখা তিনটি মোটরসাইকেল ও আটটি বাইসাইকেলে জড়ো করে সেগুলোতে অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অবরোধকারীদের মহাসড়কের ওপর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ করে ঢিল ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ অবরোধকারীদের লাঠিচার্জ ও ধাওয়া করলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এতে পুলিশসহ অন্তত আট জন আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২৫ রাউন্ড টিয়ার শেল ছুড়ে বেলা ১১টার দিকে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। যার কারণে দুই পাশেই মালবাহী যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির জট লেগে যায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে বেলা ১১টার দিকে ফের যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
এদিকে আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে তিনটি কারখানা বন্ধ ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। অন্যদিকে কারখানার চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবিতে আশুলিয়ায় ও সাভারে বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে একটি কারখানার শ্রমিকরা। সোমবার সকালে আশুলিয়ার জামগড়া, ইউনিক, নরসিংহপুর ও সাভারের উলাইল এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকরা জানান, সোমবার সকালে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার শারমিন গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ার পর পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই এমন অভিযোগ তুলে কারখানা থেকে বের হয়ে যান। অন্যদিকে ইউনিক এলাকার আঞ্জুমান অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরাও কাজে যোগ দেওয়ার পর বের হয়ে যান এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ তোলেন।
নরসিংহপুর এলাকার হা-মীম গ্রুপের শ্রমিকরা সকালে কারখানায় গিয়ে কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। কারখানাটির মূল ফটকের সামনে আন্তর্জাতিক ক্রয় আদেশ বাতিল, শ্রমিকদের নিরাপত্তা আর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে জামগড়ার নেক্সট কালেকশন নামের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা আজ সোমবার সকালে কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে কাজ না করে কারখানা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ করতে চাইলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। পরে শ্রমিকরা বাড়ি চলে যান।
এছাড়া আশুলিয়ার সিগমা ফ্যাশনসের ছাঁটাইকৃত শ্রমিকরা সকালে কারখানার মূল ফটকের সামনে জড়ো হয়ে তাদের চাকরি পুনর্বহাল ও কারখানা চালু দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। অন্যদিকে সাভারের উলাইল এলাকার কে এল ডিজাইন কারখানার শ্রমিকরা বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতেও বিক্ষোভ করেন।
একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ শুধু হাত ধোয়া ও মাস্কের ব্যবস্থা করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কাজে যোগ দিতে বললে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ করেন।
বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম মানছে না অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ কারণেই শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ করছেন। কারখানার মালিকপক্ষকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শ্রমিকদের কাজে ফেরোনোর আহ্বান জানাই।’
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর সহকারী পুলিশ সুপার জানে আলম বলেন, ‘কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ না করে বের হয়ে চলে গেছেন। তবে কারখানায় পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকপক্ষের। এসব বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ জানালে আমরা খোঁজ নিয়ে সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এছাড়া যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়েছে।’
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।
