Site icon News Tangail | নিউজ টাঙ্গাইল

শিক্ষক সংকট-সেনিটেশনসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত মাধ্যমিক শিক্ষা

শিক্ষক সংকট, অবকাঠামো সংকট, সেনিটেশনের অসুবিধাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা। চিকিৎসা, সেনিটেশন ব্যবস্থাসহ নানা ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে দেশের মাধ্যমিক স্তরের সরকারি- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর। শিক্ষার মানোন্নয়নের নানা দিকেও ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তুলনায় পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই।সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার পরিবর্তে আত্মস্থ করার প্রবণতা বেড়েছে। তবে, এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুব একটা কাজে আসছে না।

দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমানে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেষ্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। দেশের সব মাধ্যমিক স্কুল এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত। এ কর্মসূচির সবল ও দুর্বলতা পর্যালোচনা করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। গত জুন মাসে প্রকাশিত আইএমইডির প্রতিবেদনে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ১৮টি দুর্বল দিক তুলে ধরা হয়েছে। বিপরীতে ১৩টি সবল দিকের কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ১৪ ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সেসিপ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। ২০১৪ খ্রিষ্টব্দের জানুয়ারি থেকে কর্মসূচিটি শুরু হয়েছে। গত ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বেড়েছে।

দেশের আট বিভাগের আটটি জেলা থেকে দুটি করে উপজেলা নিয়ে মোট ১৬টি উপজেলার ৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমীক্ষা করেছে আইএমইডি। সমীক্ষায় ৬৪০ জন শিক্ষার্থীকে নমুনা হিসেবে নেয়া হয়। এ ছাড়া শিক্ষক, অভিভাবক, ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং কর্মকর্তাদের মতামত নেয়া হয়েছে।

আইএমইডি বলছে, কর্মসূচিটির সক্ষমতা ও দুর্বলতা খুঁজে বের করে সস্তাব্য ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এর মাধ্যমে পরবতী পদক্ষেপ নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, বিদ্যমান গাইড বই এবং টিউশনি সেসিপ কর্মসূচির উদ্যোগ ব্যাহত করতে পারে। এ ছাড়া করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণেও কর্মসূচির কর্মপরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে।

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ থাকে। আর বেশ কিছু দিন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় এ সংকটের সৃষ্টি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৭৬ শতাংশ পদই শূন্য। আর সহকারী শিক্ষকের পদ আছে ১০ হাজার ৯০৪ জন। এর মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি পদ শূন্য। অবশ্য ইতিমধ্যে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) প্রায় ২ হাজার ১৫৫ জনকে বাছাই করে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেছে। এখন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।

আর এনটিআরসিএ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, বছরখানেক আগে সংগ্রহিত তথ্য অনুসারে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫৬ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য আছে। যার দুই তৃতীয়াংশ মাধ্যমিক স্তারের। এরপর সময়ের পরিক্রমায় ১ বছরে আরও কিছুপদ শূন্য হয়েছে। তবে, কতগুলো শূন্য হয়েছে তা বলতে পারছেন না কর্মকর্তারা। কারো ধারণা, ৩৫ হাজার, কারো মতে, ৪০ হাজার পদ গত ১ বছরে শূন্য হয়েছে। আগের অর্ধলাখ পদ পূরণের তোড়জোড় শুরু হলেও সে প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু হবে তা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে।

মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার সমতা আনার বিষয়েও আইএমইডির প্রতিবেদনে জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩১ শতাংশ এবং বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৫ শতাংশ নারী শিক্ষক আছেন।

এখন ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগের প্রায় সব

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অন্য বিভাগের প্রায় সব বিদ্যালয়ে কম্পিউটার থাকলেও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকে পিছিয়ে। চট্টগ্রাম বিভাগের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা (২৫ শতাংশ) সবচেয়ে কম কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে। অন্যান্য বিভাগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজশাহীর ৭৩ শতাংশ, রংপুরের ৬০ শতাংশ, সিলেটের ৫৪ শতাংশ, বরিশালের ৪৯ শতাংশ, ময়মনসিংহের ৪৬ শতাংশ এবং খুলনার ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে।

কীভাবে আইসিটি ক্লাস নেয়া হয় তারও তথ্যে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, শুধু পাঠ্যবই পড়ানো হয়। প্রায় ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, ব্যবহারিক ও তত্ত্বীয় (থিওরি) ক্লাস একসঙ্গে হয়। ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, ব্যবহারিক ও তত্ত্বীয় ক্লাস আলাদাভাবে হয়।

বর্তমানে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতি হচ্ছে একটি বিষয় মুখস্থ না করে পুরোপুরি আত্মস্থ করা, নিজের মতো করে বিষয়টাকে ধারণ করে প্রয়োগ করা। সমীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষকেরা মনে করেন, সৃজনশীল পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মান, পরীক্ষায় পাসের হার ও নকলের প্রবণতা কমেছে। নিজেদের প্রকাশ করার প্রবণতাও বেড়েছে। সমীক্ষায় অংশ নেয়া ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর কাছে সৃজনশীল সহজ। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্নসহ বিভিন্ন ধরনের বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন প্রণয়নে দুর্বলতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৪8 দশমিক ৭৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনো ঠিকভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারেন না।

আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কয়েকটি ধাপে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২ দিনের প্রধান প্রশিক্ষক [মাস্টার ট্রেইনার) এবং পরে সব শিক্ষককে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। মাস্টার ট্রেইনার প্রশিক্ষণ অনেকটা কার্ষকর হলেও তিন দিনের প্রশিক্ষণগুলো কাজে আসছে না। আবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।বর্তমানে সহায়ক পুস্তক বা অনুশীলন বইয়ের নামে মুলত নোট-গাইডেরই. ব্যবহার হচ্ছে।

অবকাঠামোতহ সংকট নিয়ে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৪৮ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। অথচ সব প্রতিষ্ঠানেই প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা উচিত। অর্ধেকের বেশি (৫২ শতাংশ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খাওয়ার পানির জন্য ফিল্টারের ব্যবস্থা নেই। আর ১২ শতাংশ বিদ্যালয়ে এখনো টিউবওয়েল নেই। বিদ্যালয়ের পানির ট্যাংক পর্যবেক্ষণের জন্য স্টিলের মই নেই ৭০ শতাংশ বিদ্যালয়ের।

অন্যদিকে ৯১ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাঠ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার সুযোগ পায়।

ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ কাজে দিচ্ছে। তবে সমীক্ষায় অংশ নেয়া ৮৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, উপবৃত্তির টাকা তাদের খরচ চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তাদের, বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং কর্মসূচি চালু আছে। পরামর্শক দল মনে করে, বাকি বিদ্যালয়গুলোতেও কাউন্সিলিং কর্মসূচি চালু করা উচিত, যাতে ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোটায় চলে আসে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ গোলাম ফারুক মাধ্যমিক শিক্ষার সংকটের কথা অস্বীকার করেননি। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, সেসিপ কর্মসূচির বাকি মেয়াদে ঘাটতিগুলো পূরণের চেষ্টা করা হবে। সৃজনশীল পদ্ধতির বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণটি জোরদার হচ্ছে। শিক্ষকসংকট নিরসনেও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।
Exit mobile version