বাংলাদেশের টাঙ্গাইল এমন একটি জেলা যেখানে সবচেয়ে বেশি তাঁতি বসবাস করে। কয়েক শতাব্দী ধরে টাঙ্গাইলে বিশাল তাঁত সম্প্রদায় বসবাস ও তাঁত বুনে আসছেন।
ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধী যখন প্রতিবাদ হিসাবে স্থানীয় পণ্য ব্যবহার করতে সবাইকে উৎসাহিত করেছিলেন, তখন দেশী শিল্প হিসেবে টাঙ্গাইলের এই শাড়িটির ব্যাপক প্রসার হয়েছিল। পরবর্তীতে এর উত্তরসূরীরাও এটা ধরে রেখেছেন। টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ির বিভিন্ন ধরন হয়। তার মধ্যে কটন, হাফ-সিল্ক, সফট সিল্ক, কটন জামদানি, পেঁচানো সুতি এবং বালুচুরি ইত্যাদি হলো টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি।
এক সময় বাংলাদেশের মসলিন ও জামদানি ছিল পৃথিবী বিখ্যাত শাড়ি। অনেক বিদেশি পর্যটক এসব শাড়ি দেখে আকৃষ্ট হতেন।
স্বাধীনতার পর এদেশের তাঁতশিল্পের পরিবর্তন এসেছে। ৭০ দশক থেকে এদেশে তাঁতশিল্পের নবযাত্রা শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁত শিল্প অগ্রণী ভূমিকা রেখে যাচ্ছে শাড়ির ক্ষেত্রে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির কদর উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।
শাড়ির মধ্যে একটি জনপ্রিয় নাম টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। এই শাড়ি রমণীদের মন আকৃষ্ট করে অতি সহজেই।
শুধু সৌন্দর্যের দিক থেকেই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁতের শাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। ফলে শিক্ষিত-অর্ধ শিক্ষিত লোক আর বেকার নয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বেকারত্ব থেকে মুক্ত। আত্ম-কর্মসংস্থানের এক অন্যতম মাধ্যম টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন ঐতিহ্য আজকের নয়, হাজার হাজার বছর আগের। টাঙ্গাইলের একটি প্রবাদ জনমুখে বেশ পরিচিত।
‘নদী চর খাল বিল গজারীর বন
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।’
টাঙ্গাইলের এ বিখ্যাত প্রবাদটি কারও অজানা নয়। শুধু টাঙ্গাইলেই এ প্রবাদটি জনপ্রিয় নয়। টাঙ্গাইলের বাইরেও এ প্রবাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সুনামের পেছনে রয়েছে তাঁতীদের দক্ষতা।
তাঁতীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করে এই শাড়ি। কল্পনাই করা যায় না যে, আধুনিক সব উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ছাড়াই তারা কিভাবে শাড়ি তৈরি করে। যেহেতু হৃদয়ের আবেদন সর্বকালীন, সেহেতু তাঁতের শাড়ির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তাঁতের শাড়ির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
টাঙ্গাইলের তাঁতীরা শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁতশিল্পের বুনন, সুতা, কালার ম্যাচিং ডিজাইন আকর্ষণীয়। টাঙ্গাইলের শাড়ির প্রথম আকর্ষণ এর বহর, ডিজাইন মনোমুগ্ধকর। এ শাড়ি ১২ হাত থেকে ১৪ হাত পর্যন্ত। শাড়ির তৈরির প্রচলন প্রথমে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি থেকেই শুরু। যার ফলে টাঙ্গাইলের শাড়ির এতো কদর। টাঙ্গাইলের তাঁতীরা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ নারীরা কখন কী ধরনের শাড়ি পছন্দ করে সে দিকটা বুঝেই শাড়ি তৈরি করে। যার কারণে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি নারীদের কাছে অধিক প্রিয় ।
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি প্রধানত দুই ধরনের তাঁতের মাধ্যমে তৈরি হয়। ‘পিটলম’ তাঁত বস্ত সভ্যতার উষালগ্ন থেকে শুরু হয়। ‘পিটলম’ তাঁতের বস্ত্র তৈরি করতে তাঁতীদের পরিশ্রম বেশি হয়। এ শাড়ি তৈরি করতে খরচও বেশি পড়ে। এ শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে তিন থেকে চার দিন। আবার ‘চিত্তরঞ্জন’ তাঁতের শাড়ি তৈরি করতে তাঁতীদের ততোটা পরিশ্রম হয় না, উৎপাদন হয় বেশি, খরচ কম হয়।
ঢাকার যেকোনো মার্কেট আর শপিংমলের শাড়ির দোকানগুলোতে পাওয়া যায় আকর্ষনীয় ডিজাইনের টাঙ্গাইল শাড়ি। টাঙ্গাইলের শাড়ির সুনাম টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁতীদের প্রয়োজনীয় উপকরণের যোগান দিতে হবে তবেই-এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।
