সখীপুরে বনের ভেতর অবৈধ অর্ধ শতাধিক করাতকল; ধ্বংস হচ্ছে শাল-গজারি উজার হচ্ছে সামাজিক বনায়ন

এম সাইফুল ইসলাম শাফলু: বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের বিধান না থাকলেও টাঙ্গাইলের সখীপুর বন বিভাগের ৮টি ইউনিয়নের তিনটি রেঞ্জের ১১টি বিটের আওতায় স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজসে রাজনৈতিক প্রভাবশালী লোকজন অবৈধভাবে গড়ে তুলেছেন ৪৮টি করাতকল। আইনের কোন তোয়াক্কা না করে সংরক্ষিত শাল-গজারি ও সামাজিক বনায়নের ভেতরেই আবার কোথাও বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কাছেই এসব অবৈধ কল গড়ে তোলা হয়েছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ওইসব করাতকলে দিনরাত চেরানো হচ্ছে শাল-গজারিসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের চুরি হওয়া গাছ। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে শাল-গজারি, উজাড় হচ্ছে সামাজিক বনায়ন আর বিলুপ্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণী।২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত প্রথমে ছয়মাস ও পরে আরও এক বছর ওই করাতকলের মালিকদের হয়রানি না করার জন্য বন কর্মকর্তাদের আদেশ দেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ওইসব করাতকল মালিকের আবেদন খারিজ করে দেয় আদালত। ফলে অবৈধ করাতকল মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা ও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে আর কোনো বাঁধা নেই বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইল বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (দক্ষিণ) সাজ্জাদুজ্জামান। এসব অবৈধ করাতকল দ্রুত উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সখীপুর পৌরসভার বৈধ করাতকল মালিক সমিতি। অভিযোগ দেওয়ার পর ছয় মাস পার হলেও ওইসব অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে স্থানীয় বনবিভাগ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সখীপুর পৌরসভায় বৈধভাবে (লাইসেন্সকৃত) ৩৫টি করাতকল থাকলেও অবৈধ করাতকলগুলো দেদারছে চলার কারণে তাদের কলগুলো ভালভাবে চলছে না বলে অভিযোগ করেন উপজেলা বৈধ করাতকল মালিক সমিতির নেতারা। স্থানীয় বন বিভাগের তালিকা ও করাতমালিক সমিতির সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ৪৮টি লাইসেন্সবিহীনের (অবৈধ) মধ্যে বহেড়াতৈল রেঞ্জে ২১টি, হাতিয়ায় ১৫টি , বাঁশতৈল রেঞ্জে ছয়টি ও পৌরসভায় ছয়টি করাতকল রয়েছে। উচ্চ আদালতে আবেদন করা ১৯টি করাতকল হচ্ছে- বহেড়াতৈল রেঞ্জের ডিবি গজারিয়া বিটের আওতায় দাড়িয়াপুর গ্রামের লুৎফর রহমান আকন্দের আকন্দ টিম্বার ট্রেডার্স অ্যান্ড স’মিল, ওই একই গ্রামের গোলাপ মোস্তফার লিজু-অরনি টিম্বার, কাঁকড়াজান বিটের আওতায় ও বিট কার্যালয়ের ৫০ গজের মধ্যে কাঁকড়াজান গ্রামের আবু হানিফের মেসার্স হানিফ স’মিল, উপজেলার গড়বাড়ি গ্রামের আবুল কাশেম আজাদের মেসার্স ইমন স’মিল, সাপিয়াচালা গ্রামের জালাল মিয়ার ভাই ভাই স’মিল, দিঘীরচালা গ্রামের আবদুল হামিদের মেসার্স জিহাদ স’মিল, তৈলধারা গ্রামের মাজেদুল ইসলামের রিফাত স’মিল, আইলসার বাজারে অবস্থিত অমলেশ বর্মণের মেসার্স বন্ধু স’মিল, বাগেরবাড়ি গ্রামের লিটন মিয়ার লিটন স’মিল, কচুয়া বিটের আওতায় বড়চওনা গ্রামের আশরাফ হোসাইনের আল আমিন স’মিল, উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের শাহাজাদা সোহাগের মেসার্স নাহিয়ান স’মিল, আবেদনগর গ্রামের আবুল হোসেনের মেসার্স আবুল স’মিল, দেবরাজ গ্রামের মতিউর রহমানের ভাইভাই করাতকল, চকপাড়া বাজারের আসলাম ভুঁইয়ার ভুঁইয়া স’মিল, বহেড়াতৈল বিটের আওতায় গোহাইলবাড়ি গ্রামের কামাল হোসাইনের মেসার্স এসএস ট্রেডার্স, একই গ্রামের মো. বাবুলের মেসার্স ভাই ভাই স’মিল। হাতিয়া রেঞ্জের কালিদাস বিট কার্যালয়ের ১০০ গজের মধ্যে মকবুল হোসেনের তিনভাই স’মিল, ওয়াজেদ বাজারের জাহাঙ্গীর ভুইয়ার ভুইয়া স’মিল, বাঁশতৈল রেঞ্জের নলুয়া বিটের আওতায় নলুয়া গ্রামের কামাল হোসেনের কামাল এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড স’মিল। উচ্চ আদালতে করা আবেদন তিন মাস আগেও খারিজ হলেও ওই ১৯টি করাতকলে দিনরাত অবৈধভাবে গাছ চেরানো হচ্ছে।

এছাড়াও হাতিয়া রেঞ্জ কার্যালয়ের ২০০-৪০০ গজের মধ্যে শাহীন আল মামুন, দেলোয়ার হোসেন, আবুবকর ও আবু সাঈদের চারটি করাতকল, কালিদাস বিট কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মাত্র ১০০ গজের ফরিদ হোসেন আরেকটি করাতকল, একই বিটের করটিয়াপাড়া চতলবাইদ গ্রামে নঈম উদ্দিনের একটি, মিণ্টু মিয়ার একটি ও মজনু মিয়ার বন ঘেঁষা করাতকল দেদারছে চলছে। মঙ্গলবার সরেজমিন বহেড়াতৈল রেঞ্জের কাঁকড়াজান বিট কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ওই বিটের খুবই কাছে জয়নাল অবেদিনের ও নূর জামাল করাতকল স্থাপন করেছেন। ওই দুই করাতকলেই গজারি ও সামাজিক বনায়নের আকাশমণি গাছের ছড়াছড়ি দেখা যায়। নূর জামাল বলেন, ‘বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তারা এসব কল চালান বলে দাবি করেন। মঙ্গলবার সকালে সখীপুর পৌরসভা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর খোরশেদ আলম, ওই ওয়ার্ডের আবদুস সামাদ, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে উপজেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর জুলফিকার শামীম, একই ওয়ার্ডে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মীর শামসুল আলম, ১ নম্বর ওয়ার্ডের হাফিজ উদ্দিন, ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও কালিয়া ই্উনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল হোসেন লাইসেন্সবিহীন করাতকল চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই ছয়জন দাবি করেন, পৌরসভার ভেতরে করাতকল স্থাপনের আইন রয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করলেও তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই চলছে।

হাতিবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতিউর রহমান বলেন, ১০ বছর আগেও এ এলাকায় কত গজারি গাছ ছিল। সন্ধ্যা হলেই শেয়ালের হাঁক-ডাক শোনা যেত। বনে অনেক পশু-পাখি দেখা যেত। এখন বনের ভেতর অবৈধ করাতকল গড়ে উঠায় দিন দিন শাল-গজারি বিলীন হয়ে যাচ্ছে আর পশু-পাখির শব্দও কমে গেছে। করাতকল মালিকদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বহেড়াতৈল রেঞ্জের কর্মকর্তা আতাউল মজিদ বলেন, টাঙ্গাইল ডিএফও কার্যালয়ের মাসিক সভায় অচিরেই অবৈধ করাতকলগুলো উচ্ছেদে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। সখীপুর পৌরসভার বৈধ করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি জিন্নত আলী বলেন ‘অবৈধ করাতকলগুলো উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করেই চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ করাতকলে দিনরাত চুরিকৃত শাল-গজারি আর সামাজিক বনায়নের কাঠ চেরানো হচ্ছে। ফলে সখীপুরের ঐতিহ্য শালগজারি এখন প্রায় বিলীন হওয়ার পথে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি করাতকল মালিকের নাম জানা গেলেও, বৈধ কাগজপত্র ও লাইসেন্স না থাকায় কোন করাতকলের প্রকৃত মালিক কে তা কেউ স্বীকার করতে চায় না। তবে অবৈধ করাতকল মালিকদের নিয়ে উপজেলায় একটি সমিতিও রয়েছে। উপজেলার গড়বাড়ি গ্রামে সামাজিক বনের পাশে স্থাপিত কল মালিক আবুল কাশেম সভাপতি পদে ও উপজেলার সাপিয়াচালাগ্রামে স্থাপিত করাতকলের মালিক কামরুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন। তবে ওই দুইজন দাবি করেন, তাদের করাতকল এখন বন্ধ। আগে তারা সভাপতি-সম্পাদক ছিলেন, তবে এখন একবছর ধরে সমিতির কার্যক্রম নেই। সখীপুর উপজেলা মানবাধিকার কমিশনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন ‘বনের কাছে ও ঘেঁষে অবৈধ এসব করাতকলে অবাধে বনাঞ্চলের গাছ চেরানো হলে বন ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না। এভাবে চলতে থাকলে প্রকৃতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে আর বিলুপ্ত হবে বন্য প্রাণী।’

এ ব্যাপারে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) সাজ্জাদুজ্জামান বলেন, ‘সংশোধিত বন আইনেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ অভিযানে সাতটি করাতকল উচ্ছেদ করা হয়েছিল। শিগগিরই আবার অবৈধ করাতকলগুলো উচ্ছেদে ট্রাস্কফোর্স ( ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও বন বিভাগ সমন্বিত) গঠন করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলেও জানান তিনি।’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.