ব্রেকিং নিউজ :

লে. জে. আজিজ আহমেদ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক চৌকষ অফিসার

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রধান শাখা। আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের সহিত গর্বের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নাম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এশিয়া মহাদেশের অন্যতম সেরা সেনাবাহিনী। দেশের সার্বভৌমত্ত রক্ষার পাশাপাশি এই বাহিনী আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিধানে এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অভূতপূর্ব অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছে এবং হচ্ছে। এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়। সেগুলো হল,
শিক্ষাগত যোগ্যতা
নেতৃত্বদানের গুণাবলী
সুনির্দিষ্ট অপারেশনাল/কমান্ড অভিজ্ঞতা
কর্মদক্ষতা
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন যোগ্যতা/দক্ষতা
সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী
ডায়নামিজম
সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততা
সততা
পারিবারিক ঐতিহ্য
উল্লেখিত গুণাবলী বিবেচনায় নিয়ে লে. জে. আজিজ আহমেদকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ১৬তম সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। উল্লেখিত যোগ্যতার বিচারে কেমন হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন সেনাপ্রধান তার একটি বিশ্লেষণ দরকার।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ আহমেদ বর্ণিত সকল গুণ ও দক্ষতার নিরিখে উত্তীর্ণ একজন চৌকষ সামরিক অফিসার। তিনি ১৯৬১ সালে চাঁদপুর জেলার মতলবের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা-মরহুম আব্দুল ওয়াদুদ আহমেদ। মাতা-রেনুজা বেগম। পিতা বাংলাদেশ বিমানের সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ তার সামরিক বাহিনীর ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই মেধাবী অফিসার হিসেবে সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন।
তিনি মোহাম্মদপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৭৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৭ সালে এইচএসসি পাস করেন নটরডেম কলেজ থেকে। ১৯৮০ সালে কলেজ অব টেক্সটাইল টেকনোলজি হতে টেক্সটাইল টেকনোলজি সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএ (পাস), ১৯৯৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাষ্টার অব ডিফেন্স স্টাডিজ, ২০০৮ সালে এমএসসি (টেকনিক্যাল) এবং ২০০৮ সালে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন বাংলাদেশ (AIUB) থেকে এমবিএ (এক্সিকিউটিভ) সম্পন্ন করেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ ৮ম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের সাথে ১৯৮৩ সালের ১০ জুন তারিখে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি হতে পাসিং আউটের পর সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশনপ্রাপ্ত হন।
তার বেসিক কোর্সের অফিসারগণের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী ও পরিশ্রমী। ফলে সামরিক জীবনের শুরুতেই তিনি তার বেসিক কোর্সে প্রথম স্থান অধিকার করে নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সারির একজন অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
শুধুমাত্র বেসিক কোর্সেই নয়, পরবর্তীতে তার কর্তৃক সম্পন্ন করা সকল কোর্সেই তিনি উচ্চমানের ফলাফল অর্জন করেন। এই কোর্স সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্কুল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এস এম আই) তে অনুষ্ঠিত বেসিক ইন্টেলিজেন্স কোর্স এবং মিলিটারি সাইন্স কোর্স। বেসিক ইন্টেলিজেন্স কোর্সে এবং মিলিটারি সাইন্স কোর্সে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,
আর্টিলারি সেন্টার ও স্কুল, চট্টগ্রাম হতে অফিসার্স গানারী ষ্টাফ কোর্স
ভারতের দেওলালী হতে লং গানারী ষ্টাফ কোর্স এবং
মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ থেকে আর্মি ষ্টাফ কোর্স-১৯ সম্পন্ন করেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজিজ তার কর্মজীবনের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামে জিএসও-৩ (অপারেশন), পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর, সেনাসদর প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরের গ্রেড-২ স্টাফ এবং সেনাসদর, বেতন ও ভাতা পরিদপ্তরের গ্রেড-১ স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
কর্মজীবনে তিনি যথাক্রমে বিজিবির মহাপরিচালক, জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি), কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল(কিউএমজি) হিসেবে সুনামের সহিত তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি একটি আর্টিলারি ইউনিট, একটি বিজিবি ব্যাটালিয়ন, একটি বিজিবি সেক্টর, স্বতন্ত্র এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেডসহ মোট দুটি আর্টিলারি ব্রিগেড এবং একটি পদাতিক ডিভিশনে দক্ষতার সঙ্গে কমান্ড সম্পন্ন করেছেন।
এছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীনে ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে ইরাক-কুয়েত এ সামরিক পর্যবেক্ষক এবং ২০০৫-২০০৬ সালে সুদানে জাতিসংঘ মিশনে ফোর্স কমান্ডার এর সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জেনারেল আজিজের কমান্ড অভিজ্ঞতাও অসামান্য। ২০১২ সালের ৭ মে তারিখে তিনি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর ৫ ডিসেম্বর তারিখে পুনর্গঠিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়কালে তিনি এই বাহিনীর পুনর্গঠন নিষ্ঠার সাথে সুচারুরূপে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেন।
বিজিবি’র মহাপরিচালক হিসেবে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে তাঁকে বিজিবিএম, পিবিজিএম এবং বিজিবিএমএস এই তিনটি পদকে ভূষিত করা হয়েছে। জেনারেল আজিজ এই সবগুলো পদক অর্জন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
উল্লেখ্য, অপারেশনে অসাধারণ কর্মদক্ষতা, দুরদর্শিতা, অসম সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার জন্য ‘বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ পদক’ বা ‘বিজিবিএম’ এ ভূষিত করা হয়ে থাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক। পিবিজিএম বা ‘রাষ্ট্রপতি বর্ডারগার্ড পদক’ প্রদান করা হয়ে থাকে বীরত্বপূর্ণ/ কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি সরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক।
নতুন সেনাপ্রধান লে. জে. আজিজ আহমেদ পারিবারিক পরিচয় এবং উল্লেখিত শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এর উপর ভিত্তি করে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় সফল নেতৃত্ব, অসাধারণ কর্মদক্ষতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বলেই তিনি এই দায়িত্বে আসীন হয়েছেন। যোগ্যতার বিচারে লে. জে. আজিজ আহমেদ একমাত্র সেনা কর্মকর্তা যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তিনি তার অসাধারণ গুণাবলী দিয়ে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম সেরা সেনাপ্রধান হিসেবে সাক্ষর রেখে যাবেন এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.