News Tangail

জুলাইতে রূপপুর পারমাণবিক চুল্লির দ্বিতীয় ইউনিট বসানোর কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

পাবনা প্রতিনিধি : ঈশ্বরদীর রূপপুরে দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লি বসানোর কাজের উদ্বোধন করা হবে আগামী জুলাই মাসের যেকোন সময়।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারমাণবিক চুল্লি বসানোর কাজের অর্থাৎ ফাষ্ট কংক্রিট পোরিং ডেট বা এফসিডি কাজের উদ্বোধন করবেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

রাশিয়ান ফেডারেশনের সহযোগিতায় ঈশ্বরদীর রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

এর আগে গত বছরের ৩০শে নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লি বসানোর কাজের অর্থাৎ ফাষ্ট কংক্রিট পোরিং ডেট বা এফসিডি কাজের উদ্বোধন করেন।

এই অনুষ্ঠানে রোসাটমের মহাপরিচালক মি: আলেক্সি লিখাচেভ, আর্ন্তজাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিচালক তৌহি হান সহ দেশী-বিদেশী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আর্ন্তজাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের রীতি অনুযায়ী ওই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক জগতে প্রবেশ করে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের কংক্রিটের কাজ চলমান। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

একইসাথে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও শুরু করার জন্য সকল প্রাক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে এরমধ্যেই সরকারের স্থানীয় সকল দপ্তরের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী ফাষ্ট কংক্রিট পোরিং ডেট বা এফসিডি উদ্বোধনের দিন হতে ৬৩ মাসের মধ্যে এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ হবে।

বর্তমানে পৃথিবীর ৩১টি দেশে ৪৩৭টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ৩০শে নভেম্বর এফসিডি কাজের উদ্বোধনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম পারমাণবিক দেশ স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
উল্লেখ্য, সর্বাধুনিক ভিভিইআর প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিটের দুটি প্লান্ট বসানো হচ্ছে।

২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গিকার করা হয়।

এই অঙ্গিকারের ভিত্তিতে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের স্টেট এ্যাটোমিক এনার্জি কমিশন (রোসাটোম) ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর করেন।

২০১০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং রাশিয়ান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়।

প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়।

প্রকল্পের অগ্রগতি তত্ত্বাবধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সভাপতিত্বে কারিগরি কমিটি এবং সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ও আটটি সাব গ্রুপ গঠন করা হয়।
২০১০ সালের ১০ই নভেম্বর জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

২০১১ সালের ২রা নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাশিয়ান ফেডারেশন ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে প্রকল্প নির্মাণে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৪ সালের ২রা অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। এসময় রাশিয়ান ফেডারেশনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কিরিয়েঙ্কো এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনের পর হতেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। প্রকল্পে কর্মরত সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনায় বিগত দুই বছর যাবত দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান প্রতি মাসেই ১ থেকে ২বার স্বশরীরে ঈশ্বরদীর রূপপুরে এসে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়মিত দেখছেন।

রাশিয়ান ও বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞ ও কর্মী মিলে প্রতিদিন প্রায় সহস্রাধিক মানুষ এখন দিন-রাত কাজ করে চলেছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী জানান, এই রিঅ্যাক্টর বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি রাশিয়ায় শুধুমাত্র একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রয়েছে। বাংলাদেশের রূপপুরে এটি দ্বিতীয় ব্যবহার হবে ।

২০২০ সালের মধ্যেই মূল রিঅ্যাক্টর ভেসেলসহ সব যন্ত্রপাতিই রাশিয়া হতে চলে আসবে বলে প্রকল্প সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

দুটি ইউনিটে (১২০০+১২০০) এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

২০২৩ সালে প্রথম ইউনিটে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সঞ্চালিত হবে।

পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয়ের কারণে এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের নির্মিত প্রযুক্তির অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ সেফটি সিস্টেমের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনো ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেই বললেই চলে বলে প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানিয়েছেন। এরপরও যদি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেও যায়, সেক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় পদার্থ জনগণের নাগালের মধ্যে যাবে না। কারণ কোর ক্যাচার ব্যবহার করায় তেজস্ক্রিয় বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই। যেকারণে এই মডেলটি ঝুঁকিমুক্তই বলে তিনি জানিয়েছেন।

মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে নির্মিত হচ্ছে অত্যাধুনিক আবাসন পল্লী ‘গ্রিণসিটি’ । পাবনা গণপূর্ত অধিতদফতর এগুলো বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ তলা বিশিষ্ট ১১টি বিল্ডিং এবং ১৬ তলা ৮টি বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে। ২২টি সুউচ্চ বিল্ডিং তৈরি হবে এই চত্বরে। গ্রিণসিটিতে থাকবে মাল্টিপারপাস হল, চিকিৎসা কেন্দ্র, মসজিদ ও স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ব্যয়ের প্রকল্প রূপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে রাশিয়া ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা দিবে বলে চুক্তি হয়েছে।

 

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে । এটি পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভৌত অবকাঠামো তৈরি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য পরমাণু প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং কার্বনমুক্ত ও বেইসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারের বিদ্যুৎ খাতের মাস্টার প্লান অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের ১০ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং গাইডলাইন অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এলাকার জনপ্রতিনিধি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সরকারের ভূমি মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ এমপি তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ঈশ্বরদীবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ঘটিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিশিষ্ঠ পরমাণু বিজ্ঞানী ও বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞা রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন্।

এরই ধারাবাহিকতায় জননেত্রী শেখ হাসিনা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল এই প্রকল্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে গ্রহন করেন।

এই প্রকল্পে আমাদের মহান স্বাধনীতা যুদ্ধের মিত্র রাশিয়া সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ায় তিনি রাশিয়া সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.