News Tangail

সাকিব-তামিম ছাড়া কেমন খেলে বাংলাদেশ?

৬ই আগস্ট ২০০৬। এদিনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু সাকিব আল হাসানের। পরের বছরেই জাতীয় দলে চলে আসেন বন্ধু তামিম ইকবালও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে দু’জন সময় নেন এক বছরেরও কম। এরপর থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সত্যিকারের ‘ম্যাচ উইনার’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এ ‘মানিকজোড়’।

কোনো ইতিহাস বা পরিসংখ্যানের পাতায় চোখ না বুলিয়েই বলে দেয়া যায়, গত এক যুগে বাংলাদেশ ক্রিকেটে যত সাফল্য তার অর্ধেকের বেশিই ছিলো সরাসরি সাকিব ও তামিমের অবদান। টাইগারদের ট্রফি কেবিনেটে নতুন কোনো সাফল্য যোগ হয়েছে; কিন্তু সেখানে নেই সাকিব বা তামিমের অবদান, এমনটা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

শুধু তাই নয়, সাকিব-তামিমের অভিষেকের পর থেকে ইনজুরিব্যতীত অফ-ফর্মের কারণে তাদের দল থেকে বাদ পড়ার নজিরও পাওয়া যাবে না তেমন। তবু ইনজুরি ও পারিপার্শ্বিক কারণে নিজেদের ক্যারিয়ারে বেশ কিছু ম্যাচ মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে সাকিব-তামিমকে। ঠিক যেমনটা কাটাতে হবে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া সিরিজটিতেও।

সাকিবের বাঁ-হাতের কনিষ্ঠার পুরনো ইনজুরি এবং এশিয়া কাপ খেলতে গিয়ে পাওয়া তামিমের ইনজুরির কারণে রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া জিম্বাবুয়ে সিরিজে মাঠের বাইরে থাকতে হবে দু’জনকেই। ২০০৬ সালে সাকিবের অভিষেকের পর থেকে কখনোই এমনটা হয়নি যে, কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বা বহুজাতিক টুর্নামেন্টের পুরোটা সময় দলের সাথে সাকিব-তামিমের একজনও ছিলেন না।

তাদের অভিষেকের পর থেকে সাকিব-তামিমের দু’জনকে ছাড়া এখনো পর্যন্ত ৮টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ; কিন্তু কখনোই এমন হয়নি যে পুরো সিরিজ বা পুরো টুর্নামেন্টেই দলের সাথে নেই এই দুজন। ফলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এ মানিকজোড়কে ছাড়া খেলতে নেমে নতুন এক অভিজ্ঞতাই হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, শঙ্কা লেগেই থাকে! সেটা কিসের? প্রশ্ন বা শঙ্কা হলো, যে সাকিব-তামিম মিলে বাংলাদেশ দলকে বারবার আনন্দে ভাসিয়েছেন, সাফল্যে উদ্ভাসিত করেছেন, অবদান রেখেছেন বড় বড় সব অর্জনে- সে সাকিব-তামিমকে ছাড়া প্রথমবারের মতো পুরো সিরিজ খেলতে নেমে কেমন করবে বাংলাদেস? হেরে যাবে না তো কোনো ম্যাচ?

প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে বলে হয়তো এ প্রশ্ন বা শঙ্কা কোনোটাই জোরালো নয়। দলের সেরা দুই তারকা ছাড়াও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সব ম্যাচ জেতার সামর্থ্য বাংলাদেশ দলের রয়েছে; কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি শক্তিশালী কেউ হতো? কোনো কুলিনতম টেস্ট সদস্য দল হতো?

তখন এ প্রশ্নের গুরুত্ব বেড়ে যেত অনেক, নানান হিসেব-নিকেশ, আলোচনা-পরিকল্পনা হতো সবখানে। আপাতত সেসব রেখে দেয়া যাক যথাযথ পরিস্থিতির অপেক্ষায়। এখন কথা বলা যাক আলোচ্য ‘মানিকজোড়’কে ছাড়া অতীতে কেমন করেছে বাংলাদেশ দল, সে ব্যাপারে

সাকিব-তামিমের অভিষেকের পর থেকে দু’জনকে ছাড়াই বাংলাদেশ দল প্রথমবারের মতো খেলেছে ২০১৩ সালের শ্রীলঙ্কা সফরে। সে সফরের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে খেলেছিলেন তামিম, পুরো সিরিজেই ছিলেন না সাকিব। তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ইনজুরিতে পড়েন তামিমও। এরপর মানিকোজোড়শূন্য হয়ে যায় দল।

দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথমবারের মতো সাকিব-তামিমের দুজনকে ছাড়াই মাঠে নামে বাংলাদেশ; কিন্তু বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়ে যায় ওই ম্যাচ। পরে তৃতীয় ম্যাচটি ৩ উইকেটে জিতে সিরিজ ড্র করে বাংলাদেশ। অর্থাৎ সাকিব-তামিমকে ছাড়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ ম্যাচেই জয় পায় বাংলাদেশ। এ দু’জনকে ছাড়া জয় আসে পরের ম্যাচেও।

একই বছরের (২০১৩) শেষদিকে দেশের মাটিতে খেলতে আসে নিউজিল্যান্ড। ২০১০ সালে তাদের হোয়াইটওয়াশ করার স্মৃতি তখন জ্বলজ্বলে। সে অনুপ্রেরণা থেকে সাকিবকে ছাড়াই তিন ম্যাচে সিরিজের দুটি জিতে নেয় বাংলাদেশ, জাগিয়ে তোলে হোয়াইটওয়াশের সম্ভাবনা। তখনই বাঁধে বিপত্তি। ইনজুরিতে লম্বা সময়ের জন্য ছিটকে যান তামিম।

ফলে হোয়াইটওয়াশ করার মিশনে তৃতীয় ম্যাচে নামতে হয় সাকিব-তামিম দুজনকে ছাড়াই। সেবারও সফল টিম বাংলাদেশ। কিউইদের বিপক্ষে তিনশ ছাড়ানো স্কোর তাড়া করে জেতে টাইগাররা, পেয়ে যায় নিউজিল্যান্ডকে দ্বিতীয়বার হোয়াইটওয়াশ করার স্বাদ।

তখনো পর্যন্ত বোঝা যায়নি সাকিব-তামিম দুজনকে ছাড়াই খেলার প্রভাব। ঘরের মাঠে ২০১৪ সালের এশিয়া কাপে হাঁড়ে-হাঁড়ে টের পাওয়া যায় এ দুজন একসঙ্গে না থাকার অভাব। এশিয়া কাপ শুরুর আগে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে বাজে অঙ্গভঙ্গি করে তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন সাকিব, তখনো মাঠের বাইরে তামিম।

অগত্যা ২০১২ সালের রানারআপদের ২০১৪ সালের আসরের প্রথম তিন ম্যাচ খেলতে হয় সাকিব-তামিমকে ছাড়াই। ফেবারিটের তকমা গায়ে লাগিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও, মানিকজোড়কে ছাড়া খেলা তিন ম্যাচের তিনটিতেই হেরে যায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে ছিলো আফগানিস্তানের বিপক্ষে হারের গ্লানিও।

এরপর টানা চার বছর আর নামতে হয়নি দলের মানিকজোড়কে ছাড়া। আবুধাবিতে সবশেষ এশিয়া কাপে প্রথম ম্যাচেই ছিটকে যান তামিম। সুপার ফোরের শেষ ম্যাচের আগে বাঁ-হাতের কনিষ্ঠার ইনজুরিতে দেশে ফিরে আসেন সাকিবও। চার বছর পর আবারও সাকিব-তামিমকে ছাড়া খেলতে নামতে হয় বাংলাদেশকে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে সে ম্যাচে জয় পেতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। সাকিব-তামিম দুজনকে ছাড়া তৃতীয় জয় তুলে নিয়েই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিন্ত করে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটিতে অষ্টম ও শেষবারের মতো মানিকজোড়কে ছাড়া খেলতে নামে বাংলাদেশ। দুর্দান্ত বোলিং করেও একদম শেষ বলে গিয়ে হাতছাড়া হয় জয়, পুড়তে হয় আরও একটি ফাইনাল হারের বেদনায়।

সবমিলিয়ে সাকিব-তামিমের অভিষেকের পর এ দুজনের একজনও দলে ছিলেন না, এমন ম্যাচ বাংলাদেশ খেলেছে আটটি। ২০১৩ সালে প্রথম পরিত্যক্ত ম্যাচটি বাদ দিয়ে বাকি সাত ম্যাচের মধ্যে টাইগারদের জয় তিনটিতে, পরাজয় সঙ্গী হয়েছে বাকি ৪টি ম্যাচে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজে সাকিব-তামিম দুজনকে ছাড়া খেলা ম্যাচের সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াবে এগারোতে। জয়-পরাজয়ের সংখ্যায় কেমন পরিবর্তন আসবে? এ প্রশ্নের উত্তত দেবে সময়, বোঝা যাবে মাশরাফি-মুশফিকদের মাঠের পারফরম্যান্স দেখার পরেই।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.