ব্রেকিং নিউজ

লাস্ট বেঞ্চের মেধাবী ছাত্র!

টিফিন আওয়ার চলছে। প্রিয় বন্ধুরা সব মাঠে হৈচৈ করছে। অথচ মাঠে নেই দ্বীপ্ত। সহপাঠিরা ডাকলেও বাইরে যাওয়ার কোন আগ্রহ নেই ওর। শ্রেণি কক্ষের এক কোণে বসে একাকি পড়ছে দ্বীপ্ত। এটা একদিনের চিত্রনা। প্রতিদিনই এমন চিত্র বন্ধুদের নজর কাড়ে। বন্ধুরা পাশে থেকেও জানেনা দ্বীপ্ত কেন এমনটা করে। নিজেকে খোলসের ভেতরে রেখেই যেন ওর আত্মতৃপ্তি। প্রতিদিনের এ্যাসেম্বলি ক্লাসে আসতে দ্বীপ্তকে বেগ পেতে হয়। মাঝে মধ্যেই প্রথম আওয়ারটাও ছুটে যাওয়ার পথে। বন্ধুর তালিকাটা ছোট হওয়ায় পেছনের জায়গাটা ওর নির্ধারিত আসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল ছুটি হলে অহেতুক ক্যাম্পাসে সময় দেয়না দ্বীপ্ত। ছুটির ঘণ্টা বাজলেই ক্লাসও ছাড়ে দ্বীপ্ত। প্রথম সারির ছাত্রছাত্রীদের হোমওয়ার্ক দেখতে দেখতে দ্বীপ্তর কাছে পৌঁছার আগেই বেশিরভাগ সময় ঘণ্টা পড়ে যায়। এজন্য শিক্ষকদেরও ওর সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা নেই। হঠাৎ সমাপনীতে বৃত্তি পাওয়ার খবরটা ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষক ও সহপাঠিদের কাছে ক্রমশ ওর কদর বাড়তে লাগল। জেএসসিতে আরেকটি এ প্লাস চলে আসায় স্কুলে দ্বীপ্ত আর অচেনা রইলনা। কিন্তু আজব ব্যাপার। ওর গুণাগুন প্রকাশ পাওয়াটাও ওর কাছে বিরক্তের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

আট ক্লাস পাড়ি দিয়েছে খবরটা শুনেই এবার আব্দুল গেল ছেলের ছাত্রাবাসে। ছাত্রাবাসে দুপুর থেকে দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা। বাবা ভাবছে নয় ক্লাসের পড়াটা বেশি। এজন্য হয়তো সন্ধ্যা গড়িয়ে যাবে। সূর্য্য যখন পশ্চিমের আকাশ থেকে বিদায় নিচ্ছে এমন সময় দ্বীপ্ত ছাত্রাবাসে হাজির। বাবাকে দেখে অনেকটাই অবাক দ্বীপ্ত। খালাকে ডেকে বাবার জন্য আরেকটা খাবার বাড়িয়ে দিল। রাতের খাবার খেয়ে বাবার সাথে দ্বীপ্তর বন্ধুর মতো আড্ডা। বাড়ির ছোট বড় সবার খোঁজ নিয়ে এবার সব বন্ধুদের খবর নিয়ে নিল দ্বীপ্ত। এক সময় দ্বীর্ঘশ^াস ছেড়ে বাবা বললেন দ্বীপ্ত, আমাকে কিন্ত ডাক্তারের বাবা বানাতেই হবে তোকে। কিন্তু ডাক্তার হতে কতোটা পথ পেরুতে হবে সে সম্পর্কে কোন ধারণা নেই ওর বাবার। এরপরও দ্বীপ্ত বলল “হ বাবা” মনে আছে।

নিয়মিত স্কুলে আসা, প্রতিদিনের পড়া শেখা আর আচার-আচরণে স্কুলের শিক্ষকদের কাছে এখন অনেকটাই আদরের হয়ে উঠেছে দ্বীপ্ত। এখন আর স্কুলে দ্বীপ্তকে মাইনে দিয়ে পড়তে হয়না। বিনা বেতনে পড়েও একটি উপবৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে স্কুলের শিক্ষকরা। বন্ধুর তালিকাটাও বড় হতে লাগল। তবে বন্ধুদের সাথে বাড়তি সময় দেওয়াটা মোটেও পছন্দ করে না দ্বীপ্ত। দশম শ্রেণিতে ওঠাতে বাবা ওর মাকে পাঠালেন দ্বীপ্তর কাছে। কলাই-বড়ই বেচা টাকাগুলো দিয়ে এসএসসি পরীক্ষা নাগাদ ওর মাকে ছেলের কাছে রাখতে চায় বাবা। এবার ছোট্ট একটি রুম নিয়ে মা-ছেলের শহরে বাস। একটু ফাঁকা পেলেই দ্বীপ্তর মা অন্যের বাসায় কাজে লেগে যায়। মোটের ওপর এতেও কিছু যোগ হয়। এসএসসিতেও এলো গোল্ডেন এ প্লাস। এবার হাল শক্ত করে ধরার সাহস এলো দ্বীপ্তর মনে। ডাক্তার হতে হবে।

শহরের আরেকটা স্কুলে আইএসসিতে ভর্তি হল। ফের পড়া শুরু। দ্বীপ্তর বাবা যা দিতে পারে তা বছরের শুরুতে ভর্তি আর বই কেনাটা হয় বটে। বাকিটা অন্যভাবে জোগার করতে হয়। একমাত্র কাছের সেই বন্ধু প্রিতম জানে স্কুলের খরচ জোগাতে কয়েকটা টিউশনি করতে হয় দ্বীপ্তকে। ভালো এক জোড়া জুতো না থাকাতে এ্যসেম্বলিতে ইচ্ছে করেই দেরি করতো দ্বীপ্ত। বই কিনতে না পারায় প্রতিনিয়ত হাতে লেখা নোট পড়তে হতো দ্বীপ্তকে। বই স্বল্পতা গোপন রাখতেই পিছনে বসত দ্বীপ্ত। দ্বীপ্ত কখনও প্রিতমকে তার অবস্থার কথা বলেনি। তবুও প্রিয় বন্ধু দ্বীপ্তর কোন বিষয় প্রিতমের অজানা নয়।

এইচএস পরীক্ষা শেষে এবার বেড়ানোর পালা। প্রিতম এল দ্বীপ্তর বাড়িতে। বেশ কয়েকদিন গ্রামে ঘুরে বেড়াবে। দ্বীপ্ত সম্পর্কে দ্বীপ্তর বাবার সাথে কথা তুলল প্রিতম। আব্দুল জানালো, আমার একমাত্র ছেলে দ্বীপ্ত। মানুষ হলে এক সন্তানই যথেষ্ট এই ভেবে আর কোন সন্তানের চিন্তা মাথায় আসেনি। অতি আদরেই দ্বীপ্ত নামটা রাখা। নিজে আলোকিত হবে। অন্যকে আলোকিত করবে। বয়স যখন বারো ছুঁই ছুঁই। যমুনা চরাঞ্চলের একটি পাঠশালা থেকে পাঁচ ক্লাস শেষ করে দ্বীপ্ত। ইচ্ছে ছেলেকে অনেক বড় হতে হবে। মানুষের মতো মানুষ করাটাই যেন আমার মুল লক্ষ্য। এই যাচ্ছে ডাক্তার দ্বীপ্তর বাবা আব্দুল। নদী পাড় হয়ে শহরে যেতে যেসব রোগি আর প্রাণে ফেরে না তাদের বিনে পয়সায় চিকিৎসা দেবে এমনটাই প্রত্যাশা আব্দুলের। পাঁচ ক্লাসে পড়ুয়া শিশু দ্বীপ্তর নামের আগে ডাক্তার বসানোটা কতো দুর এ বিষয়ে কোন ধারণা আমার ছিলনা। তবুও দ্বীপ্তর জন্মের পর থেকেই স্বপ্ন “ছেলে একদিন ডাক্তার হবে”। স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে সাদাসিদে আব্দুলের ছোট্ট পরিবার।

খাবারে তালিকাটা খাটো রাখলেও সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি লেখা পড়ার খরচের তালিকার কিছু যেন বাদ না পড়ে। সরকারি স্কুল। কতই আর খরচ। নগদ উপার্জন নেই। তিল, কলাই, গম, সরিষা আর সবজি বিক্রি করে যা নগদ আসে ওটা দিয়েই সংসার খরচ শেষে চলে যেত দ্বীপ্তর লেখাপড়ার খরচ। বেলা উঠার আগে গরু নিয়ে হাল ধরতাম। সারাদিন কাটতো জমিতে। হাতের তালু শক্ত হলে হাতের লেখা ভালো থাকবে না এই ভয়ে যতো কষ্টই হোক জমির কাজে হাত লাগাতে দেইনি দ্বীপ্তকে।

শৈশবেই দ্বীপ্তর চাঞ্চলতা আর হাসিমাখা মুখ দেখে আদরের কমতি ছিলনা। পড়া লেখায়ও ভালো ছিল। মেধাতালিকা একের কোটা সড়াতে পারতো না সহপাঠিরা। এজন্য এক নামেই চিনত স্কুলের শিক্ষকরা। খেলাধুলার পুরস্কারে পড়ার টেবিলের অনেকটা জায়গা আটকে আছে এখনও। সব মিলিয়ে পাঁচ ক্লাস ভালোভাবেই পাড় করলো দ্বীপ্ত। এর পর শহরের স্কুলে যাওয়া। তোমাদের সাথে চেনা জানা। ছেলেকে নিয়ে স্বপ্নের কথা বলতে বলতেই রাত অনেকটা কেটে গেল। পরদিন এইচএসসির ফল বের হল। এইচএসসিতেও প্রিতম-দ্বীপ্ত উভয়েই এ প্লাস পেল।

মেডিক্যালে ভর্তিতে বেগ পেতে হলনা। এতোদিনের অদম্য চর্চায় সহজেই মেডিক্যালের মেধা তালিকায় স্থান করে নিল দ্বীপ্ত। ডাক্তার হয়ে গ্রামে ফিরলো দ্বীপ্ত। বাবার ইচ্ছেতে মফস্বলের সাধারণ মানুষের সেবা ভ্রত নিয়ে শুরু হল দ্বীপ্তর পরবর্তী জীবন। তার দুর্বলতার সুযোগে কারো প্ররোচণা লাইনচ্যুত হতে পারে। এজন্য শৈশব থেকে চিকিৎসক হওয়ার আগ পর্যন্ত দ্বীপ্ত কাউকে বলেনি তার পরিবারের অসচ্ছলতার কথা। তবে মফস্বলের একটি সাধারণ পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প চারদিকে মডেল হয়ে রইলো। যা পরবর্তী প্রজন্ম অনুস্মরণ করবে।।

লেখক: একজন সংবাদকর্মী
রেজাউল করিম
টাঙ্গাইল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.