ব্রেকিং নিউজ

কঠোর অ্যাকশনে সরকার; আতঙ্কে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তারা

‘সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল দুর্নীতিমুক্ত দেশ এবং সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা। আর তাই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, মাদক, সুশাসন এবং সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ক্ষমতাসীনরা। চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। ফলে দায়িত্ব পাওয়ার পর আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছেন তার মন্ত্রীরাও। আর এতে সচিবালয়, বিভিন্ন বিভাগ এমনকি অধিদফতরের দুর্নীতিবাজরা রয়েছেন চরম আতঙ্কে।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এরই মধ্যে শুরু হয়েছে অ্যাকশন। দুর্নীতিবাজদের খুঁজে বের করতে চলছে মিশন। ইতোমধ্যে তার লক্ষণও স্পষ্ট। দুর্নীতির অভিযোগে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রাজধানীতে ৫টি বাড়ি, গাজীপুর ও কুমিল্লায় নিজের ও স্ত্রীর নামে একরের পর একর জমি, শেয়ারবাজারে নামে-বেনামে বিপুল বিনিয়োগের তথ্য পেয়ে সম্পদের ‘কুমির’খ্যাত ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী রমিজ উদ্দিন সরকারকে গত সোমবার সম্পদের বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে দুদক।

অন্যদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনকে গত ১৩ জানুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আবজালের নামে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে তিনটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া ১৬ নম্বর রোডেও রয়েছে আরেকটি পাঁচতলা বাড়ি। বিদেশে পাচার করা হয়েছে হাজার কোটি টাকা। আবজালের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অভিযান চালিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিনের অফিসের আলমারি থেকে ছয় লাখ টাকা জব্দ করেন দুদক কর্মকর্তা। টাকার উৎস জানতে চাইলে, কোনো ঠিক জবাব দিতে পারেননি নাজিম। পরে তাকে আটক করা হয়। ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে নাজিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এভাবেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার ও মন্ত্রিসভার জিরো টলারেন্সের অ্যাকশন শুরু হয়েছে। আরো বেশ কয়েকটি অভিযোগ আছে দুদকের কাছে। জমে থাকা অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে এসে পৌঁছালে মাঠে নামছে তারা। সরকারি বিভিন্ন অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা আছে দুদকের কাছে। সেই দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের হাতেনাতে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে দুদকের।

জানা গেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ায় ফেঁসে যেতে পারেন অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও। এক শ দিনের কর্মসূচির আওতায় মন্ত্রণালয়ের বিভাগ ও অধিদফতরের সঙ্গে বৈঠক করছেন তারা। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্কও করা হয়েছে!

নখ-দাঁত গজাচ্ছে দুদকের : দুদক নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা কম হয়নি। দুদককে বলা হতো ‘নখ-দন্তহীন বাঘ’। মাঝে অনেকটা সময় অবসাদ কাটিয়ে দিনবদলের ধারায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে দুদকও। ইতোমধ্যে ১৯টি বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে বিভিন্ন সরকারি দফতরের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে দুদক। ফলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিহ্নিত ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযোগ আছে, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবাগ্রহীতারা গিয়ে সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্নীতির মাত্রাও। দুর্নীতি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ফলে জনগণ সেবার পরিবর্তে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের দুর্বল নীতিমালার ফাঁকফোকর দিয়ে অবাধে দুর্নীতি করা হচ্ছে। এতে কমছে সেবার মান। প্রতিনিয়তই এ ধরনের তথ্য দুদকে দাখিল হচ্ছে। এ কারণে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারির আওতায় আনার চেষ্টা করছে দুদক। আর তাই শুধু ব্যক্তি বা কর্মকর্তা নন, দফতর-সংস্থার কাজে গাফিলতি ও দুর্নীতি খুঁজে দেখছে দুদক।

গত সোমবার দেশের আটটি জেলার দুদকের ১০টি টিম আকস্মিকভাবে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় অভিযান চালায়। এ সময় চিকিৎসকদের ৬২ শতাংশ অনুপস্থিতি পেয়েছেন তারা। এর মধ্যে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে অভিযানকালে জরুরি বিভাগের এক কর্মচারী (স্ট্রেচার বিয়ারার) দায়িত্বরত অবস্থায় রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণকালে ধরা পড়েন। পরে দুদকের সুপারিশে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার দুর্নীতি মামলার আসামিদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ও তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে দুদকের পরিচালক মো. ফজলুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি ঢাকার সেগুনবাগিচার প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের কড়া হুশিয়ারি :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর নড়েচড়ে বসেছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। তারাও নানা সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টদের হুশিয়ারি দিচ্ছেন। ৮ জানুয়ারি মন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার সচিবালয়ে বসেই দুর্নীতিবাজ কর্মীদের ‘ভালো হওয়ার বার্তা দেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আগামী পাঁচ বছর দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে থাকবে চমক! তাই মন্ত্রণালয় ও এর অধীন কোনো অধিদফতরে কোনো ধরনের দুর্নীতি প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম বলেছেন, প্রথম এমপি হয়েই মন্ত্রী হয়েছি। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছি। সফল হওয়ার মতো আত্মবিশ্বাস ও যোগ্যতা আমার আছে। দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও দুর্নীতি নির্মূলের ঘোষণা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া দুর্নীতিবিরোধী প্রতিটি ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। সে অনুযায়ী রেলকেও করা হবে দুর্নীতিমুক্ত। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল বলেছেন, ক্রীড়াঙ্গনে কেউ দুর্নীতি করলে, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগের সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুতই শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে।

প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো, কোচিং-বাণিজ্য বন্ধসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দিয়েছেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের জন্য কোচিং একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষক তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষার্থীদের ফেল করে দেওয়াসহ নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে! এদিকে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের এমন হুঙ্কারে অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আতঙ্কে আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের জোরালো অবস্থানের ফলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন। দুর্নীতির ফলে বদলি আতঙ্ক ছাড়াও চাকরি হারানোর চিন্তাও পেয়ে বসেছে অনেকের। এবার হয়তো অনেক দুর্নীতিবাজ সতর্ক হবেন। বন্ধ হতে পারে দুর্নীতি। মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সচেষ্ট থাকলে দুর্নীতির মাত্রা অনেকাংশে কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা। নতুন মন্ত্রীদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হবে—প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায়, সতর্ক তারাও। অন্যদিকে কারোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তকমা লেগে গেলে, মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নতুনরা কত দিন মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন, তা নির্ভর করবে কর্মদক্ষতার ওপর। কারো পারফরম্যান্স ভালো না হলে মন্ত্রিত্বে থাকতে পারবেন না। গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের হুশিয়ারি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নতসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশনাও দেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেটা প্রয়োজন, সেটা তো আমরা মিটাচ্ছি। তাহলে দুর্নীতি কেন হবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.