বঙ্গবন্ধু সেতুর তলদেশে চাষাবাদ হচ্ছে বোরো ধান নাব্যতা হারাচ্ছে যমুনা

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্কঃ বাংলাদেশের বড় নদীগুলোর অন্যতম যমুনা । দেশের উত্তরের জেলা জামালপুর থেকে শুরু হয়ে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জের বুক চিরে গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরের গোয়ালন্দে পদ্মার গিয়ে মিলিত হয়েছে এ নদী। এক সময় যমুনা নদীতে চলতো বড় বড় স্টিমার, জাহাজ, লঞ্চ সহ অন্যান্য নৌ-পথের পরিবহন। কিন্তু কালের বির্বতনে প্রমত্তা যমুনা তার যৌবন হারিয়ে এখন মৃত প্রায়। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে একদিকে যেমন বাস্তুহারা করছে চরাঞ্চলের মানুষকে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে যমুনা মরা খালে পরিণত হয়েছে।

তবে স্থানীয় প্রবীনরা জানিয়েছে, ১৯৯৬ সালের আগেও যমুনার পূর্ন যৌবন ছিল। কিন্তু দেশের সর্ব বৃহৎ বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের পর যমুনা নদী অস্তিত্ব হারাচ্ছে। যে কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর তলদেশে এখন চাষাবাদ হচ্ছে বোরো ধান। শত শত একর জমিতে শোভা পাচ্ছে বোরো ধানের চাষ। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে নদী শাসনের কারনে তার স্বাভাবিক গতিপথ সেতুর পিলারের মাধ্যমে বাঁধা প্রাপ্ত হওয়ায় উজানে অতিরিক্ত ভাঙন দেখা দেয়। যার ফলে নদীর গভীরতা কমে চর পরার প্রবনতা বেড়ে গেছে। দীর্ঘকাল ধরে নদী শাসন না হওয়ায় গতিপথ পরিবর্তন হয়ে শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালু চরে রূপ নিয়েছে যমুনা। আর এ সব জেগে উঠা চর গুলোতে শুস্ক মৌসুমে চাষাবাদ হচ্ছে তিল, তিসি, কাউন,ডাল, চিনাবাদাম ভূট্রা সহ নানা মৌসুমী ফসল।

সেতুর উত্তরাংশ টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরের অর্জুনা, গাবসারা, ফলদা, গোবিন্দাসী, নিকরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এই নদী। এক কালে অথৈ পানিতে থৈ থৈ করা নদী আজ পৌষ মাস থেকেই পানি শুকিয়ে মাইলের পর মাইল ধূ-ধূ বালু চরে রুপ নেয়। বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির পূর্বে টাঙ্গাইল দিয়ে সিরাজগঞ্জ হয়ে উত্তরবঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই নদী। ফেরি, যন্ত্র চালিত নৌকার মাধ্যমে নদী পাড় হয়ে উত্তর বঙ্গে যাতায়াতের এটাই ছিল একমাত্র অবলম্বন। দেশের দ্বিতীয বৃহত্তর গরুর হাট গোবিন্দাসী গরুর হাট জমে উঠে ছিল যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নৌ-পথে গরু আসত এ হাটে। এ হাটটির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো। যমুনার নাব্যতা কমে যাওয়ায় এ হাটটিও যেন মরে গেছে। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমান রাজস্ব।

যমুনার মাছ সারা দেশে সমাদ্ধৃত। এখানে পাওয়া যেত লোভনীয় ইলিশ, বোয়াল, চিংড়ী, পাবদা, গোলসাসহ নানা প্রজাতির মাছ। নদীর নাব্যতা কমায়, অতি দ্রুত নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেখা দেয় মাছের আকাল। নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করত তারা আজ অন্য পেশায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছে। ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরা জেলে ইউসুফ আলী বলেন “কি আর কমু খারি ভর্তি মাছ ধরতাম, আজ খালই এর তলাই ভরতে পারি না”। । নদীতে পানি থাকে না এবং সঠিক সময় পানি আসেও না ,তাই মাছও আসে না । বর্তমানে এ নদীতে মাছের খুব আকাল।

যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দুর পাল্লার যাতায়াত সহজ হলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের। নদী তীরবর্তী টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের লোকজন যেখানে নৌকায় চড়ে বাড়ির ঘাটে উঠা-নামা করত, সেখানে আজ মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে চলাচল করতে হয় তাদের। বর্ষাকাল ছাড়াও যেখানে এ নদীতে সারা বছর পানি থাকতো সেখানে আজ ধূ-ধূ বালু চর। নৌকা যোগে অল্প সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতে যে সুবিধা মানুষ ভোগ করতো সেখানে আজ পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। নৌকার মাঝি রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেন “প্রমত্তা যমুনা আজ হাহাকার বালু চর। অতিরিক্ত ¯্রােতের কারণে এই নদীতে নৌকা বাইতে সাহস পাইতাম না, সেখানে আজ নৌকার হালও ধরতে হয় না, এমন অবস্থা যমুনার; কি নদী ছিল আজ কি হয়ে গেছে। যে ঘাটে বড় বড় ফেরি বাঁধা থাকত সেখানে আজ গরু বাঁধা থাকে।

যমুনা নদীর উপর ব্রীজ হওয়ায় ভুঞাপুরের গোবিন্দাসীর ফেরিঘাট উঠে গেছে অনেক আগেই। এখন আর আগের মত নৌকাও চলে না। যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে যমুনার চরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে একমাত্র ভরসা ভাড়ায় চালিত মটর সাইকেল। যমুনার এ চরাঞ্চলে রাস্তা-ঘাট নেই বললেই চলে। কিন্তু তার পরেও ধু-ধু বালু চরে মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েক’শ পরিবার। ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দসী, নিকরাইল, গাবসারা ও অর্জূনা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে- চর ও নদী এলাকার যেসব গ্রামে শুষ্ক মৌসুমে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাতায়াত করতে হত চরের মানুষের। উৎপাদিত পন্য আনা নেওয়া করতে হত পায়ে হেঁটে। সেই সব জায়গায় ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি মোটর সাইকেলে যাতায়াত করছে লোকজন। ভূঞাপুর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল, ব্যাংক-বীমা, কমিউনিটি সেন্টার, এনজিও প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মরত লোকজন প্রতিদিন চরাঞ্চলে যাতায়াত করে। এসব মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা মোটর সাইকেল। তবে চরের অনেক মানুষ এখনও পায়ে হেঁটেই বিশাল বিশাল চর পাড়ি দেয়। চরাঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজতর করেছে মোটর সাইকেল। ঘন বা বেশি বালুর মধ্যে খের (খড়) বিছিয়ে মোটর সাইকেল চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। চরের মানুষজন অস্থায়ী ঘাটে নৌকা থেকে নেমে মোটর সাইকেলে চরে যাচ্ছে গন্তব্বে। অন্যদিকে চরের মানুষকে পারাপাড় করে জীবিকা নির্বাহ করছে কয়েকশত চালক। গাবসারা ইউনিয়নের রুলীপাড়ার মোটর সাইকেল চালক মোকলেছ বলেন, সংসারে তার তিন সন্তান রয়েছে। মোটর সাইকেল চালানো তার পেশা। আগে তিনি ইট ভাটায় কাজ করেছেন। এখন তিনি প্রতিদিন মটর সাইকেল চালিয়ে ৮/৯ শত টাকা আয় করেন। চরাঞ্চলের অনেকেই জানান, চরে ঘোড়ার গাড়ির পাশাপাশি মোটর সাইকেল চলাচল করায় চরের মানুষের দূর্ভোগ কমেছে।

যমুনার নাব্যতা কমে যাওয়ায় সেখানে এখন প্রায় পানী শুন্য, জেগে উঠা চরগুলোতে চাষাবাদ করছে চরাঞ্চলের চাষীরা। ফলে এখানে মানুষের বসতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে। এর সঙ্গে সেখানে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু গরু-মহিষের খামার। এতে পাল্টে যাচ্ছে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলার চরাঞ্চলের অর্থনীতি। । আজ থেকে ২০ বছর আগেও যমুনার তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। তখন কেউ চিন্তাও করতে পারেনি যমুনার বুকে এক সময় চাষাবাদ হবে। কিন্তু যমুনা নদীতে “বঙ্গবন্ধু সেতু” স্থাপিত হওয়ার পর থেকে এর নাব্যতা কমতে থাকে। যমুনার বুক এখন ফসলে ভরা। জেগে উঠা ধু-ধু বালুচরে এখন উঠতি বোর ধানের শোভা পাচ্ছে।

তবে,সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যমুনার হারানো গৌরব ফেরাতে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করার দাবী জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

টাঙ্গাইল জেলার খবর সবার আগে জানতে ভিজিট করুন www.newstangail.com। ফেসবুকে দ্রুত আপডেট মিস করতে না চাইলে এখনই News Tangail ফ্যান পেইজে (লিংক) Like দিন এবং Follow বাটনে ক্লিক করে Favourite করুন। এর ফলে আপনার স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে সয়ংক্রিয়ভাবে নিউজ আপডেট পৌঁছে যাবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.