টাঙ্গাইলের বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে সোনালী ফসল; ব্লাস্টের থাবায় দিশেহারা কৃষক!

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায়ই এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। দিগন্ত জোড়া কাঁচা-পাঁকা ধান আর ধান, কেবল কেটে ঘরে তোলার পালা কৃষকের স্বপ্ন। ধানে ভরবে গোলা, সোনা রঙের ধানের সোনালী হাসিতে ভরে ওঠবে কৃষকের মন; স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ধরা দেবে। কিন্তু সে স্বপ্ন বিনষ্ট করে দিয়েছে সর্বনাশা ব্লাস্ট রোগ। ধানের সবুজ বর্ণ পেঁকে সোনালী হওয়ার পরিবর্তে ফিঁকে হয়ে ক্ষেতের ধান কালচে সোনালী বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে। একই সাথে কৃষকের হাসি- স্বপ্নও এখন ফিঁকে হয়ে গেছে।

ব্লাস্ট রোগের আক্রমনে মাঠের পর মাঠ সোনার ধান ক্ষেত বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে পেঁকে গেছে ক্ষেতের ধান। না, এ ধান পাকেনি। ব্লাস্ট রোগাক্রান্ত হয়ে অকালেই এ রকম কালচে সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে জমির ধান। ধানের শীষে কোন ধান নেই। আছে চিটা। ধান কেটে গরু-মহিষের খাবার করছেন চাষীরা। পরিশ্রমের ফসলের ক্ষেতে হঠাৎ করে ব্লাস্টের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, জেলায় এবার এক লাখ ৭০ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ১৪ হাজার ৩৮০ হেক্টর, বাসাইলে ১১ হাজার ৯০ হেক্টর, কালিহাতীতে ১৮ হাজার ৪০২ হেক্টর, ঘাটাইল উপজেলায় ২০ হাজার ৬৫০ হেক্টর, নাগরপুরে ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টর, মির্জাপুরে ২০ হাজার ৪৮০ হেক্টর, মধুপুরে ১২ হাজার ৪৫০ হেক্টর, ভূঞাপুর উপজেলায় ৬ হাজার ৮১০ হেক্টর, গোপালপুরে ১৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর, সখীপুরে ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর, দেলদুয়ারে ৯ হাজার ৫২১ হেক্টর ও ধনবাড়ী উপজেলায় ১০ হাজার ২৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এবার বোরো’র মাঠ পর্যালোচনা করে কৃষি কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, জেলায় বোরো’র বাম্পার ফলন হবে। কৃষকরাও সে লক্ষে আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু বিধি বাম, তাই ব্লাস্টের আক্রমন বাম্পার ফলনকে ধুলিষ্যাত করে দিচ্ছে।

সরেজমিনে জানা যায়, ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, কৃষি অফিস থেকে সরবরাহকৃত(বীজ) ব্রি-৫৮ ও ব্রি-৮১ জাতের ধানে ব্লাস্টের আক্রমন বেশি। কৃষকদের মতে, রোপণের কিছুদিন পরেই কিছু ক্ষেতে ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দেয়। কৃষি অফিস এ রোগে আক্রান্ত এলাকায় ব্যাপক প্রচারণাসহ কৃষকদের নানা পরামর্শ দেন। কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধান, পরামর্শ ও বিভিন্ন রকম কীটনাশক ব্যবহার করে সে সময় ব্লাস্ট রোগ অনেকটা কমে যায়। কিন্তু ধান পাকার সময় আবার ব্লাস্ট ফিরে আসে আর মাঠের পর মাঠ আক্রান্ত হচ্ছে। কৃষকরা পাঁকা ধান কেটে ঘরে তোলার ঠিক তার আগ মুহুর্তে ফসলে ব্লাস্টের আক্রমণে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। ধানের শীষ বের হওয়ার তিন-চারদিন পরই শীষগুলো মরে যাচ্ছে। ধানের পেটে কোনো চাল নেই। মনে হয় ধানগুলো পেকে গেছে। কাছে গিয়ে দেখা যায় শীষের সবক’টি ধানই চিটা- এতে কোন চাল নেই। এ রোগ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে ইরি- বোরো উৎপাদনে লক্ষমাত্রা অর্জন করা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না।
কালিহাতী উপজেলার বিলবর্ণী, পালিমা, ভিয়াইল, মরিচা, কোকডহরা, চারান, মশাজান; ঘাটাইলের দিগর, ফুলবাড়ী, কাছরা, ভাবনদত্ত, দেওনাপাড়া, কাচতলা, দিঘলকান্দি, দত্তগ্রাম, একাশি, হামিদপুর, দেউলাবাড়ী; গোপালপুরের মাঝিপাড়া, নগদাশিমলা, মির্জাপুর, মোহনপুর; ধনবাড়ী উপজেলার টাকুরিয়া, পলশিয়া, ধরের বাড়ী; মধুপুরের সালিনা, পীরগাছা, বানরগাছি; ভূঞাপুরে অর্জুনা, গোবিন্দাসী, মাটিকাটা; বাসাইলের কাশিল, কলিয়া, ঝনঝনিয়া, কাঞ্চনপুর; মির্জাপুরের গোড়াই, গোড়াইল, বেতুয়া, জামুর্কি, নাটিয়াপাড়া, মহেরা; সখীপুর উপজেলার কীর্ত্তণখোলা, ধুমখালী, গজারিয়া, কচুয়া, কালিয়া, দেবরাজ, বেলতলী, পাথারপুর, ইছাদিঘী, কালিদাস, নলুয়া, বোয়ালী, বড়চওনা, ছোটমৗশা, বেতুয়া, কালিয়ান বহেড়াতৈল; নাগরপুরের ধুবুরিয়া, সলিমাবাদ, মামুদনগর, মোকনা, ভাদ্রা, বেকড়া, আটগ্রাম, সহবতপুর, ভাড়রা, গয়হাটা; দেলদুয়ারের দেউলি, এলাসিন, পাথরাইল, আটিয়া, লাউহাটি, ফাজিলহাটি, ডুবাইল এবং সদর উপজেলার গালা, ঘারিন্দা, করটিয়া, কুইচবাড়ী, বাঘিল, দাইন্যা, পোড়াবাড়ী, চারাবাড়ী প্রর্ভতি এলাকা ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকের চোখের সামনে ক্ষেতের সোনাগুলো ধীরে ধীরে পুড়ে যাচ্ছে- এ দৃশ্য একজন কৃষকের কাছে বড়ই নির্মম।

কালিহাতী উপজেলার বিলবর্ণী গ্রামের কৃষক মিণ্টু মিয়া ৮ বিঘা জমির এক বিঘায় ব্রি-২৮ চাষ করেছিলেন, সব ধান ব্লাস্টে পুড়ে গেছে। একই এলাকার নজরুল ইসলামের এক বিঘার একই অবস্থা। তারা অভিযোগ করেন, রোপণের সময় কৃষি অফিসের লোকজন দেখা-সাক্ষাত করেছে, ব্লাস্ট আক্রমন করার পর তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। একই উপজেলার পালিমা গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তিনি কৃষি অফিসের সিআইজি গ্রুপের সদস্য। তিনি কৃষি অফিসে ট্রেনিং নিয়ে তাদের দেয়া ব্রি-৫৮ ও ব্রি-৮১ জাতের বীজ ৬০ শতাংশ জমিতে রোপণ করেন। ব্লাস্ট আক্রান্ত হওয়ায় কৃষি অফিসের স্থানীয় কর্মকর্তা ‘ব্লাস্টিন’ নামক ওষুধ লিখে দেন। সে ওষুধ নিয়মানুয়ায়ী ব্যবহার করেও কোন সুফল তিনি পান নি। প্রায় একই অভিযোগ করেন, ওই এলাকার কৃষক আব্দুস সামাদ, আলহাজ আ. করিম প্রমুখ।

সখীপুর উপজেলার কৃষক আবুল হোসেন, আবুল কাশেম, মজিদ ও কাইয়ুম আলীসহ অনেকেই জানান, কৃষি বিভাগের দেয়া পরামর্শ মোতাবেক ধান ক্ষেতে ছত্রাক নাশক স্প্রে করেও কোন কাজ হচ্ছে না। বিঘায় বিঘায় জমির ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষকরা সর্বশান্ত হয়ে পড়ছেন।

টাঙ্গাইল খামার বাড়ী(জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) সূত্র জানায়, সাধারণত ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ জাতের ধানে এ রোগটি বেশি আক্রমণ করেছে।

একাধিক কৃষক ও স্থানীয় সার-বীজ ডিলার জানায়, ধানের চারা রোপণের কিছুদিন পর সবুজ পাতায় কালো দাগ দেখা দেয় এবং ধানের পাতা পঁচে যেতে থাকে। ওই সময় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ট্রাইসাইক্লাজোল উপাদানের ট্রুপার-৭৫ ডব্লিউ পি, সেলট্রিমা জাতীয় বিভিন্ন ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হয়। প্রথম দিকে রোগের প্রকোপ কিছুটা কমলেও পরে আবারও আক্রমনের শিকার হন চাষিরা। কীটনাশকেও কোন সুফল পাননি কৃষকরা।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে মোট ১৩৫ হেক্টর জমিতে ব্লাস্টের আক্রমন হয়েছে। ট্রাইসাইক্লাজোল উপাদানের ট্রুপার-৭৫ ডব্লিউ পি, সেলট্রিমা জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করার পর নতুন করে এ রোগ আক্রমণ করার কথা নয়। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না । কৃষি বিভাগের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী সার্বক্ষনিক ফসলের মাঠ মনিটরিং করছে এবং পরামর্শ প্রদান করছে। কিন্তু খুব বেশি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ রোগ একবার হয়ে গেলে আর ভালো করার উপায় থাকে না।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জানান, কিছু কিছু এলাকায় শুধুমাত্র ব্রি-২৮ ধানে ব্লাস্ট আক্রমন করেছে। এতে ভয়ের কিছু নেই, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কৃষকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে লক্ষমাত্রা পুরনে কোন সমস্যা হবেনা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.