ব্রেকিং নিউজ

আত্মশুদ্ধির মাহে রমজান _____রেজাউল করিম

আজ পহেলা রমজান। আহলান সাহলান মোবারক হো মাহে রমজান। পশ্চিম আকাশের বাঁকা চাঁদ পুরো মুসলিম সমাজকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। বছর ঘুরে মুসলিমদের ঘরে ঘরে শুরু হলো মাসব্যাপি পবিত্র মাহে রমজানের ইবাদত বন্দেগী। নিজেদেরকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দরজায় কড়া নাড়ছে।

রমজান অত্যন্ত মর্যাদাশীল মাস। ইসলামের তৃতীয়টি স্তম্ভ। সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে নিজের পরিশুদ্ধি অর্জন ও মহান প্রভুর সান্নিধ্য ও সন্তোষ অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। সিয়াম সাধনা ও তাকওয়ার মাস, কল্যাণ ও বরকতের মাস। কুরআন নাযিলের মাস, সব ধরনের ইবাদতের অসাধারণ মৌসুম। মহান রাব্বুল আলামিন এ মাসটিকে বহু ফজিলত ও মর্যাদা দান করেছেন।

রাব্বুল আলামিন বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে রোজা পালন করে। (সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৫) । আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনরা তোমাদের প্রতি আমি রমজানের রোজাকে ফরজ করেছি। যেমন ফরজ করেছিলাম তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের প্রতি। এতে তোমরা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে পারবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩) ।

রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, রোজাদারের নেক কাজের সওয়াব আমি ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ বৃদ্ধি করে দেই। কিন্তু রোজার সওয়াব একই নিয়মে সীমাবদ্ধ নয়। রমজানের রোজার সওয়াব সম্পর্কে আল্লাাহ তাআলা এরশাদ করেন- নিশ্চয় রোজা আমার জন্য, আর এর প্রতিদান আমি নিজ হাতে দিব। (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)।

হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে, এ মাসের একটি নফল ইবাদত অন্য মাসে একটি ফরজের সমান। আর একটি ফরজ অন্য মাসে ৭০টি ফরজের সমান। রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন, রোজাদারের নিদ্রা ইবাদতের সমতুল্য, তার চুপ থাকা তসবিহ পাঠের সমতুল্য।

কোরআন মজিদে আল্লাাহতায়ালা এরশাদ করেন- রমজান মাসই হল সে মাস যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সুস্পষ্ট পথনির্দেশ। -(সূরা বাকারা, ১৮৫)

হাদিসে রয়েছে- রমজন মাস শুরু হলেই রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয় (সহীহ মুসলিম)। অন্য এক হাদীসে এ মাসের ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে- রমজন মাসের শুভাগমন উপলক্ষে জান্নাতের দরজাসমুহ উন্মুক্ত এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া। শয়তানকে করা হয় শৃংখলাবদ্ধ (বোখারি ও মুসলিম)। এছাড়া আাল্লাহ প্রত্যহ ইফতারের সময় অসংখ্য জাহান্নামিকে মুক্তি দিয়ে থাকেন (মুসনাদে আহমদ)।

প্রকৃতপক্ষে রমজান মাসের রোজা, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, সেহরি, ইফতার, তারাবি নামাজ, সাদাকাতুল ফিতর, জাকাত, দান-খয়রাত প্রভৃতি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতরাজি, যা রোজাদারদের কুপ্রবৃত্তি দমন ও তাকওয়া বা খোদাভীতিপূর্ণ ইবাদতে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা জোগায়।

রমজানের তারাবির নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পূর্ণ ইমান ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্থ গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহীহ আল-বোখারি, হাদিস : ১৯০১, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৫৯, সুনানে দারেমি: ১৮১৭, মুসনাদে আহমাদ : ৯৪৪৫, মুসনাদে হুমাইদি : ১০৩৭)

রাসুলুল্লাহ(সা.)বলেছেন, তোমরা সেহরি খাও। কারণ সেহরির মধ্যে বরকত রয়েছে।(সহীহ আল-বুখারী, হাদিস : ১৯২৩, সহীহ মুসলিম হা : ১০৯৫, ইবনে মাযা, হাদিস : ১৬৯২, জামে তিরমিযী, হাদিস : ৭০৮) ।
ইফতার আরেকটি নেয়ামত।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রসূল (স.) বলেছেন যে, রোজাদার ব্যক্তির জন্য রয়েছে দুইটা আনন্দ। একটা হলো ইফতারের সময়, অন্যটা তাঁর রবের সাথে দেখা করার সময় (বুখারী, মুসলিম)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রসূল (স.) বলেন, পাঁচ ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখান করা হয় না। তাদের মধ্যে রয়েছে রোজাদারের দোয়া। নবী করিম (স.) আরও বলেন, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে তার জন্য গুনাহ মাফ ও জাহান্নামের আগুন হতে নাজাতের উসিলা হবে এবং সে ঐ রোজাদারের সমপরিমান সওয়াব লাভ করবে। এতে রোজাপালনকারীর সওয়াব বিন্দুমাত্র কমবেনা।রোজার আরেকটি নেয়ামত হলো শবে কদর। শবে কদর রমজানের মধ্যেই। রাসুলে (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদরকে সন্ধান করো (মুসলিম)।

মনে রাখতে হবে, আরবিতে দিনের আগে রাত গণনা করা হয়। আল্লাহ বলেন, অবশ্যই আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল কদরে নাজিল করেছি। লাইলাতুল কদর হচ্ছে এমন রাত যা হাজার মাস থেকে উত্তম। (সূরা কদর আয়াত ১-৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে কদরের রাত জেগে ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি শরিফ, ইমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ২৫, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা ২৯-৩০, হাদিস: ৩৪) যা পূর্ববর্তী নবী রাসুলদের উম্মতদের জন্য ছিল না।

রোজার আরেক নেয়ামত ইতেকাফ। রমজানের শেষ ১০ দিন জাগতিক কাজ কর্ম ও পরিবার পরিজন থেকে বিছিন্ন হয়ে আল্লাহ্কে রাজি-খুশি করতে নির্দিষ্ট স্থানে ইবাদতের উদ্দেশ্যে অবস্থান করা। ‘আমি ইব্রাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারীদের জন্য, ইতেকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তার নামে) রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখে’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)। মা আয়শা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) প্রতি বছর রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করতেন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি এই নিয়ম পালন করেন (বুখারি)।

রমজানে পূর্বের গুনাহর কথা স্মরণ করে অনুতপ্ত হতে পারি। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত , তারাবি নামাজে কোরআন খতমসহ বিভিন্ন নফল ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারি। গুনাহ মাফের এই মাসে সকল পাপাচার, অন্যায়, অপরাধ, অপকর্ম, অশ্ল¬ীলতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুষ্কৃতি মিথ্যাচার, পরচর্চা, ক্রোধ, হিংসা, নিন্দা, অহঙ্কার, আত্মগর্ব, কৃপণতা, চোগলখোরী ইত্যাদি থেকে বিরত থেকে নিজেকে আত্মশুদ্ধির একটি সুবর্ণ সুযোগ।
রমজানে মুসলমানের জীবন-জীবিকার সর্বত্র সততা, সংযম ও পবিত্রতার ছোঁয়া লাগবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোতে ব্যবসায়িরা সারা বছর ব্যবসা করেন। রমজানে সকল পন্যে ছাড়ের প্রতিযোগিতায় নামেন। আমরাও যেন তাদের মতো নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি না করে অল্প লাভে অধিক বিক্রির সুযোগ নিতে পারি। কিন্তু এ মাসে কেও কেও ন্যায়নীতি ভুলে অতি মুনাফা লাভের প্রতিযোগিতায় নামে। রমজানে চাহিদা বেড়ে যাওয়া বিশেষ কিছু খাদ্যদ্রব্যের পাইকারি ও খুচরা দোকানিরা সিন্ডিকেট করে তোলে। অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়। রমজানের শিক্ষা অনুসরণের বদলে কেও যেন আরও সুযোগসন্ধানী ও বেপরোয়া হয়ে না ওঠে। রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা প্রয়োজন। রমজানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখাটা জরুরি। যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে ।

আমরা ভুলের বশে, লোভে পড়ে, বুঝে বা না ঝুঝে, শয়তানের প্ররোচনায় অথবা ক্ষমতার দাপটে প্রতিনিয়ত গুনাহ করে থাকি। গুনাহর পরিমান পাহার সমান হয়ে গেছে। তবুও আল্লাহ আমাদেরকে তার নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করেনি। গত রমজানেও যারা এই দুনিয়াতে বেঁচে ছিলেন আজ তারা এই রমজানের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত। আল্লাহ আমাদেরকে রোজা পর্যন্ত নেক হায়াত দিয়েছেন এজন্যও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। পবিত্র রমজানে তওবা আর ইবাদত করে নিজেদেরকে আত্মশুদ্ধি করার চেষ্টা করি। গুনাহ মাফের এই সুযোগ পেয়েও যদি আমরা গুনাহ মাফ করাতে না পারি তাহলে আমাদের মতো দুর্ভাগা আর কেও নেই। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি তাহলে হাসরের ময়দানে আল্লাহ তাআলার কুদরতি হাত থেকে পুরস্কৃত হতে পারবো। আল্লাহ পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলমানকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ দিন।

লেখক : একজন সংবাদ কর্মী

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.