মানসিকতা পরিবর্তনে চিকিৎসা দরকার

রাষ্ট্রের মালিক কে? একবাক্যে সবাই বলবেন জনগণ। জাতীয় পুঁজি সমৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা কার? এ প্রশ্নের জবাবও সেই জনগণ। কার আমানতের টাকায় ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চাকা সচল থাকে? এখানেও কোনো ব্যাতিক্রমী উত্তর নেই। কিন্তু তারপরও জনগণের আমানতে চলা ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বদান্যে দেশের কিছু মানুষ আজ দেশের সিংহভাগ সম্পদের মালিক। মালিক হওয়াতে জনগণের কোনো আক্ষেপ নেই। তবে অভিযোগ আছে। তাদের মতে, জনগণের আমানত হিসেবে রাখা বেশির ভাগ টাকারই অপব্যবহার করা হচ্ছে। চলে যাচ্ছে এমন একটি প্রবাহে, যেখান থেকে ফেরত আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আর সেই প্রবাহের নাম ঋণখেলাপি।

ঋণখেলাপি এখন একটি রোগের নাম। এ এক অদ্ভুত রোগ! যে রোগে রোগীদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ক্ষতি যা কিছু হওয়ার তার সবটুকুই জাতি এবং রাষ্ট্রের। খেলাপিদের তাতেও কোনো মাথা ব্যথা নেই। তারা ‘চারবাক’ দর্শনে বিশ্বাসী। এরা ঋণ করে ঘি খাওয়ার মাঝেই আনন্দের সন্ধান করেন। ওরা থাকেন শতকোটি টাকার আলিশান বাড়িতে। চড়েন কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি। নামে-বেনামে কেনেন জমি। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হয় এদের সেকেন্ড হোম। পাচার করেন অর্থ। এদের সবকিছুই চলে সাবলীল গতিতে। কেবল ব্যাংক ঋণের টাকা পরিশোধ করাতেই যত অনীহা। টাকার পুরোটাই আসে ব্যাংক ঋণের টাকা থেকে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আমানত রাখা অর্থের উৎস থেকে।

অর্থমন্ত্রী গত শনিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন। এই খেলাপিদের কাছে চলতি সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিতরণ করা ঋলের পরিমাণ ৭০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ৫২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, যার ৫০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা খেলাপি। অর্থাৎ এদের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই টাকায় দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যায়।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, দেশে বর্তমানে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা আগের তুলনায় বেশ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে বড় ও প্রভাবশালী ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ ছাড়া বড় কিছু গ্রাহকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত। এরা বিভিন্ন উপায়ে ঋণের নামে প্রচুর টাকা বের করে নিয়েছেন এবং নানামুখী কাজে ব্যয় করেছেন। কিন্তু ঋণ ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এ ছাড়া এসব ঋণের বিপরীতে যে জামানত নেওয়া হয়, তাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে মামলা করেও ঋণ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের মতে, ঋণখেলাপিরা যে টাকায় জমি, বাড়ি, গাড়ি বা বিদেশে নতুন ঠিকানা গড়েছেন—তাদের এই বিলাসী জীবনের সবটুকুর পেছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা। এ টাকা খেয়ানত করার অধিকার কারো নেই।

বিষয়টি সত্য হলেও, খেয়ানত থেমে থাকেনি। আমরা মনে করি, এবার কিছুটা হলেও লাগাম টেনে ধরা হবে। অর্থমন্ত্রীর তালিকা প্রকাশ জনমনে সে আশার সঞ্চার করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্সের কথা মনে রেখে আগামী প্রশাসন সেভাবেই এগিয়ে যাবে এবং খেলাপিঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সম্পাদকীয়,

প্রতিদিনের সংবাদ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.