ব্রেকিং নিউজ

স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল বাংলাদেশ; সাকিব ঝড়ে উড়ে গেল আফগানিস্তান

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: লড়াইটা হওয়ার কথা ছিল দু দলের স্পিনারদের সাথে। আফগানিস্তানের নবী-রশিদ-মুজিবের সাথে লড়াই হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের সাকিব আর মিরাজের। এ লড়াইয়ে আফগান ত্রয়ীকে একাই হারিয়ে দিলেন সাকিব। যেখানে আফগানদের তিন স্পিনার নিয়েছেন ৪ উইকেট, সেখানে সাকিব একাই নিয়েছেন ৫ উইকেট।

বিশ্বকাপের এবারের আসরে এতদিন প্রতিপক্ষ পেসাররা পরীক্ষা নিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। সে সব পরীক্ষায় বেশ সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন সাকিব-মুশফিক-তামিমরা। গতকাল ছিল আফগান স্পিনারদের সামনে পরীক্ষা। আর সে পরীক্ষায় টাইগার ব্যাটসম্যানরা পাস করলেন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে। আগের ম্যাচে ভারতকে নাচিয়ে ছাড়া আফগানরা ছড়ি ঘুরাতে চেয়েছিল বাংলাদেশের ওপরও। কিন্তু উল্টো টাইগারদের থাবায় রক্তাক্ত হতে হলো আফগান যোদ্ধাদের। এর আগে এশিয়া কাপে সর্বশেষ দেখায় জয় পাওয়া বাংলাদেশ অব্যাহত রাখল জয়ের ধারা। আর বিশ্বকাপে দুই দেখায় দুবারই পরাভূত হল আফগানিস্তান। একজন সুপার সাকিব যে একাই ধসিয়ে দিতে পারে প্রতিপক্ষকে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেল আফগানরা।

সাউদাম্পটনের রোজ বৌল স্টেডিয়ামটি বেশ পরিচিত আফগানদের। কারণ তারা তিনটি ম্যাচ খেলল এ মাঠে। যেখানে বাংলাদেশ গেল প্রথম খেলতে। বড় মাঠ, আফগানদের স্পিন হুমকি কোন কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের সামনে। অদম্য স্পৃহা, অটুট লক্ষ্য আর সেমিফাইনালের স্বপ্ন সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে দেখা গেল ভিন্ন চেহারায়। আগের ম্যাচে রানের পাহাড় গড়া অস্ট্রেলিয়াকে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সে ম্যাচে জিততে না পারার ঝালটা যেন শতভাগ মিটিয়ে নিল আফগানদের ওপর। ৬২ রানের অসাধারণ এক জয়ে সেমিফাইনালের পথে থাকল বাংলাদেশ।

ব্যাট হাতে অর্ধশতক করার পর বল হাতে সাকিব বোকা বানিয়ে দিলেন আফগান ব্যাটসম্যানদের। তার স্পিন ইন্দ্রজালে পথ হারিয়ে ফেলে আফগানদের ব্যাটিং লাইন। ম্যাচের আগেরদিন আফগান স্পিনার মোহাম্মদ নবী নিজেদের ফেভারিট বলেছিলেন। তবে যে দলে একজন সাকিব থাকেন সে দলকে নিয়ে মন্তব্য করতে কতটা সংযত হওয়া দরকার সেটা বোধহয় আর বুঝাতে হবে না মোহাম্মদ নবীকে। দারুণ এবং অতি প্রয়োজনীয় এক জয় দিয়ে বিশ্বকাপে আবার জয়ের ধারায় ফিরল বাংলাদেশ। সে সাথে শেষ চারের পথে বেশ ভাল ভাবেই থাকল টাইগাররা। প্রসঙ্গত, এর আগে টাইগারদের কাছে পরাভূত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

টসে হেরে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ উদ্বোধনী জুটিতে পরিবর্তন এনে ইনিংস শুরু করে। তামিমের সঙ্গী হিসেবে গতকাল মাঠে নামানো হয় লিটন দাশকে। শুরুটা মন্দ করেনি এই জুটি। কিন্তু ২৩ রানের বেশি স্থায়ী হতে পারেনি । ইনিংসের পঞ্চম ওভারের দ্বিতীয় বলে বিদায় নেন লিটন দাস। মুজিব উর রহমানের বলে শর্ট কাভারে হাশমতউল্লাহ শহিদির ক্যাচে পরিণত হন লিটন। তবে এই ওপেনারের আউটে পাকস্তানী আম্পায়ার আলিম দারের দায়টা অনেক বেশি। কারণ টিভি রিপ্লেতে দেখা গেছে বলটি ধরার সময় মাটিতে লেগে গিয়েছিল। ১৬ রান করে ফিরেন লিটন। দ্বিতীয় উইকেটে তামিমকে নিয়ে

বেশ ভালই এগিয়ে যাচ্ছিলেন সাকিব। তিন নম্বর পজিশনটাকে নিজের করে নেওয়া সাকিব আবারো খেলেন দুর্দান্ত। গড়লেন ৫৯ রানের জুটি। ধৈর্য হারা তামিম ফিরলেন নবীর বলে বোল্ড হয়ে। এবারো নিজের ইনিংসটাকে লম্বা করতে পারলেন না তামিম। আগের বলে চার মেরে পরের বলে বোল্ড হলেন কাট করতে গিয়ে। তামিম থামলেন ৩৬ রানে।

এরপর মুশফিককে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা সাকিবের। জুটিতে এলো ৬১ রান। সাকিব তুলে নিলেন আরেকটি হাফ সেঞ্চুরি। এবারের বিশ্বকাপে এটি তার পঞ্চম হাফ সেঞ্চুরি (ক্যারিয়ারে ৪৫ তম) – যার মধ্যে দুটিকে নিয়ে গেছেন সেঞ্চুরিতে। এই ইনিংস খেলার পথে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে করলেন এক হাজার রান। সে সাথে ডেভিড ওয়ার্নারকে টপকে আবার রান সংগ্রহে সবার উপরে উঠে এলেন সাকিব।

কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি পূরণের পর ফিরলেন মুজিব উর রহমানের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে। এরপর দলকে টানলেন মুশফিক এবং মাহমুদুল্লাহ। মাংস পেশিতে টান পড়ার পরও লড়াই করে গেছেন মাহমুদুল্লাহ। অবশ্য তার আগে জায়গা বদলে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ব্যর্থ হন সৌম্য। মুজিবের বলে নিজে ফিরে আসার পাশাপাশি রিভিউটাও নষ্ট করে এলেন সৌম্য। তবে মাহমুদুল্লাহকে নিয়ে ভালই এগিয়ে যাচ্ছিলেন মুশফিক। ৫৬ রান আসে এ জুটিতে। মাহমুদুল্লাহ ফিরলেন ২৭ রান করে। এরই মধ্যে নিজের আরেকটি হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন মুশফিক।

সেটাকে সেঞ্চুরিতে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলেন না। মোসাদ্দেককে নিয়ে ৪৪ রান যোগ করার পর মুশফিক ফিরলেন ৮৩ রান করে। আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা মুশফিক তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের ৩৫ তম হাফ সেঞ্চুরি। ৮৭ বলের ইনিংসটি মুশফিক সাজান চারটি চার আর একটি ছক্কায় । শেষ দিকে মোসাদ্দেকের ২৪ বলে ৩৫ রানে ২৬২ রানে পৌছে বাংলাদেশ। আফগানদের পক্ষে সেরা বোলার ৩৯ রানে ৩ উইকেট নেওয়া মুজিব উর রহমান। রশিদ খান ৫২ রান দিলেও পাননি কোন উইকেট।

২৬৩ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নামা আফগানরা শুরুটা করেছিল ভালই । প্রয়োজনীয় রান রেটের সাথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন দুই ওপেনার গুলবাদিন নাইব এবং রহমত শাহ। ৪৯ রানে তাদের আলাদা করেন সাকিব। ২৪ রান করা রহমত শাহকে ফেরালেন ক্যাচে পরিণত করে। মাশরাফি, মোস্তাফিজ, সাইফ উদ্দিন, মিরাজরা ব্যর্থ হলে মাশরাফি আক্রমণে আনেন মোসাদ্দেককে।

নিজের চতুর্থ ওভারেই সফল মোসাদ্দেক। ফেরালেন ১১ রান করা হাসমত উল্লাহকে। মুশফিকের ত্বরিৎ স্টাম্পিংয়ে আর ফিরতে পারেনি হাসমত উল্লাহ। এরপর আবার সাকিব ভেল্কি। নিজের পঞ্চম ওভারের প্রথম বলেই ফেরালেন ওপেনার গুলবাদিন নাইবকে। ৪৭ রান করা নাইবকে সাকিব পরিণত করলেন লিটনের ক্যাচে। এক বল পর আগের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি করা মোহাম্মদ নবীকে রানের খাতাও খুলতে দিলেন না। ব্যাট আর প্যাডের মাঝখান দিয়ে বোল্ড করে দিলেন নবীকে।

এক ওভার পর আবার সাকিবের আঘাত। এবার তার শিকার আফগান অধিনায়ক আজগর আফগান। ২০ রান করা আজগর সাকিবকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ধরা পড়েন সাব্বিরের হাতে। ১১৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়া আফগানিস্তানকে টানতে পারেননি সামিউল্লাহ এবং ইকরাম। মিরাজের বল শর্ট কাভারে ঠেলে দিয়ে রান নিতে চেয়েছিলেন ইকরাম। কিন্তু বিদ্যুৎ গতিতে বল থ্রো করেন লিটন উইকেটে। ততক্ষণে ফিরতে পারেননি ইকরাম। রান আউট হয়ে ফিরলেন আফগান উইকেট রক্ষক। এরপর বাংলাদেশের বোলারদের উপর চেপে বসার চেষ্টা করেছিলেন সামিউল্লাহ সেনওয়ারি এবং নাজিবুল্লাহ জাদরান।

বাংলাদেশের জয়টাকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করছিলেন এ দুজন। আবার ত্রাতা হয়ে এলেন সেই সাকিব। নাজিবুল্লাহ জাদরানকে ফিরিয়ে ৫৬ রানের এজুটি ভাঙ্গেন সাকিব। সে সাথে তুলে নেন বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত ৫ উইকেট। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোন বোলার হিসেবে প্রথমবারের মত ৫ উইকেট নিলেন সাকিব। এরপর রশিদ খানকে উইকেটে দাড়াতেই দিলেন না মোস্তাফিজ। নিজের অষ্টম ওভারে দৌলত জাদরানকে রানের খাতা খোলার আগেই ফিরিয়েছেন মোস্তাফিজ।

কিন্তু নাচোড় বান্দা সামিউল্লাহ সেনওয়ারি যেন হার মানতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানানো যায়নি। তবে তার দল হার মেনেছে। সেনওয়ারি লড়াই করে বাংলাদেশের জয়টাকে বিলম্বিত করেছেন মাত্র। ৫১ বলে সেনওয়ারির ৪৯ রানের ইনিংসটি কোন কাজে আসল না। মুজিবকে বোল্ড করে যখন আফগানদের ইনিংসের ইতি টানেন সাইফ উদ্দিন তখনো জয় থেকে ৬২ রান দরে আফগানিস্তান। সাকিব নিয়েছেন ৫ উইকেট আর মোস্তাফিজের শিকার ২ উইকেট। টানা তিন ম্যাচে ম্যাচ সেরার পুরষ্কার জিতে সাকিব যেন গড়লেন আরো একটি রেকর্ড।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.