ব্রেকিং নিউজ

কঠোর হোক মাদকবিরোধী অভিযান

দেশ জুড়ে যে সমস্যাটি এখন সবার মাথাব্যথার কারণ, তা হলো মাদক সেবন ও তার লেনদেন ঘিরে বিশাল ব্যবসা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মাদক ব্যবসা এমন একটি ব্যবসা, যে ব্যবসার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই কোটি কোটি টাকা উপার্জন করা সম্ভব। ফলে দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রীসহ বিভিন্ন বয়সের এবং সমাজের নানা স্তরের মানুষ জড়িত হয়ে গেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও কেউ কেউ নানাভাবে জড়িয়ে গেছে মাদক ব্যবসার সঙ্গে। ফলে হয়েছে কী, কোথাও কোথাও ‘শর্ষের ভেতর ভূত পাওয়া’র মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। এর যেন শেষ নেই।
বেশিদিন আগের কথা নয়, ১৫ মে থেকে সরকারি তরফ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাদকাসক্তি ও বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্যের বেচাকেনা বন্ধ করে মাদকের দ্বারা উদ্ভ‚ত নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়া। কিন্তু শেষাবধি সরকারের এই শুভ উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে বা হয়নি, এ নিয়ে নানারকম কথা আছে, বিতর্কও আছে। স্মরণ করা যেতে পারে,  ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদকের বিরুদ্ধে এভাবেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ওয়ার অন ড্রাগস নামে। বছর দুয়েকের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ‘ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি’। এই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়েছিল মেক্সিকো এবং কলম্বিয়া। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের পরও আমেরিকার মাদকাসক্তের সংখ্যা ১০ শতাংশ থেকে খুব কমেছে বলে মনে হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্যও কমেনি।
এর চেয়েও বড় মাদকবিরোধী যুদ্ধ ঘোষণা ছিল ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তের। তিনি তো মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে মানুষই মেরে ফেলেছেন ১০ হাজারের ওপরে। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে মৃতের সংখ্যা শ’ দেড়েকের মতো। মাদকের কবলে পড়ে আমাদের দেশের বিশেষ করে, তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী আর নিম্নশ্রেণির খেটে খাওয়া এক বিশাল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ফলে বাবা-মায়ের মনোকষ্টের শেষ নেই। খেটে খাওয়া মাদকসক্ত মানুষদের বৌ-ঝিদের চোখের জল আর শুকায় না। নির্যাতনের দাগ মোছে না।
সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি হয়েছিল সাধারণ মানুষ। কারণ তাতে তাদের ঘরে শান্তি ফিরে আসবে এটাই ছিল বড় আশা। কিন্তু মাদকের মরণ নেশা যাকে একবার ধরে, তাকে সহজে যে ছাড়ে না। তার প্রমাণ পাওয়া যায় চারদিকে একবার তাকালেই। পত্র-পত্রিকায় মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মা-বাবা মৃত্যুর খবর তো মাঝেমধ্যেই পাওয়া যায়। অভিজ্ঞজনরা বলেন, দেশে যত ধর্ষণ, খুন আর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকে মাদকের প্রভাব।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা ধরনের অভিযানের কারণে মাঝেমধ্যেই যেমন অনেক মাদক কারবারির মৃত্যু হয়েছে ক্রসফায়ারে। তেমনি হাজার হাজার মানুষকে আটক বা গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। রুজু করা হয়েছে বিভিন্ন ধারায় মামলা। কিন্তু দেশের নানা জায়গায় দায়ের করা এই হাজার হাজার মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না দু-চার বছরেও। সমস্যা হয় নানাভাবে, যেমন তারিখের পর তারিখ পড়লেও বিচারের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না যথাসময়ে, আইও যান বদলি হয়ে, দক্ষ সরকারি উকিল পাওয়া যায় না কাজের সময় ইত্যাদি। ফলে বিচার শেষ হয় না, শস্তিও হয় না কারোর। সময় চলে যায়। মাদক ব্যবসা যারা করে তারা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্থানীয় থানা পুলিশ ম্যানেজ করে। এই ম্যানেজের মধ্যেই কোথাও কোথাও পুলিশ সদস্যের কেউ কেউ এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় অনেক বেশি অর্থোপার্জনের লোভে। সাম্প্রতিক সময়ে এর দৃষ্টান্ত আসামি ছেড়ে দিয়ে আটক ইয়াবা ভাগ-বাটোয়ারা ও বিক্রির প্রস্তুতির সময় গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে। এদের মধ্যে একজন গুলশান থানার এএসআই এবং এপিবিএন-এর একজন নায়েক ও তিনজন কনেস্টবল। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে মাদকের এই ভাগাভাগির ব্যবসা বন্ধ হবে কেন? আর বন্ধ করবেই বা কে? ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ীরা এক জায়গায় তো ব্যবসা প্রসারে নতুন টোপ ফেলেছে। ১৫টি ইয়াবা নিলে ৩টা ফ্রি।
এদিকে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আশ্রয়প্রাপ্ত লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে আরেকটি আশঙ্কার বিষয় আমাদের সবার মনে ধীরে ধীরে দানা বাঁধছিল, তা হলো কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি। সেই আশঙ্কা যে ইতোমধ্যেই সত্যে পরিণত হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসছে , টেকনাফ ও উখিয়ায় মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বসতি ক্যাম্পের বেশিরভাগ ঘরই এখন ইয়াবার গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বলে জানা গেছে। মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তের নাফ নদী পার করেই ইয়াবার চালানগুলো এনে সংরক্ষণ করা হচ্ছে রোহিঙ্গা বসতির ওইসব ঘরে। পাহাড়ের এই ঘনবসতিপূর্ণ ঘরগুলোতে ইয়াবা মজুদের তথ্য ও অভিযোগ থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরের ঘরে ঘরে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা সংরক্ষণ এবং তা ঠেকাতে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চালাতে সীমাবদ্ধতা এ দুটোই নানা প্রশ্ন ও আশঙ্কা জাগানোর মতো খবর। প্রকাশিত ওই রিপোর্টে আরও খবর আছে যে, ওপারে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের সরাসরি সহযোগিতা করছে। এ খবরটিও উদ্বেগজনক। আমাদের আইনশৃঙ্খলা, রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান এখনও চলমান রয়েছে। ফলে প্রায় সবখানেই মাদক ব্যবসায়ীরা বেশ অসুবিধায় পড়েছে। কক্সবাজার এবং তার আশপাশের অঞ্চলেই নিহত হয়েছে ৩৫ জনের মতো এবং আটক করা হয়েছে হাজার হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রাকডাউনের কারণে বহু মাদক ব্যবসায়ী এখন তাদের এলাকা ছাড়া। তাই ব্যবসায় কিছুটা ঢিলা ভাব আছে। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে দেখা যায়, ব্যবসার এই সাময়িক শূন্যস্থানটি পূরণ করেছে রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তারা ব্যবসা চালু করে আরও বেশি লাভবান হয়েছে। অনেক রোহিঙ্গাই ইতোমধ্যে কোটিপতি হয়ে গেছে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে। বাংলাদেশের জন্য এটা রীতিমতো অশনিসংকেত। আমাদের আইনশৃঙ্খলা, রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবতে হবে, কীভাবে এই ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা যায়। এভাবে আরেকটি নতুন সমস্যা যোগ হচ্ছে মাদক ব্যবসা দমনের ক্ষেত্রে।
একটা ব্যাপার একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সেটা হলো ইয়াবার অবাধ ব্যবহার। আগে যেমনটা ছিল ফেনসিডিলের। ইয়াবা মূলত যৌন উত্তেজনা উদ্বেগকারী ট্যাবলেট। তরল ফেনসিডিল প্রধানত উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী এবং পরে ঝিমুনি আনা মাদকজাতীয় দ্রব্য। মূলত ফেনসিডিল কাশির ওষুধ হিসেবেই বাজারজাত হয়েছিল একসময় আমাদের দেশেও। এখন বন্ধ। ভারতে কোথাও কোথাও এখনও সম্ভবত চলে। এক শ্রেণির মানুষ এই সিরাপটির সঙ্গে আরও কিছু মিশিয়ে এটাকে নেশাদ্রব্যে পরিণত করে বছরের পর বছর ধরে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফেনসিডিলের বেশিরভাগ চালানই আসত পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অঞ্চল থেকে। এখনও আসে, তবে আগের তুলনায় পরিমাণে কম। কারণ বেশিরভাগ মাদকসেবীই এখন ইয়াবার গোলাপি ট্যাবলেটে আসক্ত। যার বড় সরবরাহকারী মিয়ানমার। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে দুর্বল করতে মিয়ানমারের তেমন কিছুই করা লাগছে না। তথাকথিত দুটি অস্ত্র বা কৌশল কাজে লাগিয়েই নিজেদের ষোলোআনা স্বার্থোদ্বার করছে। দুটোর একটি হচ্ছে অমানবিক নির্যাতনের পরে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আপন দেশ থেকে তাড়িয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া, দ্বিতীয়টি হচ্ছে্ছে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবার কারখানা স্থাপন করে সেখান থেকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া। এই দুই ক্ষেত্রেই মিয়ানমারের লাভ ষোলোআনা রোহিঙ্গাদেরও তাড়ানো হলো আর মাদকের বিশাল ব্যবসাও চালু রইল। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নানাভাবে ক্ষতি দুটাতেই।
এই অভিশাপ থেকে আমরা কবে মুক্ত হব, কেউ কি জানি? বলা হয়, মিয়ানমার ও ভারত সীমান্ত অঞ্চলের প্রায় হাজারখানেক পয়েন্ট দিয়ে মাদকের এই অবৈধ চোরাচালান চলে। বেশ কিছুদিন আগে এই পয়েন্টগুলো সিল করে দেওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল। কতগুলো সিল করা সম্ভব হয়েছে, কে জানে। বছরে বিভিন্ন মাদকের কেনাবেচার বাণিজ্যে লেনদেনের পরিমাণ অনুমান করা হয় ৬-৮ হাজার কোটি টাকা। মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভাবি, এতসব সংকট, সমস্যা আর অদ্ভুত পরিবেশের মধ্য দিয়ে কীভাবে বেড়ে উঠছে আমাদের নতুন প্রজন্ম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.