ব্রেকিং নিউজ

আর কোনো অন্যায়কেই প্রশ্রয় নয়

সারা দেশে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ  এখন ‘ক্যাসিনো’। শব্দটির সঙ্গে পরিচয় ঠিক কবে, নির্দিষ্ট করে সে দিন-তারিখ মনে নেই। তবে এটুকু মনে করতে পারি, শব্দটির পরিচিতির সঙ্গে সঙ্গে তা দৃশ্যমানও হয়ে উঠেছিল। জানা-শোনার সেই সুযোগ হয়েছিল জেমস বন্ড সিরিজের ছবির মাধ্যমে। আমার সময়ের অনেকেরই হয়তো ক্যাসিনোর অভিজ্ঞতা পর্দায়, চলচ্চিত্রের দৃশ্যে। এরপর সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা সিরিজে। আর এক টিকেটে দুই ছবির যুগে পর্দার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ও কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন শ্যারন স্টোন। তার সঙ্গে পরিচয়ের মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তো ‘ক্যাসিনো’র হাত ধরেই। নিকোলাস পিলগির ‘লাভ অ্যান্ড অনার ইন লাসভেগাস’ অবলম্বনে মার্টিন স্কোরসেজির ‘ক্যাসিনো’ মুক্তি পেয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। তখন কলেজের চৌকাঠ পেরিয়েছি সবে। এরও অনেক পরে ক্যাসিনোকে নতুন করে চিনিয়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ তার আত্মজৈবনিক গদ্যে। ক্যাসিনো বলতে চোখের সামনে যে দৃশ্য ভাসে তার বেশিরভাগই কবি নির্মলেন্দু গুণের বর্ণনা। লাসভেগাসে ক্যাসিনোর স্বর্গ, তা তো নব্বইয়ের দশকেই জানা। এরপর সত্যিকার অর্থে ক্যাসিনো নিয়ে বড় রকমের কৌতূহল ছিল না। শব্দটির প্রায়োগিক দিক সম্পর্কেও ধারণা ছিল না। বিভিন্ন দেশে ক্যাসিনোর বিস্তার সম্পর্কে কালেভদ্রে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন থাকলেও, তাতে আগ্রহ ভরে উঁকি দেওয়া হয়নি। উপমহাদেশের দেশগুলোর মাঝে নেপালে ক্যাসিনোর প্রসার সম্পর্কে শুনেছি। নেপাল দর্শনের সুযোগ হলেও, ক্যাসিনো দর্শন হয়নি। কবি নির্মলেন্দু গুণ লাসভেগাসে কয়েকশ ডলার খুইয়েছিলেন। আমার অত সাহস নেই। ফলে লাসভেগাস না হলেও, নেপালেও আমার ক্যাসিনো দর্শন হয়নি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দু। তেমনি ঘরের কাছে, খোদ রাজধানীতেও যে রয়েছে ক্যাসিনো, তা জানতেই পারিনি। ঘর রেখে বাইরের দুনিয়ার খবর হাতড়ে বেরিয়েছি।
২.
জুয়া শব্দটি আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংবাদপত্রে প্রায় ধারাবাহিকভাবে নানা জেলায় মেলা বসার খবর প্রকাশ পায়। এসব মেলারই কোনো কোনোটিতে বসে জুয়ার আসর। সেগুলোর নেতিবাচক দিকই মূলত খবর হয়ে সংবাদমাধ্যমে আসে। এসব মেলার জুয়ার আসরে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। কোনো কোনো মেলায় বসানো হয় হাউজি খেলাও। মেলার স্থান নির্ধারিত থাকে না। মাঠে বা ফাঁকা স্থানে মেলার আয়োজন হয়। অন্যদিকে ক্যাসিনোর জন্য নির্ধারিত স্থান থাকে। স্থায়ীভাবে কোনো বাড়িতে বা ভবনে বসে জুয়ার এই আসর। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন, তেমনি আমাদের প্রচলিত আইনেও জুয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু কোনো ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে যেন এই ক্যাসিনোর ব্যবসা কয়েক বছরে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। যা সরকার প্রধানের কড়া নির্দেশে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত না হলে হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানাই থেকে যেত।
পর্যটননির্ভর দেশে, পর্যটক আকর্ষণের একটি বড় অনুষঙ্গ ক্যাসিনো। তবে সেগুলো পরিচালনার জন্য দেশগুলোর কিছু পদ্ধতিগত নিয়ম-নীতি রয়েছে। কিন্তু আমাদের এ নিয়ে কোনো নিয়ম-নীতি যে নেই, তা ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য, অন্যান্য দেশে পর্যটক আকর্ষণের জন্য ক্যাসিনোর প্রসার হলেও, আমাদের এখানে ক্যাসিনোর প্রসার ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীতেই খেলাধুলার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বেড়েছে খেলার প্রচার ও প্রসার। অন্যান্য পেশার মতো খেলাও হয়ে উঠেছে সার্বক্ষণিক একটি পেশা। প্রচার, প্রসার এবং খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের জন্য প্রয়োজন নগদ টাকার। সেই টাকার জোগান কোথা থেকে আসবে? অন্যান্য দেশের কথা এখানে আলোচনার বাইরে রাখছি। আমাদের অনেক ক্লাবেরই নেই স্থায়ী আয়ের সংস্থান। এক সময় যে ক্লাবগুলো নামি এবং সেরা খেলোয়াড়ের জোগান দিত, এখন তারা অনেক পিছিয়ে। কারণ তাদের হাতে নেই প্রয়োজনীয় টাকা। টাকার অভাবেই অনেক ক্লাব ভালো দল গড়তে পারে না। বেশি টাকা দিয়ে নামি ও ভালো খেলোয়াড়দের দলে আনতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়তে হয় প্রতিযোগিতায়। এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতেই ক্লাবগুলোতে সচেতনভাবে শুরু হয় ক্যাসিনো। যারা খেলা ভালোবাসে, যারা চায় আমাদের খেলোয়াড়রাও আলোচনায় আসুক। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সাথে আক্রীড়াবিদরাও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। বয়ে আনুক দেশের সুনাম তারা অপরাধ জেনেও তাই প্রশ্রয় দিয়েছে ক্লাবগুলোর এই আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডকে। গণমাধ্যমগুলোও স্থানীয় মেলাগুলোয় জুয়ার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে যেভাবে সোচ্চার, ঠিক সেভাবে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে নয় তার কারণও হয়তো খেলার প্রতি ভালোবাসা। তাই রাজধানীর আরামবাগ ক্লাব যেবার স্বাধীনতা কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন ক্লাবটির আয়ের প্রধান উৎস যে জুয়া-ক্যাসিনো তা প্রকাশ করেই বলা হয়, ফুটবলের উন্নয়নে ক্লাবটি বিনিয়োগ করেছে তাদের চালানো ক্যাসিনো থেকে আয়। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, ক্রীড়ার প্রতি ভালোবাসা থেকে ক্লাবগুলোর আয় বাড়াতে চালানো ক্যাসিনোর প্রতি যে প্রশ্রয়, তাকে অনেকেই ব্যবহার করেছে আরও বেশি অসৎ উদ্দেশ্যে। ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের পর সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, অনেক ক্লাব এই নীরব প্রশ্রয়কে কাজে লাগিয়ে শুধু ক্যাসিনোই চালু রেখেছে। ক্লাবগুলো থেকে পুরোই হারিয়ে গেছে খেলা। সেই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি আহত করেছে সাধারণ মানুষকে।

অন্যায় সব সময়ই অন্যায়। তা যে উদ্দেশ্যেই করা হোক না কেন। একটি ভালো কাজের জন্য একটি ছোট অন্যায়কেও যদি প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলেও তা একসময় বাড়তে বাড়তে মহীরূহ হয়ে ওঠে। চাপা পড়ে যায় পেছনের ভালো কাজটিও। একটি অন্যায় অন্য একটি অন্যায়কে উসকে দেয়। জুয়া নিষিদ্ধ, তারপরও নানা ফর্মে তা আমাদের সমাজে রয়ে গেছে। একে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব যে হয়নি, সেটিও তো স্পষ্ট। আজ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সরকারের যে অবস্থান, তাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানই স্পষ্ট হয়।
৩.
মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, তার জগৎ ছোট হয়ে গেলে। শুধু ভয় নয়, মানুষ সবচেয়ে বেশি খুশিও হয় একই কারণে। অর্থাৎ জগৎ ছোট হয়ে গেলে। আজকে নানাভাবেই আমাদের জগৎ ছোট হয়ে আসছে। তা কখনও আক্ষরিক অর্থে, আবার কখনওবা শুধুই ভাবার্থে। আজ বিশ্ব আমাদের হাতের মুঠোয়। মুহূর্তেই চক্কর দিয়ে আসা যায় পুরো বিশ্ব। এই ব্রহ্মাণ্ডের নানা স্থানে অনুষ্ঠিত ক্রিকেটসহ নানা খেলায় আমাদের খেলোয়াড়রা সুনাম বয়ে আনছে। খেলোয়াড়দের তৈরি করছে স্থানীয় ক্লাব। তাদের বেড়ে ওঠা, পরিচর্যা, শেখার পেছনে ক্লাবগুলোরই অবদান বেশি। তাই ক্লাবগুলো যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে, খেলোয়াড় তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে সে জন্য নীতিমালা প্রণয়ন যেমন জরুরি তেমনি ক্রীড়ার আশ্রয়স্থলের পরিবর্তে ক্লাবগুলো যেন জুয়ার আশ্রয়স্থল হয়ে না ওঠে সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি্।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.