ব্রেকিং নিউজ

আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায়ই সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব

সড়ক দুর্ঘটনারোধে বর্তমান সরকার নানা প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত মাসে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের আলোচনা সভায়, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল এবং ওভারটেকিংয়ের মতো অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘ওভারটেকিং নামক অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ফিটসেসবিহীন গাড়ি সড়কে চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। কেউ যদি অহেতুক নিয়মের বাইরে গিয়ে গাড়ি বা ট্রাকের আকার পরিবর্তন করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ট্রাফিক পুলিশকেও এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ড্রাইভারদেরও দোষ রয়েছে, কোনো গাড়ি তাদের ওভারটেক করলে যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়, ওই গাড়িকে তাদেরও ওভারটেক করতেই হবে। ফলে, দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।’ এ ছাড়া একটি রাস্তা কেমন লোড নিতে পারে, একটি সড়কে কোন ধরনের দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলতে পারে তার একটি আকার নির্দিষ্ট করা থাকে। অথচ আমাদের দেশে দেখা যায় অধিক মুনাফার আশায় আসন বৃদ্ধির জন্য বা অতিরিক্ত মালামাল পরিবহনের জন্য ক্ষেত্রেবিশেষে এক্সট্রা ক্লাম দিয়ে দুই পাশে বেআইনিভাবে গাড়ির আকার বাড়িয়ে নিচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে।

এ বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর নজরে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপরিউক্ত বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও যুক্তিসম্মত। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এসব কথা কার্যকর বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে সরকার সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ প্রণয়ন ও গেজেট আকারে প্রকাশ করছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই আইন ১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখ থেকে কার্যকর হলেও, এখনও আইনটির প্রয়োগ হয়নি। আইনটি প্রয়োগের আগে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে আইনটির প্রয়োগ শুরু হবে বলে ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন।

প্রয়োগের আগে আইনটি সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যে উদ্যোগ নিয়েছে তা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। সরকারের এই উদ্যোগের অংশীদার হতে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও এগিয়ে আসা জরুরি।
নতুন আইনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান। এই অপরাধে দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে তদন্তে প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর হবে। অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডের সুযোগ থাকছে। এই ধারার অপরাধ অজামিনযোগ্য। পুরনো আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদন্ড এবং এটি জামিনযোগ্য অপরাধ ছিল।

এ ছাড়া যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে নিবন্ধন সনদ না নিয়ে রাস্তায় যানবাহন নামালে এর মালিককে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ড ভোগ করতে হবে। ভুয়া নম্বরপ্লেট দিয়ে যানবাহন চালালে সর্বনিম্ন এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এবং সরকারের কার্যকর করা এ নতুন আইনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে এক মাসের কারাদন্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।
গণপরিবহনে ভাড়ার বিষয়টি দৃশ্যমান রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন আইনে ভাড়ার তালিকা নিয়ে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা না থাকলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত দন্ডে হবেন। একই সঙ্গে এটি চালকের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তার এক পয়েন্ট কাটা যাবে।

এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাবে ভাড়ার মিটার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। তবে এসব যানের প্রায় কোনোটারই মিটার সচল নেই। থাকলেও মিটার মেনে যাত্রী বহন করে না। আগের আইনে এর জন্য কোনো শাস্তির বিধান ছিল না। এখন মিটার বিকল থাকলে এবং যেকোনো গন্তব্যে যাত্রী পরিবহনে অস্বীকৃতি জানালে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ডের ব্যবস্থা আছে। শুধু যানবাহনের চালকদের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে সবসময় তা নয়। অনেক সময় পথচারীদের কারণেও ঘটে অনেক বড় দুর্ঘটনা। এজন্য পথচারীকেও সতর্ক হতে হবে। পথচারীদের বিষয়ে নতুন আইনে বলা হয়েছে, যানবাহনচালককে যেমন সঙ্কেত মেনে চলতে হবে, তেমনি পথচারীকে সড়ক-মহাসড়কে জেব্রাক্রসিং, পদচারী সেতু, পাতালপথসহ নির্ধারিত স্থান দিয়ে পার হতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে চালক ও পথচারীকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ডে পড়তে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে মহামারী আকার ধারণ করেছে। সরকার আন্তরিকভাবে চাইছে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন আইন, বর্তমান সরকার সেই আইন প্রণয়ন করেছে। এখন এই আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা সবার কাছে আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহত হচ্ছে।

সড়কের মড়কে খালি হচ্ছে হাজারো মায়ের কোল। সরকারের একার পক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ইতঃপূর্বে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনাগুলো যদি সবাই সঠিকভাবে মেনে চলে এবং সড়ক পরিবহন
আইন-২০১৮-এর বাস্তবায়ন হয়, তাহলে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নিশ্চিত কমে আসবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.