ব্রেকিং নিউজ

দেশে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতাও জরুরি

সারা বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে মানব পাচার। মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এই জঘন্য অপরাধের শিকার আজ আমরাও। মানব পাচারের নিষ্ঠুর থাবা থেকে আমাদেরও মুক্তি মেলেনি। জল-স্থল-আকাশপথে মানব পাচার হচ্ছে। জীবন ও জীবিকা, কর্মসংস্থানের অভাব ও দারিদ্র্যের পীড়নে অতিষ্ঠ মানুষ বিদেশের পথে পাড়ি জমায়। আর এসব মানুষের বেশিরভাগই হয় প্রতারিত, হয় সর্বস্বান্ত। কিন্তু প্রতারিত মানুষের এই স্রোত কমেনি। আন্তর্জাতিকভাবে মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকার প্রথম দিকেই আমাদের অবস্থান। দাসত্বের আধুনিক রূপ মানব পাচারের সব খবর গণমাধ্যমে আসে না। যেটুকু আসে তারও কয়েকগুণ বেশি অপরাধ সংঘটিত হয়। মানব পাচারের বীভৎস রূপ সম্প্রতি গণমাধ্যমের কল্যাণে আমাদের সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব গণকবরে মিলছে অসংখ্য ভাগ্যান্বেষী মানুষের মৃতদেহ। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মানুষের করুণ মৃত্যুর খবরও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য অথৈ সাগরে সামান্য নৌকায় গাদাগাদি করে যাত্রার সময়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর ছবি দেখে শিউরে উঠেছে বিবেকবান মানুষ। মানব পাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে মানুষ। আমাদের সরকারও মানব পাচার রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও থেমে নেই মানব পাচার। জীবিকার সন্ধানে যারা সহায়-সম্বল বিক্রি করে দালালের হাতে অর্থ তুলে দিচ্ছে, তাদেরই দালালরা ফেলে দিচ্ছে বিপদের মুখে। ভাগ্যান্বেষণে যারা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা, মালয়েশিয়ার পথে পা বাড়াচ্ছে তারা জিম্মি হচ্ছে দালালদের কাছে। নারী শ্রমিকরা যৌন নির্যাতন-নিপীড়নের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য থেকে কপর্দকশূন্য হয়ে নির্র্যাতিত নারীদের দেশে ফিরে আসার ঘটনা বেড়েছে। ভাগ্যান্বেষণে বিদেশগামীদের বন্দি রেখে, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।

মানব পাচারকারীরা দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া। একটি বেসরকারি সংস্থার অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য উদ্ধৃত  প্রতিবেদন বলছে, ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ বছরে ৮ হাজার ৮৬১ জন পাচারের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৫ হাজার ৫৪১, নারী ১ হাজার ৭৪৭ জন ও ৮৭৩টি শিশু রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ বছরে পাচারের আইনে মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৭১৬টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৪৭টি। বিচারাধীন রয়েছে ৪ হাজার ৯৪টি মামলা। সরকার মানব পাচার রোধে ২০১২ সালে ‘মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন’ প্রণয়ন করে। মানব পাচারের ভয়াবহতা বিবেচনায় এনে সাত বছর আগে এই আইনের অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও বিধান ছিল। কিন্তু বিচারকের স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি। ফলে মানব পাচারের অভিযোগে করা মামলাগুলো চলছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে।

মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইনের অধীনে যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছিল, মানব পাচার রোধে যেসব জেলায় মামলাজট বেশি সেখানে দ্রুততর সময়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে পাচার মামলার বিচার শুরু করা প্রয়োজন। এ ছাড়াও আমরা মনে করি, মানব পাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি যদি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হয়, তাহলেই মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি সব স্তরের মানুষেরই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই থামানো সম্ভব এই জঘন্য অপরাধ। এ জন্য মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশে বাড়াতে হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.