ব্রেকিং নিউজ

‘খ্যাপ নাই তবুও গাড়ি ধরেই বইয়া থাকি’

‘আমাগো গাড়িতে খ্যাপ নাই। সবাই ইঞ্জিনের গাড়িতে উঠে। তবুও খ্যাপের আশায় থাকি। দুইশ’ টাকা কামাই করলে ঘোড়ার খরচ যায় দেড়শ টাকা। বাকি পঞ্চাশ টাকায় তো আর সংসার চলে না। খ্যাপ না থাকলেও সারাদিন তেবাড়িয়া বাজারে ঘোড়ার গাড়িওয়ালারা গাড়ি ধরে বইয়া থাকি। কখন বুঝি খেপ আইব।’ এভাবেই নিজের পেশা নিয়ে আক্ষেপ করলেন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামের ঘোড়ার গাড়ি চালক আব্দুল হালিম।

তবুও কেন এই পেশা ছাড়ছেন না? তার সহজ-সরল উত্তর, ‘হয়তো একদিন আমাগো ঘোড়ার গাড়ির কদর বাড়ব, এই আশায় ঘোড়ার গাড়ি ছাড়তে পারি না।’

পাশে থাকা কাশেম মিয়া বলেন, রাস্তাঘাট ভালো হয়ে যাওয়াতে ঘোড়ার গাড়ি খুব কম চলে। অটোরিকশা দিয়ে মানুষ খ্যাপ মারাতে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা কমে গেছে। খুব কষ্ট করে আমাদের দিন পার করতে হচ্ছে।

লোকমান ফকির নামে আরেকজন ঘোড়ার গাড়ি চালক বলেন, ঘোড়ার খাবারের দাম দিন দিন বেড়েই চলছে। আগে ঘোড়ার খাবারের দাম খুব কম ছিল। আমাদের খ্যাপ কম হলেও আয়টা বেশি হতো। বর্তমানে খাবারের দাম বেশি, ঘোড়ার খ্যাপও কমে গেছে। কিন্তু ভাড়াটা আগের মতোই আছে।

আজগর আলী বলেন, আমার বাবা আগে ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। তার গাড়ি থেকেই ঘোড়ার গাড়ি চালানো শিখেছি। আগে টাকার দাম বেশি ছিল। বর্তমানে টাকার দাম কমে গেছে। কিন্তু ভাড়া আগের মতোই আছে। তাই আমাদের এখন আয় খুব কম। আমরা যে কামাই করি, তা আমাদের খরচই হয়। ঘোড়ার জীবন ও আমাদের জীবন কোনো রকম বাঁচাই।

সদর উপজেলার কাতুলী গ্রামের ঘোড়ার গাড়ি চালক মো. কেশমন আলী বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। আমার বাপ চাচারা গরুর গাড়ি চালিয়ে আমাদের মানুষ করেছেন। আমি ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলাম। বর্তমানে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে যে টাকা আয় করি তাতে আমাদের সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। ঘোড়া বিক্রির জন্য নির্ধারিত কোনো হাট বাজার নেই। চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত কোনো হাসপাতাল নেই। আমরা ঘোড়ার চালকরা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত আছি। কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

জানা যায়, টাঙ্গাইলে আশির দশক থেকে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পণ্য পরিবহন শুরু হয়। কম খরচে পণ্য পরিবহনের জন্য এই বাহনটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দ্রুত গতির যানবাহন বেড়ে যাওয়ায় কদর কমেছে ঘোড়ার গাড়ির। ফলে টিকে থাকতে বেগ পেতে হচ্ছে এই পেশাজীবী মানুষদের। নানা সমস্যা নিয়ে কোনো মতে টাঙ্গাইল জেলায় টিকে আছে ঘোড়ার গাড়ি। এই ঘোড়ার গাড়ির সঙ্গে জড়িত প্রায় আড়াই হাজার পরিবারের জীবিকা। বেশ কিছু নদী ও পাহাড়ি অঞ্চল থাকায় টাঙ্গাইলের কয়েকটি উপজেলায় যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্গম। সেই কারণে কৃষি পণ্যসহ মালামাল পরিবহনের জন্য এসব এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দ্রুত গতির যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে হাতের কাছেই। তাই পণ্য পরিবহনে এখন আর ঘোড়ার গাড়ির কদর আগের মতো নেই। ফলে আয় রোজগার কমে কষ্টে দিন কাটছে এই পেশার মানুষের। তার ওপর প্রয়োজনীয় ঘাস না থাকায় ঘোড়ার খাবার কিনতে হয়। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঘোড়া পালনে খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আবার ঘোড়া অসুস্থ হলে পাওয়া যায় না সরকারি চিকিৎসা সেবা। এছাড়া ঘোড়া বিক্রির জন্য নির্ধারিত কোনো হাঁট নেই।

ঘোড়া চালকরা জানিয়েছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে খুব বেশি দিন আর এ পেশায় থাকা যাবে না। ঘোড়ার চিকিৎসা ও বাজার ব্যবস্থার জন্য সরকারের সহায়তা দাবি করেন। একই সঙ্গে পশু খাদ্যের দাম কমানোর দাবি ঘোড়ার মালিকদের।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আশির দশক থেকে টাঙ্গাইলে ঘোড়ার গাড়ি চলে। এটা একটি ঐতিহ্যবাহী বাহন। ভাড়া কম হওয়ায় এ বাহনটি অনেকেই ব্যবহার করছে। রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন হওয়ায় দ্রুত গতির যানবাহন থাকায় ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার একটু কমে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে কথা বলে ঘোড়ার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গরুর হাটে ঘোড়া বিক্রিও করা যাবে। চাইলে ঘোড়ার মালিকরা গরুর হাটে ঘোড়া বিক্রি করতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী এই বাহনটি থাকুক- আমরা চাই। ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন তারা চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.