ব্রেকিং নিউজ

পাপিয়া মুখ খুললেই বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: নেত্রী শামীরা নূর পাপিয়া এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বন্দি। তাকে ১৫ দিনের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনদিন বিমানবন্দর থানা পুলিশ তাকে, তার স্বামীকে ও তাদের দুই সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু তারা সহজে মুখ খুলছে না। পাপিয়া নিজেকে রক্ষায় বেশ কৌশলী হয়েছেন। যত প্রশ্নই তাকে করা হচ্ছে, প্রতিটিই তিনি অস্বীকার করছেন।

তবে বাকি তিনজনের উত্তরের সঙ্গে তার দেওয়া তথ্যের অনেক কিছুই মিলছে না। পাপিয়া মুখ খুললে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বুধবার বিকালে পাপিয়া ও বাকি তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিমানবন্দর থানা থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এবিষয়ে ডিবির উত্তরের ডিসি মশিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, তারা পাপিয়াসহ বাকি তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে বলে আশা করছে ডিবি।

গত কয়েক দিন থেকে থানা পুলিশ পাপিয়াসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিন্তু প্রতিবারই কৌশলী ভূমিকায় উত্তর দিচ্ছেন তিনি। তবে তার আয় ও ব্যয়ের কোনো সঠিক তথ্য তিনি দিতে পারেননি। পাপিয়ার নিজস্ব কিছু আয় আছে। পাশাপাশি তার সংসার চলে স্বামীর গাড়ি সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা থেকে আয়কৃত টাকা থেকে, এমন দাবি করলও তার স্বপক্ষে কোনো তথ্য তুলে ধরতেন পারেননি। শুধু তাই নয়, তিনি তার স্বামীর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৯ লাখ টাকা। কিন্তু একটি অভিজাত হোটেলে তিন মাসের বিল প্রায় ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। জাল টাকা তার নয় এবং তিনি কোনো নারী ব্যবসায় জড়িত নন বলেও দাবি তার। পাপিয়ার এমন কৌশলী হওয়ার কারণ সম্পর্কে পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, পাপিয়া মুখ খুললে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে পারে। অনেক রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ফেঁসে যাবেন। ওইসব লোকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। এসব ভেবে তিনি মুখ খুলছেন না। তবে পুলিশও নাছোড়বান্দা। মুখ খুলতেই তাকে বুধবার ডিবিতে নেওয়া হয়েছে। এদিকে পাপিয়া আটকের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি যাদের সঙ্গে উঠবস করতেন এবং যাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতেন তারা ভয়ে আছেন।

বিমানবন্দর থানার এসআই কায়কোবাদ  কাজী  নিউজ টাঙ্গাইলকে বলেন, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ ছিল। আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতার সঙ্গে পাপিয়ার সম্পর্ক ছিল তা প্রকাশ করেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পাপিয়ার কাছ থেকে আমরা যে তথ্য পেয়েছি তা তার আয় ও ব্যয়ের সঙ্গে মিলছে না। এ কারণে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে নেওয়া হচ্ছে। তবে মামলাটি এখন গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। তারা আসামিদের নিয়ে গেছে। থানা পুলিশের এখন করার কিছু নেই বলে যোগ করেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া জানিয়েছে, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো।  এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ নেতার সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল। তবে এই সম্পর্ক সাংগঠনিক নাকি একান্তই ব্যক্তিগত পর্যায়ের, সে বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না বলছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

জিজ্ঞাসাবাদ সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানিয়েছে, রিমান্ডে পাপিয়া অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ফাঁস করে দিয়েছেন। এতে অনেক ভিআইপির ঘুম হারাম হয়ে গেছে। পাপিয়ার কাছ থেকে কোন কোন নেতা অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন, তাদের নিয়ে দলেও কানাঘুষা চলছে। তবে পাপিয়ার ফোন কলে বেরিয়ে আসতে পারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তথ্য। অন্যদিকে পাপিয়া কয়েক বছরের মাথায় কিভাবে গাড়ি, বাড়ি ও এত সম্পদেও মালিক হলেন তা খুঁজতে এখন মাঠে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তার নামে দুটি মানি লন্ডারিংয়ের মামলা হয়েছে। এই দুটি মামলার তদন্ত করবে সিআইডি। এ ছাড়াও পাপিয়ার অবৈধ উপায়ে আয়কৃত সম্পদের খোঁজ নিতে শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক বলছে, পাপিয়া থেকে সুবিধা নেওয়া রাজনৈতিক দলের নেতাদের তালিকা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তালিকা পাওয়ার পর তাদেরও নজরদারির আওতায় আনা হবে।

এদিকে র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, পাপিয়া খুবই কৌশলী। তিনি শুরু থেকেই এমন ভূমিকা পালন করছেন। তিনি জাল টাকা ও অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তাকে ওই সব জিনিসপত্র আটক করা হয়েছিল এটি তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।  তা ছাড়া তিনি যদি নারী ব্যবসায় জড়িতই না থাকেন তবে কেন তার নামে অভিজাত হোটেলে তিন মাসে ৯০ লাখ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য রয়েছে। পাপিয়া অনেক কিছু বলতে না চাইলেও তার স্বামী সুমন র‌্যাবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তাদের আটকের পরদিন রাজধানীর ফার্মগেটে অভিযান চালানো হয়। সেখানে তার দুটি ফ্লাটের সন্ধ্যার পাওয়া যায়। সেই ফ্লাট থেকে পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই অস্ত্রের ব্যাপারে সুমনকে জিজ্ঞাবাদ করা হলে তিনি প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে সেটি জয় নামের এক মৃত ব্যক্তির বলে জানান। কিন্তু মৃত ব্যক্তির পিস্তল তার কাছে কিভাবে আসল তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি সুমন।

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা বলেন, তাকে আটকের পর থেকে নানা অভিযোগ আসছে। বুধবার দুজন ব্যক্তি পাপিয়ার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের সূত্র ধরেও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, আইনগত বাধা এড়াতে মামলাটির তদন্ত হাতে নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব।

প্রসঙ্গত, ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে দেশ থেকে পালানোর সময় র‌্যাবের হাতে আটক হন পাপিয়া, তার স্বামীসহ চারজন। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল জাল টাকা, পাসপোর্ট ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.