ব্রেকিং নিউজ :

চোরগণ গরীবের খাদ্য খেয়ে অমর হোন

করোনা আক্রান্ত মহামারিতে  যারা চাল, গম, তেল, মাস্ক, গ্লাভস চুরি করছে তারা চির অমর হোন।  সুযোগ পেলেই চুরি করতে ইচ্ছে করে এটাই ওদের অসুখ। হতদরিদ্র মানুষেরা সামান্য কিছু ত্রাণের আশায় দিনভর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে, এখানে ওখানে দৌড়ায়। করোনার ভয় তাদের ভীত করে না, সোশ্যাল ডিসট্যান্স, মাস্ক, গ্লাভস কিছুই তাদের মনে থাকে না। তারা দৌড়ায় পেটের ক্ষুধায়। যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষণ ক্ষুধা আছে।

আর এই চোরগুলো বক্স খাটে তেল লুকায়, মাটির নিচে চালের বস্তা লুকিয়ে রাখে। কত উৎকৃষ্ট এদের ব্রেন। পাক্কা চোর না হলে বক্স খাটে তেল লুকানোর কথা কারও মাথায় আসে! চাঁদপুরের এক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান চাল চুরি করেছে। তার ঝা চকচকে চেহারা দেখলে মনে হয় না সে চুরি করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মহিলার যে ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে তা দেখে মনে করা শক্ত এই মহিলা চোর। তার কি পেটে ভাত নেই, তার ঘরে কি চাল নেই ? আমি জানি দুটো প্রশ্নেরই উত্তর হ্যা আছে। তাহলে কেন এই গরিবের চাল চুরি! সে নাকি বলেছে, সরল মনে রেখেছে। এ চাল কি রাখার জন্য ? এ চাল বিতরণের জন্য। গরিবের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আর চাল থাকবে গোডাউনে, নিজ বাড়িতে কেন ?

দুঃখজনক ব্যাপার, সরকারের অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদধারী কতিপয় ব্যক্তির নামে নিম্নমানের গ্লাভস বাজারজাতকরণের অভিযোগ উঠেছে। তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদও এখন পর্যন্ত শুনিনি। অভিযোগ যদি সত্যি হয়, এটা চাল তেল চুরির চেয়েও মারাত্মক। পয়সা কামানোর জন্য মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার পন্থা।

এই চোররা দেশব্যাপী বিস্তৃত। সব জেলা, উপজেলা, সব ইউনিয়নে এরা সদর্পে আছে। ত্রাণের চাল, টিসিবির ১০ টাকা কেজির চাল, তেল নুন সবই এরা দুহাতে লুটছে। ইতোমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, জরিমানা হয়েছে, জেল খেটেছে, ডিলারশিপ বাতিল হয়েছে। চুরি করলে ভবিষ্যতে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবে না  এমন ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি।

প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ নিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। সারা দেশে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। কিন্তু ওদের যা করার তা করছে। জাতির পিতা দুঃখ করে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেছে, রেখে গেছে চোরদের। সেই চোররা বংশবিস্তার করে ডালপালা ছড়িয়ে দেশ ভরে ফেলেছে।

জানা মতে এ পর্যন্ত ৬৫ হাজার ৯০০ টন চাল, ২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং শিশুখাদ্যের জন্য ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর বাইরে তেল ডালসহ আরও অনেক নিত্যপণ্য আছে। তা ছাড়া এই বরাদ্দের পরিমাণ প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দরিদ্র নিম্নমধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত সব শ্রেণির মানুষের কথা ভেবেই এ প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে সরকার। যেভাবে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে তা যদি সঠিকভাবে বণ্টন হতো তাহলে মানুষের এত খাদ্যাভাব, মানুষের ঘরে ঘরে এত হাহাকার থাকার কথা না। কিন্তু সঠিক বণ্টন হচ্ছে না। রাঘববোয়ালরা সব খেয়ে ফেলছে। সে কারণে আমরা খবরে পড়ছি খেতে না পেয়ে রিকশাওয়ালা মারা যাচ্ছে, মা খাবার না দিতে পেরে সন্তানদের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ত্রাণের দাবিতে জনগণ মিছিল করছে। ট্রাক থেকে ত্রাণের চাল কেড়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া তাদের উপায়ও নেই। এ চাল যে তারা পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমনকি ধনীর গৃহে ডাকাতির কথাও শোনা যাচ্ছে।

আমরা হয়তো সত্যিই জানি না পেটের ক্ষুধা কী জিনিস। যারা  প্রতিনিয়ত ক্ষুধার জ্বালা সইছে তারা জানে ক্ষুধা কী জিনিস। যারা কখনই ক্ষুধায় কষ্ট পায়নি তারা বুঝবে কী করে, ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।’

একজন রিকশাওয়ালার ঘরে বড়জোর দুদিনের খাবার থাকতে পারে। তার বেশি তো নয়। একজন ফল বিক্রেতার ঘরে বড়জোর সাত দিনের খাবার থাকতে পারে। তার বেশি তো নয়। এক মাসের বেশি গৃহবন্দিকাল চলছে। ওদের কাজ নেই। ত্রাণ না পেলে ওরা খাবে কী ? যদি সরকার ত্রাণ না দিতে পারত বা ত্রাণের স্বল্পতা থাকত, কিছু বলার ছিল না। সরকার উজাড় করে ত্রাণ দিচ্ছে, নানা বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ত্রাণ দিচ্ছে। সব খেয়ে ফেলছে হাঙ্গরে।

আমি একটা কথা ভেবে অবাক হই, যারা চুরি করছে তারা কী করে জানে করোনা তাদের ছোঁবে না ! তাদের সন্তান সন্ততিদের ছোঁবে না ! সহিসালামতে বেঁচে থাকবে সবাই আর এই চুরি করা তেল ডাল চাল বিক্রি করে ক্যাশ টাকা বানাবে, দালান বানাবে, বিলাসবহুল গাড়ি কিনবে বা বিদেশে পাচার করবে ! কী করে জানল ওরা ?
চোরগণ আপনাদের বলছি, নিজেদের অমর ভাববেন না। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে সে ধনী দরিদ্র মানে না, মোড়ল মানে না, কৃষক মানে না, চেয়ারম্যান মানে না, ভাইস চেয়ারম্যান মানে না, মেম্বার মানে না, রাজা উজির মানে না। সে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ আসলে কত ক্ষুদ্র, কত অসার তার ক্ষমতার দম্ভ, বাকচাতুর্য। বিলাস বৈভব দালানকোঠা কত কত তুচ্ছ। অদেখা এক ভাইরাস জিম্মি করে ফেলেছে সারা পৃথিবীকে। তার ভয়ে কম্পমান গোটা বিশ্ব।

কিন্তু আমার একটা ভুল ভেঙেছে। ভেবেছিলাম মানুষ  মহান আল্লাহ তায়ালার এ শক্তি আর ক্ষমতার অসারতা দেখে সত্যিকার মানুষ হয়ে উঠবে। বোধন হবে মানবতার। মানুষ এক হয়ে যাবে। সবাই সবার পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য দেশে কী হয়েছে জানি না, আমার এই দুঃখিনী বাংলায় মানবতার বোধন হলো না। আমাদের চোরদের সাহস বড় বেশি। এখনও চোররা ভাবছে, তারা করোনার চেয়ে পরাক্রমশালী। করোনা তাদের ছোঁবে না। কিচ্ছু হবে না তাদের, কিচ্ছু না। তারা চাইছে করোনা আরও জোরেশোরে হোক। আরও ত্রাণ আসুক। চুরির ত্রাণে ভরে উঠুক শ্বশুরবাড়ি খালাবাড়ি মামাবাড়ি। চোর আপারা, চোর ভাইজানরা, ভুল ভাবছেন। আপনারা অমর নন। ওই চালের বস্তাতেই থাকতেপারে করোনাভাইরাস। এটুকু অন্তত ভেবে চুরি বন্ধ করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.