করোনাকালে শিক্ষিত বেকাররা বেকায়দায় 

রেজাউল করিম: কোভিড-১৯ অর্থাৎ করোনা ভাইরাস সংক্রমণে পুরো বিশ্ব আজ থেমে আছে।গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হলেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হন ৮ মার্চ এবং করোনয় প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। ২৫ মার্চ প্রথমবারের মতো রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানায়, বাংলাদেশে সীমত পরিসরে ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিকভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে সেই সংক্রমণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯১৩ জনে। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিয়েছে দেশে ১৫২ জন। সংক্রমণ রোধে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এরপর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগও বন্ধ হয়ে যায় ।

করোনাকালে দেশের অধিকাংশ মানুষ আজ কর্মহীন। সরকারি চাকরীজীবি ছাড়া হাতেগোনা কিছু বিভাগের কর্মচারীরা মাস শেষে বেতন পাচ্ছেন। অন্যান্য দুর্যোগের সময় দারিদ্ররা অসহায় হয়ে পড়েন। কিন্তু করোনাকালে যারাই কর্মহীন তারাই অসহায় হয়ে পড়েছেন।

সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষগুলো সরকারি সহযোগিতা পাচ্ছেন। সরকারি চাকুরীজিবিরা সরকারি বেতন পাচ্ছেন। এই সময়ে সবচেয়ে বেকায়দায় পড়েছেন সমাজের শিক্ষিত বেকাররা। গত দেড়মাসে এদের পাশে কাউকে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

লেখাপড়া শেষে চাকরীর জন্য বারবার চেষ্টা করেও চাকরী না পাওয়া মানুষগুলো সমাজের শিক্ষিত বেকার নামে পরিচিত। সর্বোচ্চ সার্টিফিকেট নিয়েও অনেক সময় লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পেরে হতাশায় থাকে এরা। নিজে ও পরিবারকে বাঁচাতে ডুকে যায় খন্ডকালীন পেশা টিউশনিতে। অনেকে দু-চারটা টিউশনির পয়শা দিয়ে চাকরীর আবেদন করার খরচ জোগায়। সমাজের মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার খরচ চালাতেই টিউশনীতে ডুকে পড়েন। কেউ কেউ লম্বা সময় চেষ্টার পর চাকরীতে সুযোগ না পেয়ে শিক্ষা সহায়ক প্রতিষ্ঠান কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেঁছে নেয়। এরা অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষিত। অথচ করোনাকালে কর্মহীন হয়ে এরা বেকায়দায় পড়েছেন।

দেশের এই বিশাল শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠি তিনটি স্তরে কাজ করতেন। প্রথমত প্রইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ( উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় ) দ্বিতীয়ত কিন্ডার গার্টেন (কেজি স্কুল) তৃতীয়ত কোচিং সেন্টার। সমাজে এরা এমনিতেই বেকার হিসেবে পরিচিত। প্রাইভেট স্কুলগুলোকে সরকার বই-খাতা,সনদ দিয়ে প্রাথমিকভাবে অনুমতি দিয়ে থাকেন। এছাড়া কোচিংগুলোর উপরও কখনও সরকার চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। অতএব এটি শিক্ষা শক্তিশালী একটি অংশ। তারপরও সবসময় এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন চাপে থাকে। এসব শিক্ষকরা শিক্ষাদানে একদিকে সরকারকে সহযোগিতা করছেন অন্যদিকে বেকারত্ব দুর করছেন। এদের পাশে সরকারের সহযোগিতা থাকাটা জরুরী। প্রাইভেট শিক্ষকতা একমাত্র পেশা যেখানে একজন অসৎ অভিযুক্ত শিক্ষকের জন্য পরীক্ষার সময় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে দেশের অসংখ্য শিক্ষককে মাসব্যাপী বেকার রাখা হয়। অসৎ অভিযুক্ত শিক্ষক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করার কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়না। অথচ দেশের অন্য সব পেশায় অসততার অভিযোগে একমাত্র অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আইনের আওতায় আনা হয়।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যাদের নুন্যতম সাধ্য আছে তারা তাদের সন্তানদেরকে প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছেন। সরকারি বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে যাদের সন্তান প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। এমন কি অনেক সরকারি শিক্ষকদের সন্তানও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো কিছু পেয়েই এসব প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকছে। এরপরও বলবো এরা ভালো কিছু না করলেও সমাজের ক্ষতি অনন্ত করছে না। কিছু নামধারী সাংবাদিক আর সমাজের কিছু অতি উৎসাহী মানুষ সবসময় প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করে থাকেন। তাদের উদ্যেশ্যে বলবো, এসব প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করতে বাধ্য করেনা। সবাই ইচ্ছে করেই সন্তানদের ভর্তি করান। তবে সমালোচনা কেন?

প্রাইভেটশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার বা অন্য কোন সংস্থার আর্থিক সহযোগীতা ছাড়া সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। যার সংখ্যা সরকার গঠিত ট্রাক্সফোর্সের আনুমানিক পরিসংখ্যান ৬০,০০০ (ষাট হাজার) প্রকৃতপক্ষে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশী। সরকরী, বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এই ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সকল শ্রেণির প্রায় ১ কোটির বেশী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে, সেইসাথে নিজ উদ্যোগে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। তাছাড়া বেকারত্ব নিরশন সরকারের বিরাট একটা সহায়ক ভুমিকা পালন করছে। এই প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শত কষ্টে জীবিকা নির্বাহের পরও দাবী আদায়ের জন্য বা শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলন করে সরকার তথা জনগনকে কষ্ট দেয়নি।

বর্তমানে করোনাকালে এসব শিক্ষিত কর্মহীনদের পাশে না দাঁড়ালে মানুষের শিক্ষিত হওয়ার ইচ্ছেই থাকবেনা। গত ১৬ মার্চ সরকারে নির্দেশে হঠাৎ করে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হল। আমরা সরকারের সাথে সাড়া দিয়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলাম। অথচ ৯৯ ভাগ প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম চালায়। আয়ের ৪০ভাগ ঘড় ভাড়া, ৪০ভাগ সম্মানিত শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দের বেতন ভাতা, ১০% পানি, বিদ্যুৎসহ প্রচারণায় খরচ হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় চলে এসেছে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় না ফিরলে আগামি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।শিক্ষ ও শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত এই বৃহৎ গোষ্ঠিকে বাঁচাতে এই লম্ভা সময় প্রাইভেট বা বেসরকারি শিক্ষকেদের পাশে সরকারি সহযোগিতা জরুরী।

লেখক: সংবাদকর্মী।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.