করোনা মোকাবেলায় নানামূখী ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখযুদ্ধ করছে সাংবাদিকরা

গণমাধ্যম হলো সমাজের দর্পণ। যুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগই হোক গণমাধ্যমকে ঘটনাস্থল থেকেই সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়। এই পেশাটাই চ্যালেঞ্জিং। তবে করোনাভাইরাস একটি নতুন সঙ্কটে ফেলেছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের গণমাধ্যমকে। এবারের যুদ্ধটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এখানে শত্রু অচেনা। করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা যতটা জরুরি তেমনি সত্য খবর জানাটাও জনগণের খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে গণমাধ্যম অত্যন্ত শক্তিশালী, চেষ্টা করা হলেও কোনো তথ্য গোপন করা যায় না। প্রতি মুহূর্তে বিশ্বের সকল প্রান্তের খবর অনায়াসে চলে আসে গণমাধ্যমের বদৌলতে। এতে করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। মানুষ যখন সঠিক তথ্য পায় তখন সেও প্রতিরোধের উপায় খুঁজে নিয়ে সচেতন হয়। এই সঠিক তথ্যের জন্য সাংবাদিকদের ঘটনার কাছাকাছি থাকতে হয়। ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে কাজ করতে হয় বলে সাংবাদিকদের সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়।

গণমাধ্যমকর্মীদের আরও একটি সঙ্কট নতুন করে যোগ হয়েছে চাকরির অনিশ্চয়তা। লকডাউনের কারণে বন্ধ রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ প্রায় সব ধরনের প্রতিষ্ঠান। যার ফলে স্থগিত রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচার ও বিজ্ঞাপন। বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর আয় বেসরকারি বিজ্ঞাপন থেকে অন্যদিকে দৈনিক পত্রিকাসমূহের মূল আয় সরকারি দরপত্র বিজ্ঞপ্তির বিল থেকে। ব্রিটেনের মতো দেশেও ম্যানচেস্টারটাইম, গ্লোবালরিমার্ক, ফোকাস দ্য নিউজসহ ২০টির অধিক পত্রিকা তাদের প্রকাশনা বন্ধ রেখেছে। আমাদের
দেশেও কয়েকটি মিডিয়া তাদের কর্মীদের ছাঁটাই, আবার কোথাও কোথাও বেতন দেওয়া বন্ধ রেখেছে।
প্রচলিত গণমাধ্যমের সঙ্কট চললে জায়গা করে নেবে অপ্রচলিত গণমাধ্যম। যার পরিণাম হতে পারে করোনাভাইরাসের থেকেও ভয়ঙ্কর। বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জানার পাশাপাশি নানারকম গুজব রটনা করা হয়। তাই সঠিক তথ্য জনগণের সামনে মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরাই তুলে ধরে। সোশ্যাল মিডিয়ার আধিপত্যের যুগে করোনা মোকাবিলায় ভুয়া সংবাদের ভয়ানক অস্ত্র থেকে জনগণকে বাঁচাতে হলে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের বিকল্প নেই।

এত সঙ্কটের মধ্যেও পত্রিকাগুলো প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছাতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। হকার সঙ্কট, পরিবহন সঙ্কট, লকডাউনের কারণে বাসাবাড়িতে হকারসহ বাইরের লোক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও পত্রিকার কাগজ দ্বারা করোনাভাইরাস ছড়ায় এমন একটি গুজবে বেশ ক্ষতিতে পড়ে সংবাদপত্র শিল্প। তবে অনলাইনে পাঠক সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, টেলিভিশনের দর্শক সংখ্যাও বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশের গণমাধ্যম সাধারণত নেতিবাচক খবরকেই বেশি প্রাধান্য দেয়, এর পেছনে রয়েছে আমাদের নেতিবাচক সংবাদের প্রতি আগ্রহ। পাঠক ধরে রাখতে হলে গণমাধ্যমগুলোকে সেটাই করতে হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বেশি বেশি ভালো খবর প্রচার করাও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

যারা করোনা যুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে কিংবা করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করে কাজে ফিরে এসেছে, তাদের প্রশংসা করে গণমাধ্যমে বেশি বেশি প্রচার করলে একদিকে যেমন তারা উৎসাহ ও উদ্দীপনা পাবেন, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে এবং জনমনে আতঙ্ক ও ভীতি কমে আসবে। করোনাকালে প্রতিটি সম্মুখযোদ্ধা অনেক অনেক ভালো ভালো কাজ করছে এবং করে যাচ্ছে। ঢাল তলোয়ারবিহীন গণমাধ্যমকর্মীরা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে বহুমুখী ঝুঁকি নিয়ে করোনাযুদ্ধে সম্মুখভাগে লড়াই করে যাচ্ছে। সারা দেশে কয়েকশ সংবাদকর্মী ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। তিনজন গণমাধ্যমকর্মী আমাদের মাঝ থেকে চলে গিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবসময়ই গণমাধ্যমবান্ধব। সাংবাদিকদের প্রয়োজনে তিনি সবসময়ই উদার। যখন অসহায়, অসচ্ছল ও চাকুরিচ্যুত সাংবাদিকরা জীবিকার প্রশ্নে অনেকটা হিমশিম খাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে চলমান সঙ্কট মোকাবিলায় তিন কোটি টাকার আর্থিক অনুদান তিনি মঞ্জুর করেছেন। গণমাধ্যম কর্মীরা যেহেতু সম্মুখযোদ্ধা তাই তাদের ঝুঁকির বিষয়টাও কর্তৃপক্ষকে বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই সরকার সাংবাদিকদের পাশে থাকবে বলে বিশ্বাস করি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই করোনা সঙ্কটকালে সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের কাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম সরকারের কর্মপরিকল্পনা, নির্দেশনা সঠিকভাবে তুলে ধরে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে।
যতই ঝুঁকি থাকুক গণমাধ্যম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জনগণের কাছে সঠিক ও সত্য খবরটি পৌঁছে দিচ্ছে। করোনা সঙ্কট একদিন চলে যাবে কিন্তু গণমাধ্যমকে টিকে থাকতে হবে গণমানুষের স্বার্থেই।