ব্রেকিং নিউজ

করোনার প্রাদুর্ভাব একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নিয়ে সংশয়…..মো. আলীম মাহমুদ

আমরা সকলেই অবগত মহামারী কভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস)’র প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব নতজানু। দুই শতাধিক দেশ যুদ্ধ করছে কভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস)’র বিরুদ্ধে। জানিনা, কতদিন চলবে এ যুদ্ধ। যুদ্ধে জয়ী হতেই বা কতদিন লাগবে, সে খবরও আজানা। তবে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন আগামী ৩/৪ বছর থাকবে এর প্রাদুর্ভাব। বিশ্বজুড়ে চলছে লকডাউন, বন্ধ হয়ে গেছে সকল অফিস, আদালত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বৈশ্বিক এই অবস্থায় ইউরোপ-আমেরিকার সাথে বাংলাদেশও করোনা যোদ্ধা। যেখানে আমেরিকার মেতা হেভিওয়েট দেশে মৃতের সংখ্যা লাখ পেরিয়েছে, আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোও যেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের আয়-রুজির কথা চিন্তা করে তুলে নিচ্ছে লকডাউন।

অনেক দেশই ধীরে ধীরে তুলে নিচ্ছে লকডাউন। সীমিত পরিসরে খুলছে অফিস-আদালতও। কিন্তু এখনও শান্ত হয়নি বিশ্ব, ক্ষান্ত হয়নি করোনা। আক্রান্তের সংখ্যা তেষট্টি লাখ ছাড়িয়েছে, মৃতের সংখ্যা চার লাখ ছুই ছুই। এই পরিস্থিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা আদৌ সম্ভব নয়, সংগতও নয়।

গত ৩১ মে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি ফেসবুক লাইভে এসে ফলাফল ঘোষণা করেন। তাছাড়া পূর্ব ঘোষণা দিয়ে মোবাইলে প্রি-রেজিষ্ট্রেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফলাফল মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে সঠিক সময়ে এবং সঠিকভাবে প্রদান করতে সমর্থ হয়েছে। সেইজন্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সচিবালয় সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধন্যবাদ প্রাপ্য। অন্যদিকে ফলাফলও হয়েছে সন্তোষজনক। বেড়েছে জিপিএ ফাইভ। ছত্রিশ হাজার, যা গতবারের চেয়ে প্রায় সাত হাজার বেশি। শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন করাটা এই পরিস্থিতিতে অনুচিত।

এখন বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নিয়ে। এসএসসির ফলাফলে শিক্ষার্থীর মনে যেমন উচ্ছ্বস তেমনি অভিভাবক মনে রয়েছে উৎকণ্ঠা। যদি করোনার প্রাদুর্ভাব ৩/৪ বছর থাকে কিংবা ভ্যাক্সিন আবিস্কার হতে ২/৩ বছর কিংবা আরও অধিক সময় লেগে যায় তাহলে কি উপায়। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় ভ্যাক্সিন খুব দ্রুত আসছেনা। পরিসংখ্যান দেখুন… ১৯৪৭ সালের জিকা ভাইরাস প্রথম সনাক্ত হয়, ৭৩ বছরেও ভ্যাক্সিন আবিস্কার হয়নি। ১৯৫৩ সালে চিকেন পক্স প্রথম সনাক্ত হয়, ভ্যাক্সিন আবিস্কার হয় ১৯৯৫ সালে অর্থাৎ ৪২ বছর পরে। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রথম সনাক্ত হয় ১৯৬৫ সালে, ভ্যাক্সিন আসে ১৯৮১ সালে ১৬ বছর পরে। ইবোলা ভাইরাস সনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে, ভ্যাক্সিন আবিস্কার ২০১৯ সালে (৪৩ বছর), এইচ আই ভি (এইডস) ভাইরাস প্রথম সনাক্ত ১৯৮১ সালে, ৩৯ বছরেও ভ্যাক্সিন আবিস্কার হয়নি। সার্স ভাইরাস প্রথম সনাক্ত হয় ২০০৩ সালে, ১৭ বছর পরে গবেষণা ক্যানসিলড করা হয়েছে। মার্স ভাইরাস সনাক্ত হয় ২০১২ সালে, ভ্যাক্সিন আবিস্কার গবেষণারত। কোভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস) সনাক্ত হয় ডিসেম্বর ২০১৯, ভ্যাক্সিন আবিস্কারের পরিসংখ্যান আপনি নিজেই মিলিয়ে নিন।

করোনা বিবেচনায় সচেতন অভিভাবকগণ পরেছেন বিপাকে। ভয় পাচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের দূরবর্তী শহরে পাঠাতে। মনে অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও ছেলে মেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে পরাতে পারা নিয়ে সংশয়, বাবা-মা সন্তানকে তার স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করতে পারছেনা। বিপত্তি বেঁধেছে করোনা। বিশেষ করে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেদনাদায়ক। কারন ভালোরা আরও ভালোর পেছনে ছুটবে এটাই স্বাভাবিক প্রকৃতির নিয়ম। সেই নিয়মের ধারাবাহিকতায় নিজ উপজেলায় ভালো কলেজ থাকা সত্ত্বেও আরও ভালোর আশায় ছুটে চলে ঢাকা কিংবা উন্নত শহরে। কিন্তু এবার? দ্বিধা-দ্বন্ধে ভূগছেন অভিভাবকগণ। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় দিনাতিপাত করছেন। অন্যদিকে সন্তানের সুস্বাস্থ্য।

কিন্তু কেন এই হতাশা, কেন দ্বিধা-দ্বন্ধ, কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা ? বাড়ির কাছে কি ভালো কলেজ নেই? সেখানে কি ভালো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়না ? স্থানীয় কলেজে পরে কি ছাত্র-ছাত্রীরা ভালো প্রতিষ্ঠান যেমন, মেডিকেল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে না ? সরকারের উচ্চ পদস্থ পদ সমূহ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বড় বড় পদসমূহে কি স্থানীয় কলেজে পড়া ছাত্র-ছাত্রীরা নেই? তাহলে এতো দ্বিধা কেন ? আপনার সন্তাানের জীবনের চেয়ে নিশ্চয়ই তার ক্যারিয়ার বড় নয়? এইচএসসিটা না হয় স্থানীয় কলেজেই পড়লো। স্থানীয় কলেজে পড়ে সে কতটুকুনইবা পেছাবে? আপনার সন্তানের সুস্থতার চেয়ে কি ভালো রেজাল্টের দাম বেশি ? নিশ্চয়ই নয় ? একটা বিষয় ভাবুন, মেধা কখনও চেপে রাখা যায়না। তার বিকাশ হবেই, তা সে যেক্ষেত্রেই হোক।

স্থানীয় কলেজগুলোর শিক্ষকগণও শহরের সেই উন্নত কলেজের সমান যোগ্যতা নিয়েই শিক্ষকতায় এসেছে। হয়তো সেই কলেজ ব্র্যান্ড হয়ে গেছে, আপনার বাড়ির পাশেরটি হয় নাই। তাই বলে কি কলেজ খারাপ কিংবা কলেজের শিক্ষক খারাপ তা কিন্তু নয়। তাই এখনও সময় আছে ভাবুন। আপনি যে কাপড়টি সাধারণ মার্কেট থেকে কিনে তৃপ্ত হতে পারছেন না সেই একই কাপড় বড় বড় ব্র্যান্ডের দোকান থেকে ৩/৪ গুণ বেশি দাম দিয়ে কিনে সন্তুষ্ট হচ্ছেন। এই সন্তুষ্টির জাল থেকে বেরিয়ে আসুন। সরকার হয়তো খুব শীঘ্রই ভর্তি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবে। তারপর হবে অনলাইনে আবেদন। আপনার যদি একান্তই ইচ্ছা থাকে সন্তানকে নামী কলেজে পড়ানোর তাহলে আবেদনের সময় ৫/১০ টি কলেজের মধ্যে স্থানীয় কলেজগুলোকেও প্রাধান্য দিয়েন। বলাতো যায়না, করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়। পরিস্থিতির অবনতি হলে কিংবা আপনার মানসিকতার পরিবর্তন ঘটলে যাতে স্থানীয় কলেজগুলোতে ভর্তি হতে পারে। আবেদনের পছন্দক্রমে না থাকলে সে সুযোগটাও আর থাকবে না।

আমাদের আশা এবং প্রত্যাশা খুব শীঘ্রই স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি, শান্ত হবে বিশ্ব। করোনা মুক্ত হবে পৃথিবী। আবার আমরা স্বাধীনভাবে হাসতে পারবো, চলতে পারবো। আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ সুস্থতা নিয়ে ভাবুন। ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবুন। তারপর সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।

-লেখক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি মুজিব কলেজ, সখিপুর, টাঙ্গাইল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.