ব্রেকিং নিউজ

গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি; ভুল পরিকল্পনা-ত্রুটিপূর্ণ নকশায় ব্যয় বেড়ে গেছে ১০৯ শতাংশ

ঢাকার যানজট কমাতে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ২০১২ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদন করা হয় গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-বিমানবন্দর)। চার বছরে শেষ করার কথা থাকলেও সাড়ে সাত বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ৩৩ শতাংশ।

যদিও ঢাকায় আধুনিক গণপরিবহন চালুর এ প্রকল্পটির পরিকল্পনাতেই সমস্যা ছিল না। ভুল পরিকল্পনা এবং ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশনের কারণে এর নকশা প্রণয়নে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

একাধিকবার সংশোধন করতে হয়েছে প্রকল্প পরিকল্পনা। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে গেছে ১০৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। পাশাপাশি প্রকল্পটির বাস্তবায়নও বিলম্বিত হচ্ছে।

তথ্যমতে, গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর আওতায় সাড়ে ২০ কিলোমিটার বিআরটি লেনের মধ্যে সাড়ে চার কিলোমিটার ছিল এলিভেটেড (উড়াল) অংশ।

এলিভেটেড অংশটি টঙ্গী থেকে ভোগড়া পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। এছাড়া আট লেনের টঙ্গী সেতু ও বিমানবন্দর সড়কের ৬টি মোড়ে ৬টি দুই লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণের কথা ছিল।

যদিও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় প্রকল্প পরিকল্পনায় বেশকিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। এতে প্রকল্প পরিকল্পনা সংশোধন করতে গিয়ে দুই লেনের ফ্লাইওভারগুলোকে চার লেনে উন্নীতকরণের প্রস্তাব করা হয়।

টঙ্গী থেকে ভোগড়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড অংশের দৈর্ঘ্য বেড়ে হয় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। পাশাপাশি চার লেনের এলিভেটেড অংশটি ছয় লেনে নির্মাণের নকশা চূড়ান্ত করা হয়। আর টঙ্গী সেতু নির্মাণ করা হবে ১০ লেনের।

কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জমি অধিগ্রহণের পরিমাণও বাড়ে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন খরচও বেড়ে যায়। নতুন করে যুক্ত হয় সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ। আরও যুক্ত হয় পথচারী পারাপারে ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে আন্ডারপাস নির্মাণ।

আর বাদ দেওয়া হয় ১০টি বাজার পুনর্নির্মাণ। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ভুল পরিকল্পনার কারণে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে গেছে দুই হাজার ২২৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। যদিও বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে এ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে প্রকল্পটির ভুল পরিকল্পনা এবং ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের বিষয়গুলো উঠে আসে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এদিকে প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও গত মে পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৩৩ শতাংশ। এরই মধ্যে মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত তা নির্ধারণ করা হয়। তবে এখনও প্রকল্পের ৬৭ শতাংশ কাজ বাকি রয়ে গেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটি নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও বর্তমান গতিতে চললে তা বর্ধিত সময়েও শেষ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রমতে, বাস্তবায়ন ধীরগতিসহ সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনায় বিআরটি প্রকল্পটি নিবিড় পরিবীক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল আইএমইডি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভুলের বিষয়গুলো সামনে আসে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটি প্রকল্পের কার্যক্রম সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

এছাড়া প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইকালে ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করা হয়। পরে দরপত্রকালে বিস্তারিত ডিজাইনে অবকাঠামোর ধরনের পরিবর্তন হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পটির পরিকল্পনায়ও সঠিক ছিল না।

এদিকে প্রকল্পটির প্রধান দুটি প্যাকেজের (বিআরটি অবকাঠামো নির্মাণ এবং টঙ্গী সেতুসহ এলিভেটেড অংশ নির্মাণ) ঠিকাদারের অর্থ ব্যবস্থাপনাও ছিল দুর্বল। পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে।

আবার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্পটিতে জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির নানা ধরনের দুর্বল দিক রয়ে গেছে। এতে বর্ধিত সময়েও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকল্পটির বেশকিছু ঝুঁকিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নির্মাণকালীন সময়ে যানবাহন চলাচল ও নির্মাণকর্মীদের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।

এছাড়া প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ও পরিবেশ বিপর্যয় এড়াতে আউটফল খালগুলো পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে প্রকল্প এলাকার পার্শ্ববর্তী ১০টি বাজার পুনর্নির্মাণ বাতিল করা হয়েছে। এতে জনসাধারণের উন্নত জীবনমানের উদ্দেশ্যে ব্যাহত হবে। এছাড়া প্রকল্পের কাজ দীর্ঘসময় ধরে চলায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় ধুলাবালি ও যানজটের কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে ও স্থানীয় জনসাধারণের দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রকল্পটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান দুই প্যাকেজের অগ্রগতি খুবই কম। যদিও বর্ধিত সময় প্রায় শেষ। এর মধ্যে প্রথম প্যাকেজের কাজ হয়েছে ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ ও দ্বিতীয় প্যাকেজের ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে তৃতীয় প্যাকেজের আওতায় স্থানীয় সড়কগুলো পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে।

যদিও ১০টি বাজার পুনর্নির্মাণ অংশ বাতিল করায় এ প্যাকেজের কাজ কমে গেছে। আর চতুর্থ প্যাকেজের আওতায় গাজীপুরে বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ প্যাকেজেও নির্ধারিত মেয়াদের প্রায় দ্বিগুণ সময় লেগেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্প এলাকার জন্য প্রণীত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এজন্য নিয়োজিত জনবলও অপ্রতুল। এতে প্রকল্প এলাকায় প্রতিনিয়ত যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি পথচারীরাও রাস্তা পারাপারে ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

সূত্র: শেয়ার বিজ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.