ব্রেকিং নিউজ

শাহজাহান সিরাজকে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন টাঙ্গাইলবাসী

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: একটা রাষ্ট্রে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ একবারই হয়, আর সেই যুদ্ধের অন্যতম অকুতোভয় সৈনিক, সেসময়ের ছাত্রনেতা ও পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ শাহজাহান সিরাজকে দলমত নির্বিশেষে বিদায়ী সম্মান জানাতে কার্পণ্য করেননি টাঙ্গাইলবাসী।

শ্রদ্ধা আর চোখের জলে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক ও সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সিরাজকে শেষবারের মতো বিদায় জানিয়েছেন জেলার সর্বস্তরের মানুষ। বুধবার (১৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টায় অ্যাম্বুলেন্সযোগে শাহজাহান সিরাজের মরদেহ ঢাকা থেকে এলেঙ্গায় পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রিয় নেতাকে একবার দেখার জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।

এরপর দুপুর ১২টার দিকে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা সরকারি শামসুল হক কলেজ মাঠে তার প্রথম জানাজা ও দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে কালিহাতী সদরের শাজাহান সিরাজ কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা নিপার উপস্থিতিতে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এই বীর সন্তানকে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব মেনে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মাঠে লোক সংকুলান হয়নি।

পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ জানাজায় শরিক হন। দুটি জানাজাতেই প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ ফুল দিয়ে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় বক্তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে সবার উদ্দেশে কথা বলেন শাজাহান সিরাজের মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা। এসময় তার বাবার আত্মার মাগফেরাত কামনার জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি। জানাজা শেষে লাশ ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

জানাজায় অংশগ্রহণ করেন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বিকম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য লুৎফর রহমান মতিন, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল, টাঙ্গাইল জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম রফিক, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শুকুর মাহমুদ, কালিহাতী পৌরসভার মেয়র আলী আকবর জব্বার, এলেঙ্গা পৌর মেয়র নূর এ আলম সিদ্দিকীসহ জেলা ও উপজেলা বিএনপিসহ আওয়ামী লীগ এর অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

প্রসঙ্গত, শাহজাহান সিরাজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শাহজাহান সিরাজ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের ‘চার খলিফা’ বলা হতো শাহজাহান সিরাজ ছিলেন তাদেরই একজন।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল এক ছাত্রসমাবেশে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) এর দায়িত্ব নেন। মুক্তিযুদ্ধের পর শাহজাহান সিরাজ সর্বদলীয় সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন।

এরপর জাসদ বিভক্ত হয়ে গেলে তিনি একাংশের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে তিনি তার নেতৃত্বাধীন জাসদ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে যোগদান করে দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ষাটের দশকে বঙ্গের আলীগড় খ্যাত টাঙ্গাইলের করটিয়ার সরকারি সা’দত কলেজের দুইবার ভিপি ছিলেন তিনি। এরপর তিনি ১৯৭০-৭২ মেয়াদে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে দক্ষ, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ শাহজাহান সিরাজ জাসদ ও বিএনপি’র প্রার্থী হয়ে ১৯৭৯, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি) ও ২০০১ সালে ৫ বার টাঙ্গাইল- ৪ (কালিহাতী) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি বিএনপি সরকারের নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।

বর্ণাঢ্য রাজনীতিবিদ শাজাহান সিরাজ ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে এক মুসলিম সম্ভান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল গণি মিয়া এবং মাতার নাম রাহিমা খাতুন। শিক্ষানুরাগী হিসেবে তিনি কালিহাতী উপজেলা সদরে কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

মৃত্যুকালে স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, এক ছেলে রাজিব সিরাজ শুভ এবং এক মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.