ব্রেকিং নিউজ

করোনাকালীন প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের প্রচেষ্ঠা ও বাস্তবতা…..শামীম আল মাসুদ রানা

আমি যখন সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে সখীপুর উপজেলায় যোগদান করি তখনও সখীপুরের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। একচেটিয়া দাপট ছিল কিন্ডার গার্ডেন স্কুল গুলোর। সচেতন ও শিক্ষিত অভিভাবক সকলেই ভাবত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে লেখাপড়া হয়না। বিষয়টা আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়। শুরু করি কাজ। দিনরাতের ভাবনায় ছিল কী করে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে আসব। ২০১৭ সালে ব্যাপক ভাবে পরিদর্শন এবং পরিদর্শনের নির্দেশনা ফলোআপ শুরু করি। এবং ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭ সালের উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়কে অতিথি করে প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মানোন্নয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা করি। “আমরা করব জয়’ এই গানটি দিয়ে পথচলা শুরু। বিদ্যালয়ের পরিবেশ আকর্ষনীয় করণ, সামাজিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিসহ সাবেক কৃতি শিক্ষার্থী, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এসএমসি’র অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

২০১৮ সালেই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যপক পরিবর্তন সাধিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ইনোভেশন শোকেসিংএ টাঙ্গাইল জেলা সেরা পাঁচ অবস্থান করে। এবং “আমাদের বিদ্যালয় আমরাই গড়বো” ইনোভেশন সারা বাংলাদেশে র‌্যাপ্লিকেড করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এই ইনোভেশনের অংশ হিসেবে যে সমস্ত ভিডিও এবং স্থির চিত্র প্রদর্শন করা হয় তার সিংহভাগই সখীপুর উপজেলার । বর্তমানে ইনোভেশনের ২৭ টি সূচক নিয়ে কার্যক্রম চলমান। ২০১৮ সালে স্থানীয় জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে তাদের আর্থিক সহায়তায় শতভাগ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ , পথ নির্দেশক, টিনশেড ভবন, সীমানা প্রাচীর নির্মাণসহ প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। শিক্ষা মানুষকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করে। স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য মানুষ প্রতিনিয়ত চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগাায়। সেই চিন্তায় শিশুদের আরো আধুনিক ও যুগোপযোগ করার জন্য ক্লাস্টার ভিত্তিক, মেধা বিকাশ অন্বেষণ, বিতর্ক প্রতিযোগীতা, গণিত উৎসবসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

২০২০ সালে আমার ক্লাস্টারের সকল শিক্ষক যখন আমাকে কথা দেয় এই সালেই প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে ঠিক তখনই ভয়াল থাবা বসায় করোনা নামক ভাইরাসটি। হাজার হাজার কোমলমতি শিশুকে বঞ্চিত করে শিক্ষা থেকে। করোনা আক্রমনের পর থেকেই শুরু হয় চিন্তা ভাবনা। শুরু হয় সংসদ টেলিভিশনে অনলাইন ক্লাস। এবং এ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান।

চ্যালেঞ্জ সমূহ: এই উপজেলার প্রায় ৪০ শতাংশ অভিভাবক নিন্ম আয়ের শ্রমজীবি। সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে তারা অতটা সচেতন ও আন্তরিক নয়। সকল শিক্ষার্থীর বাড়িতে টেলিভিশন নেই। সকল শিক্ষার্থীর বাড়িতে Android মোবাইল এমনকি Analog মোবাইলও নেই। ৬০ থেকে ৭০ ভাগ অভিভাবক নিরক্ষর অথবা লেখাপড়া নিয়ে সচেতন নয়। অভিভাবকদের মোবাইলে ফোন দিলেও সন্তানের সাথে কথা বলা যায়না। শ্রমজীবি বাবা মায়ের সাথে কাজে সন্তানরাও সহযোগী হিসেবে কাজে নিয়োজিত। কিছু শিক্ষার্থীর অভিভাবক Android মোবাইল থাকলেও online Class  দেখার জন্য তা অপারেট করতে সক্ষম নয়। সর্বোপরি শতভাগ শিক্ষার্থীকে online স্কুল এবং মোবাইলে পাঠদানের আওতায় আনা যাচ্ছেনা । সেবাপ্রদানকারীর ভোগান্তি সমূহ: টেলিভিশন না থাকায় রুটিন দিয়েও ফলপ্রসু হচ্ছেনা।

Android মোবাইল না থাকায় সবার ক্লাসও পাঠাতে পারছে না । একই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মোবাইলে বারবার ফোন দিয়েও শিক্ষার্থীকে পাচ্ছেনা । দূর্বল শিক্ষার্থী যারা তারা শিক্ষকের সাথে পাঠ নিয়ে আলোচনা করছেনা । গণিত বিষয়ের শিক্ষকের মোবাইলে পাঠদান পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। শতভাগ শিক্ষার্থীকে প্রচেষ্ঠা সত্তেও Live শিক্ষায় সংযুক্ত করতে পারছেনা। সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি সখীপুর উপজেলায় “সখীপুর অনলাইন স্কুল” নামে একটি online স্কুলের যাত্রা শুরু হয়েছে। শ্রেণি ভিত্তিক শিক্ষক ১০/১২ জনের গ্রুপ তৈরী করে সাপ্তাহিক রুটিন প্রণয়ন করেছে। কোনে বিষয়ের সমস্যা হলে ঐবিষয়ের শিক্ষক সহযোগীতা করছে। যাদের Android মোবাইল আছে তাদের রুটিন এবং Live Class পাঠানো হচ্ছে। এবং যাদের Android মোবাইল নাই তাদের Analog মোবাইলে বাড়ির কাজ দিচ্ছে ও তা আদায় করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। যাদের টেলিভিশন নেই তাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে পাশের বাড়িতে গিয়ে টেলিভিশনে ক্লাস দেখতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। স্ব-স্ব শিক্ষার্থীর অভিভাবকের উপস্থিতিতে প্রতি ১৫ দিনে বা মাসে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়াও যে সমস্ত অভিভাবকের অহফৎড়রফ মোবাইল আছে এমন অভিভাবক নিয়ে শ্রেণি ভিত্তিক মেসেঞ্জার গ্রুপ তৈরীর কাজ চলমান।

একাডেমিক সুপারভিশন, মনিটরিং ও উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পৌঁছে দেয়ার জন্য সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিয়মিত Zoom Meeting করছি। এবং আমার ক্লাস্টারের ৫৬ জন প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য Whatsapp  গ্রুপ তৈরী করা হয়েছে। সকলের প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠা সত্তেও শতভাগ শিশুর কাছে তাদের মত করে আমরা পৌঁছাতে পারছিনা । এজন্য প্রয়োজন সকল অভিভাবকের আন্তরিক প্রচেষ্ঠা ও সদিচ্ছা। আমার শিক্ষক মন্ডলী, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মহোদয়, এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচেছ শিশুদের লেখা-পড়ার মধ্যে রাখতে। আমি আশা করি এবং বিশ্বাস করি আমার অভিভাবকবৃন্দ তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার প্রতি যত্নশীল হবেন। তবেই আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। আমাদের অজানা শত্রু করোনা ভাইরাস ও বন্যাকে মোকাবেলা করে আমার সন্তানেরা শীঘ্রই আবার তাদের প্রিয় আঙ্গিনায় ফিরবে। তাদের কলকাকলিতে ভরবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ সেই প্রত্যাশা করছি।

লেখক
শামীম আল মাসুদ রানা
সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার
সখিপুর, টাঙ্গাইল।