ইসলামে কোরবানির শিক্ষা

বিশ্বময় মহামারি করোনার এ ভয়াবহ দিনেও মুসলিম উম্মাহ যথাযথভাবে ইসলামি নিয়মনীতি অনুসারে কোরবানির ঈদ উদযাপন করবে, ইনশাআল্লাহ। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, যাদের আল্লাহ সামর্থ্য দিয়েছেন তাদের উচিত হবে কোরবানিতে অংশ নেয়া এবং বেশি বেশি কোরবানি দিয়ে গরিবদের মাঝে তা বণ্টন করে দেয়া।

কোরআন করিমে কুরবানির পটভূমি

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরপর সেই পুত্র (ইসমাইল) যখন তার সাথে দৌড়াবার বয়সে উপনীত হলো, তখন সে (ইব্রাহিম) বলল, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখছি, আমি যেন তোমাকে জবাহ করছি। অতএব তুমি চিন্তা করো, তোমার কী অভিমত? সে বলল, হে আমার পিতা! তুমি যে আদেশ পেয়েছ, তা-ই করো, ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মাঝে দেখতে পাবে। এরপর তারা যখন উভয়েই আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণ করলো এবং সে তাকে জবাহ করার জন্য কপালের ওপর উপুড় করে শোয়ালো, তখন আমরা তাকে ডাক দিলাম, হে ইব্রাহিম! তুমি তোমার স্বপ্নকে অবশ্যই পূর্ণ করেছো। আমরা এ রূপেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা।’ (সুরা সাফফাত) হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানির অনুসরণে মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ১০ জিলহজ তারিখে পশু কোরবানি করে থাকে।

কোরবানি সম্পর্কে মহানবি যা বলেছেন

ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব অতিব্যাপক। এ ব্যাপারে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সময় তার উম্মতকে নসিহত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে লোক সকল! জেনে রাখ, প্রত্যেক পরিবারের পক্ষে প্রত্যেক বছরই কোরবানি করা আবশ্যক।’ (আবু দাউদ ও নাসাঈ)

তাই কেউ যদি মনে করে যে, প্রতি বছরই তো কোরবানি দিয়ে যাচ্ছি এবার করোনার কারণে না দিলে কী হবে। এ ধরনের ধারণা মোটেও ঠিক নয়। কারণ কোরবানি শুধু একবারের জন্য নয় বরং তা সারা জীবনের জন্য।

কোরবানির নিয়ম

হজরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং উট সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যেতে পারে।’ (মুসলিম, আবু দাউদ)

কোরবানির জন্য উট, গরু, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা থেকে যেকোনো পশু জবাই করা যেতে পারে। উট ও গরু সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে এবং ভেড়া ছাগল প্রভৃতি এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে দিতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো কোরবানির পশুর বয়স নিয়ে। উট তিন বছরের, গরু দুই বছরের, ভেড়া ছাগল প্রভৃতি এক বছর বয়সের হতে হবে। দুম্বা যদি মোটাতাজা হয় তাহলে ছয় মাসের বয়সের দুম্বাও কোরবানি করা বৈধ হবে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা একাই কোরবানি দিতে পারেন। যদি এমনও হয় যে, ভাগে কোরবানি দেয়ার নিয়ত ঠিকই রয়েছে কিন্তু তিনি কারো সাথে অংশ নেয়ার সুযোগ পেলেন না আর একা একটি গরু কেনারও তার সামর্থ্য নেই সে ক্ষেত্রে তিনি একটি ছাগল কিনে হলেও কোরবানি দেবেন। কারণ আল্লাহ বান্দার হৃদয় দেখে থাকেন। কোরবানির আমল থেকে যেন কেউ বাদ না পড়েন এর দিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে।

কেমন হবে কোরবানির পশু

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আমরা যেন কোরবানির পশুর চোখ, কান ভালোভাবে দেখে নেই। যে পশুর কানের শেষ ভাগ কাটা গিয়েছে অথবা যার কান গোলাকার ছিদ্র করা হয়েছে বা যার কান পেছনের দিক থেকে ফেরে গিয়েছে তা দিয়ে আমরা যেন কোরবানি না করি।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, নিসাই)

তাই এ বিষয়টির ওপর খুব গুরুত্ব দিতে হবে, আমরা যে পশুটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দেব তা যেন নিখুঁত হয়। কোনোভাবেই কোরবানির পশু দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত, লেংড়া, কান কাটা, শিং ভাঙা এবং অন্ধ পশু কোরবানি করা বৈধ নয়।

জবাহ করব আল্লাহর নামে

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ঈদে ধূসর রঙের শিংওয়ালা দুটি দুম্বা কোরবানি করলেন। তিনি সেগুলোকে নিজ হাতে জবাহ করলেন এবং জবাহ করার সময় ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবর’ বললেন।’ (মুত্তাফাকুন আলায়হে)

এছাড়া কোরবানির পশু খুব ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উচিত, ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা জবাই করে পশুকে কষ্ট দেয়া ঠিক নয়। তাই যারা কোরবানির পশু জবাহ করবেন তারা অবশ্যই মনে রাখনে জবাহ করার অস্ত্র যেন খুব ধারলো হয়। ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে কোরবানি করা আরম্ভ হয় আর তা ১২ জিলহজ সূর্য ডুবার আগ পর্যন্ত দেয়া যায়।

কোরবানির প্রতিদান

হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এ কোরবানি কী? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, তোমাদের পিতা হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নত। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এতে আমাদের কী পুণ্য আছে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কোরবানির পশুর প্রত্যেক লোমের জন্য একটি করে পুণ্য আছে। তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! পশমওয়ালা পশুর পরিবর্তে কী হবে? অর্থাৎ এদের পশম তো অনেক বেশি। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, পশমওয়ালা পশুর প্রত্যেক পশমের পরিবর্তে একটি পুণ্য রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ)

কোরবানির চামড়া জাতীয় সম্পদ

কোরবানির চামড়া এটি জাতীয় সম্পদ। তাই সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে চামড়া যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। চামড়া যাতে নিখুঁত থাকে সে জন্য চামড়া ছাড়ানোর সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যেন তা কেটে বা ছিঁড়ে না যায়। এটিও জানা প্রয়োজন যে, কোবরানির চামড়ার বিক্রিত অর্থ গরিবদের মাঝে বিতরণ করতে হয়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

ইসলাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। বলা হয়েছে, এটি ঈমানের অংশ। ঢাকা শহরে দেখা যায় কোরবানির সময় অনেকেই কোরবানির পশুগুলোকে রাস্তাতেই জবাহ করেন। যার ফলে জনগণের চলা ফেরার যেমন সমস্য হয় তেমনি রাস্তা-ঘাটও নোংরা হয়। একটি শান্তির ধর্মের নাম হচ্ছে ইসলাম, কারো কষ্ট হোক এটা ইসলাম চায় না। রাস্তায় পশু কোরবানি করে কোনোভাবেই অপরের যেন কষ্ট না হয় সে দিকে সবার দৃষ্টি থাকা চাই। এছাড়া বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানিতে অংশ নিতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরবানি গ্রহণ করুন, আমিন।

মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.