প্রাপ্তি

ফেনোপিলের নালিতে হাজার হাজার অণুচক্রিকা দৌড় প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেইসব সংকর অণুচক্রিকাগুলি অপেক্ষা করে আছে একটা স্পন্দনের জন্য।তারা প্রতিনিয়ত খেলে যাচ্ছে।

প্রথম স্পন্দন বাজানোর সাথে সাথে তাদের প্রাপ্তি – অপ্রাপ্তির খাতায় লেখা শুরু হয়। আবার দ্বিতীয় স্পন্দন স্পন্দিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির খাতাটার সমাপ্তি ঘটে।
যারা প্রাপ্তি – অপ্রাপ্তির খাতায় শিরঃরেখা না আঁকাতে পারে, সেদিনই তাদের জীবনের সবচেয়ে আপন ভীতি ও আফসোসের সৃষ্টি হয়।

এইসব ভীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মে মাসের বিংশ তারিখে শুরু হয় আমার জীবনের প্রাপ্তি – অপ্রাপ্তির শিরঃরেখার অভিষেক। নাম আমার জোনাকি।
ছোটবেলা থেকেই একটু আনমনে স্বভাবের ছিলাম।কারোর সাথে খেলতাম না। কারোর সাথে গভীর ভবে মিশতে পারতাম না।

মায়ের মুখ থেকে শোনা। আমি নাকি প্রথমবার এই পৃথ্বীর আলো বাতাসের স্পর্শ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনবার মা বলে ডেকেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস!যে মেয়েটা জন্ম নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা বলে ডেকেছিল, অথচ সেই মেয়েটাই এখন নাকি কথা বলতেই পারে না।।

না, না! কথা বলতে পারে না বললে ভুল হবে। কথা বলতে পারে। কিন্তু কথা বলতে পারাটা আর কথা না বলতে পারাটা তার কাছে একই।

সবাই আমাকে জোনাকি বলে ডাকলেও আমার দাদী আমাকে জোনাই বলে ডাকত। রাতের অন্ধকারে জোনাই যেমন করে নিভে – জ্বলে, অপ্রাপ্তির খাতাটা ঠিক তেমন করে অগ্নি প্রদীপের শিখায় পুড়িয়ে দিতে পারি– বোধ হয় এই আশাটুকু নিয়ে দাদী আমার নাম জোনাকি রেখেছিলো। কতটুকু পূরণ করতে পারবো তার উত্তর আমার আজও অজানাই রয়ে গেছে।।

স্কুল জীবনে পর্দাপন করার পর বিভিন্ন কিছুর সাথে পরিচিত হই। যেমন- গান, নাচ, চিত্রংকন, বির্তক, কবিতা আবৃত্তি, বক্তব্য আরো অনেক কিছু। মুখে জড়তা ছিলো বলে শুধুমাত্র চিত্রংকনে অংশগ্রহণ করে ছিলাম। কিন্তু খালি হাতে ফিরেছিলাম। আর তাই আমার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে অনেক হাসি তামাশা করতে থাকে। আমি আরো হতাশায় ভুগতে থাকি।।

অপ্রাপ্তির খাতাটায় কখনো ধুলো জমতো না। কিন্তু প্রাপ্তির খাতাটা সবসময় মনের ছিন্নমূলে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকত।।

কথা বলতে সমস্যা হয় দেখে সবাই আমাকে নিয়ে মজা করত। ইগনোর করত। সবসময় ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে জানালার বাহির পানে চাহিয়া থাকতাম। আর ডাইরি লিখতাম।

একদিন বিরাট বিরাট মনীষীদের জীবনী পড়ে আমার নিভে যাওয়া আলো আবার ফিরে পেলাম। আমি নিজের প্রতিভা খোঁজার চেষ্টা করলাম। খুঁজে পেলাম নি। আমার প্রতিভা না খুঁজে পেলেও আমি মনে একটা প্রতিজ্ঞা করলাম, “আমি মুখে জড়তা নিয়েই বিশ্ব জয় করব।”

যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, আমি আমার ভালো লাগার মতো একটা আবেগ খুঁজে পেলাম। সেই আবেগ খুঁজে পেয়েছি আমি আমার শিক্ষাগুরুর কাছ থেকে।তিনি অনেক সুন্দর করে কাব্য রচনা করতেন। তার কাছ থেকেই আমার কাব্য রচনা করার হাতেখড়ি। সদ্য কয়েকদিন আগে তার লেখা প্রবন্ধ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

তার অনুপ্রেরনায় আমি কাব্য রচনা করেই এগিয়ে যেতে চাই। কবিতা আবৃত্তির জন্য একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলেছি। সদ্য কয়েকদিন আগে বাংলা শ্রাবণ মাসে আমার লেখা কাব্য ” তরুণ আলো” নামক ক্ষুদ্র এক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

সবে আমার বয়স ১৬।জানি না প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির খাতায় শিরঃরেখা অর্জন করতে পারব কিনা। চেষ্টা করে যাবো।

আর যদি মৃত্যু আমার শরণাপন্নে থাকে…আমি যদি শিরঃরেখা না অর্জন করতে পারি…

তবে এই শিরঃরেখাই আমার প্রাপ্তি – অপ্রাপ্তির খাতায় শিরঃপীড়ার রূপ ধারণ করবে। শুধু আপসোস রয়ে যাবে।

লেখক:
জিন্নাতুন্নেছা মারিয়ানা,
সখিপুর পি এম পাইলট মডেল সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
সখিপুর, টাঙ্গাইল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.