ব্রেকিং নিউজ

যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বর্ষায়”

স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কর্মজীবনে শহরে থাকলেও গ্রামের মানুষের সাথে রয়েছে নিবিড় এক মেলবন্ধন। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে গত মার্চ মাস থেকে কলেজ বন্ধের সুবাদে এসময় গ্রামে থেকে গ্রামের মানুষের সাথে মিশে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজে অংশ গ্রহণ কিংবা প্রকৃতি দেখার একটু বেশি সুযোগ হয়েছে। উপলব্ধি করতে হয়েছে কিছু মধুর আবার কিছু রিক্ত অনুভূতির। এরইমধ্যে চলে এসেছে বর্ষা। প্রকৃতিকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করতেই বর্ষার আগমন।

যতদূর চোখ যায় শুধু থৈথৈ পানি আর পানি। বিশাল জলরাশিতে ভাসছে আমাদের গ্রাম। বর্ষায় ভর করে প্রকৃতি পদার্পণ করছে অপরূপ সৌন্দর্যের অনন্ত এক নব যৌবনে। সেই সাথে দোলা দিয়ে যাচ্ছে মনেও। এক কথায় প্রকৃতি নববধূ হলে বর্ষা তার অলংকার। এ সময়ে বর্ষার ঝমঝম বৃষ্টির ধ্বনি প্রিয়ার আলতা রাঙা পায়ের নূপুরের শব্দ হয়ে বীণার সুরের মতো বাজতে থাকে হৃদয়ে। বর্ষার পানির গা ঘেঁষে দূর দূরান্ত থেকে আসা সুশীতল বাতাস প্রেয়সীর বেলানের মতো গোলাকার রেশমি কাঁচের চুড়ি ভর্তি হাতের কোমল পরশে দোলা দিয়ে যায় পানির কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা শরীরে।

কখনো কখনো দিগন্তের দিকে তাকালে প্রিয়ার নীল শাড়ির আঁচল বিছানো নীল আকাশটা তাঁর দীঘল কালো কেশে ঢাকা পড়ে মেঘের ইঙ্গিত দেয়। অবিরাম বর্ষণে রাস্তাঘাট বাড়ির ময়লা আবর্জনা ধুয়ে মুছে বর্ষার ঘোলা পানিই প্রিয়ার চোখের কাজল গলে কালো বর্ণ হয়ে ঢেউ খেলে সুদূর দিকদিগন্তে। আমাদের ছোট গ্রামের বিল ভর্তি সাদা শাপলা বর্ষার ঢেউয়ের সাথে মৃদু বাতাসে প্রিয়ার ছন্দে ছন্দে হেটে যাওয়ার মতো দুলতে থাকে অনবরত।

বর্ষার অলস দিনে পানিবন্দি হয়ে গ্রামের ঝিয়ারিরা একসঙ্গে পা মেলে দুর্গাপূজায় প্রিয়ার হাতে লাগানো মেহেদির আলপনার মতো সুঁইয়ের আগায় সুতা ঠেলে বুনতে থাকে নকশিকাঁথা। বর্ষার গোধূলি যেন বিরাজ করে দুর্গাপূজায় সিঁদুর খেলানোর সময় প্রিয়ার গালে মাখানো লাল টুকটুকে সিঁদুর হয়ে। প্রেয়সীর কপালে হলুদ টিপের মতো শোভা পায় কদম গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা কদম।

বর্ষার চাঁদনি রাত। ঘরের ডোয়ার সন্নিকটে পানির কলধ্বনি। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোতে আলোকিত বিছানায় প্রিয়ার ভেজা চুলের সুঘ্রাণ কেয়া ফুলের সৌরভ হয়ে খেলা করে ঘুম না আসা মুহূর্তে। বাংলা সাহিত্যের কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বর্ষাকে প্রেমিকা হিসেবে কল্পনা করে গানের মাধ্যমে তাঁকে আহ্বান করে বলেছেন- ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো, চলে এসো, এক বর্ষায়…।

মনে পড়ছে বাল্যকালের স্মৃতি বিজারিত সেই বর্ষার দিনগুলোর কথা। বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত বিভিন্ন সংগীত মালায় কুইজে নিয়মিত অংশ গ্রহণ করায় রেডিও অন করলেই শোনা যেতো আমার নাম। সবাই এক সাথে জড়ো হয়ে দুপুর বেলায় পানির কিনারে বসে রেডিওতে নাম শোনার আনন্দময় মুহূর্ত। নৌকায় বৈঠা মেরে স্কুলে গিয়ে আবার ভিজতে ভিজতে বাড়ি আসা।

বিলে শাপলা তোলা অথবা নৌকায় বিয়ের বরযাত্রী হয়ে যাওয়ার মতো আনন্দময় স্মৃতিগুলো। কিন্তু গ্রামে বর্ষার এই আনন্দ আবার বিরহ কাতর করে তুলছে প্রতিনিয়তই। দেখতে হচ্ছে পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু থেকে শুরু করে নৌকা ডুবে কিংবা বর্ষায় এসময়ে গ্রামের লোকালয়ে উঠে আসা সাপের আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার মতো বিষাদময় ঘটনা। এমন বর্ষা চাই না যে বর্ষার সৌন্দর্যের অন্তরালে প্রিয়জনকে স্মৃতি করে বুকে নিয়ে বাঁচতে হয়।

তাই বর্ষাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের মতো আমারও গানে গানে বলতে হচ্ছে- আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে জানিনে জানিনে/ কিছুতে কেন যে মন ভালোলাগেনা / ঝরঝর মুখর বাদল দিনে..।

 

এ বি সিদ্দিক

প্রভাষক (মার্কেটিং)

বল্লা করোনেশন কলেজ

বল্লা বাজার, টাঙ্গাইল  

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.