ব্রেকিং নিউজ :

টাঙ্গাইলের মধুপুরের গারো নারীদের বাতিঘর প্রতিভা সাংমা আর নেই

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: না ফেরার দেশে চলে গেলেন মধুপুরের গারো নারীদের বাতিঘর প্রতিভা সাংমা।

গারো জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে এবং গারো নারী জাগরণে অনন্য অবদান রেখে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে “দিদি” হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল ৬টার দিকে ৮৭ বছর বয়সে মধুপুর উপজেলার নিভৃত পল্লী ইদিলপুরের বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

গারো সমাজে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বেশ কয়েকবার সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন প্রতিভা সাংমা।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর হাত থেকে তিনিসহ সাত মহিয়সী নারী ‘আনসাং ওমেন ন্যাশন বিল্ডার্স- ২০১৮’ সম্মাননা গ্রহণ করেন।

এবারও পেয়েছিলেন দেশের অন্যতম পুরস্কার।

করোনা সংকটে তার সম্মননা গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছিল বলে জানা গেছে। এর আগে ১৯৯৬ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস এবং ২০০২ সালে জয়েনশাহী আদিবাসি উন্নয়ন পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

তাকে নিয়ে গণমাধ্যমে বহুবার বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।

অরণ্যানী সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা গারো সমাজে দু’একজন সাহসী নারীর অন্যতম দিদি খ্যাত এ প্রতিভা সাংমা।

শত প্রতিকূলতা ঠেলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথপ্রদর্শক সংগ্রামী সাহসী নারী ছিলেন তিনি। মধুপুরের ইদিলপুর গ্রামের বাবা সনাতন মৃ ও মা বংগবালা চাম্বুগংয়ের কোল জুড়ে ১৯৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর তার জন্ম। ।

বছর কয়েক আগে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রতিভা সাংমা বাংলানিউজের এ করেসপন্ডেন্টকে জানিয়েছিলেন, মায়ের প্রেরণা আর উৎসাহে ১৯৩৮ সালে ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে লেখাপাড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক হাতে খড়ি তার। হোস্টেলে থেকেই লেখাপড়ার প্রাথমিক ধাপ শুরু।

পরে ১৯৪৯ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিকুলেশন শেষ করেন। ’৫১ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটের পর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও মায়ের নির্দেশে ১৯৫২ সালে প্রথমে ময়মনসিংহ শহরের হলিফ্যামিলি এবং পরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সেন্টমেরি মিশনারি হাইস্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। শিক্ষকতা চলে বেশ কয়েক বছর। এর মধ্যেই নিজ এলাকার কথা তার চিন্তায় আসে।

মধুপুর বনাঞ্চলের গারো সমাজ সে সময় শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে ছিল। নিজ সম্প্রদায়ের কথা ভেবে ১৯৬৫ সালে হালুয়াঘাটের সেন্টমেরি মিশনারি হাইস্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। মিশনারিদের সৌজন্যে গড়ে ওঠা ভুটিয়া প্রাইমারি স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। একইসঙ্গে ছিলেন আশপাশের দু’টি মিশন স্কুলের অতিথি শিক্ষক।

ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও যাতে স্কুলে আসে, সেজন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে গারো নারীদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতেন। তার ভাষায়, ‘আমি অনেক গারো বাড়িতে গিয়েছি। মা-বোনদের বলেছি, তোমরা জেগে ওঠো, সন্তানদের স্কুলে পাঠাও। শিক্ষিত না হলে তোমাদের অভাব যাবে না, নিজেরা টিকে থাকতে পারবে না। ’

তিনি গারো পল্লীতে মিশনারি স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হেডম্যান ও পাদ্রিদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। তার স্বপ্ন পরে সফল হয়। মধুপুর বনাঞ্চলে মিশনারির শতাধিক প্রাথমিক ও তিনটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

এছাড়া ২০টি সরকারি ও রেজিস্ট্রিপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এখন শত শত গারো শিশু পড়ালেখা করে। সত্তরের দশকে তার হাতে গড়া গারো অনেক নারী উচ্চশিক্ষা নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, নারী ও আদিবাসী আন্দোলনে নিরন্তর ভূমিকা রাখছেন। স্বীকৃতি হিসেবে তারাও পুরস্কৃত হচ্ছেন।

জলছত্র কর্পোস খিস্ট্রি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক মারিয়া চিরান তাদের অন্যতম। তিনিও সম্প্রতি ভ্যাটিকানসিটির পোপের কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। পীরগাছা মিশন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নীলিমা থিগিদি এবং গারো নারী সংগঠন আচিকমিচিক সোসাইটির প্রধান সুলেখা ম্রংসহ অনেকে প্রতিভা সাংমার অনুসারী ও শিক্ষার্থী।

বহু প্রতিভার অধিকারী প্রতিভা সাংমার সংস্কৃতি চর্চার প্রতি আগ্রহ দেখে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকার আদিবাসী কোটায় গার্লস গাইডের নেত্রী হিসেবে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানের পেশোয়ারে পাঠিয়েছিল তাকে। সেই অভিজ্ঞতা পরে তিনি কাজে লাগিয়েছেন স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে। মুক্তিযুদ্ধে মধুপুর বনাঞ্চলের গারোরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দেশে পুরোমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিভা আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসেন। জলছত্রের ফাদার ইউজিন হোমরিক সিএসসি

(সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমেরিকার মিশিগানে মারা গেছেন) গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতেন। দেশের ওই দুর্দিনে প্রতিভা গার্লস গাইডের প্রশিক্ষণ কাজে লাগান। জলছত্র ধর্মপল্লীতে নার্স হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিতেন।

স্বাধীনতার পর আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান। ১৯৭২ সালে মধুপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে এখান থেকেই ১৯৯১ সালে অবসর নেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেননি প্রতিভা সাংমা। গ্রামের সব শিশুকে তিনি সন্তান মনে করতেন। তিনি ইদিলপুরের বাড়িতে তার পালকপুত্র জেনেট মৃ, পুত্র বধূ এবং পাঁচ নাতিনাতনিকে নিয়ে থাকতেন।

তার মৃত্যুতে গড়াঞ্চলের পুরো এলাকার গারো সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাকে এক নজর দেখতে ছুটে আসছেন হাজারো গারো নারী-পুরুষসহ অনেকে। বিকেল সাড়ে ৪টায় বাড়ির পাশেই সমাধিস্থ করা হয় তাকে।

"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.