সবার জন্য খাদ্যে মানসম্পন্ন পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি

ছেলেদের জন্য সব পুষ্টিকর খাবার থাকলেও মেয়েদেরও যে পুষ্টির দরকার এটা এসব পরিবার মনেই করে না। এমনও দেখা ও শোনা যায় অনেক পরিবারে বয়ঃসন্ধির পর ডিম খাওয়াও বারণ। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতেও একই অবস্থা। এমনকি গর্ভবতী অবস্থায়ও পরিমিত খাবার দেওয়া হয় যাতে পেটে বাচ্চা বড় হয়ে না যায়। বাচ্চা বড় হলে নরমাল ডেলিভারি হবে না সিজার করতে হবে তাই এ খাবারের হিসাব। আবার বাচ্চা হওয়ার পর মায়ের অনেক পুষ্টি ঘাটতি থাকে, সেই পুষ্টিপূরণের জন্যও পরিমিত পরিমাণ মাছ মাংস ডিম দুধ দেওয়া হয় না সদ্যজাত বাচ্চার পেট খারাপের অজুহাতে। এ কারণে তার বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অপুষ্ট বাচ্চা জন্মের সময় ওজনও খুব কম ছিল, সে কারণে বাচ্চাটা প্রায়ই অসুস্থ থাকে। ছোটবেলা থেকে অপুষ্টিতে ভোগার কারণে বাচ্চা ও মায়ের এত শারীরিক সমস্যা। নারীর পুষ্টিহীনতার কারণে নারী ও তার পরবর্তী প্রজন্মও স্বাস্থ্য সঙ্কটে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দারিদ্র্য অথবা অসেচতনতার বাইরেও মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। এ ক্ষেত্রে কাজ করে মাত্রাতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচেতনতা। মুটিয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেক পরিবারের কিশোরীরা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। নিয়ম না মেনে খাবার কমিয়ে দেওয়ার কারণে যথেষ্ট সচ্ছল পরিবারের হলেও অনেক মেয়েই পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। আর অপুষ্টির কারণে প্রায়ই তারা নানা রকম অসুবিধায় ভোগে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা অপুষ্টি। শিশু ও প্রজনন বয়সি নারীদের এই সমস্যা প্রকট। অপুষ্টির প্রধান কারণ সব বয়সি মানুষের সঠিক খাদ্যগ্রহণের অভ্যাস ও চর্চা না থাকা এবং আর্থসামাজিক নানা বিষয়। শহর-গ্রাম এবং ধনী-দরিদ্র পরিবারভেদে শিশুদের খর্বতা,কৃশতা ও কম ওজনের পার্থক্য লক্ষ করা যায়। অপুষ্টির শিকার হলে দেহের স্বাভাবিক গঠন ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। অপুষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। অপুষ্টির শিকার মানুষের কর্মক্ষমতা লোপ পায়। রক্তশূন্যতাও দেখা দেয়। কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ ‘আয়রন’ বা লৌহের অভাবে ভুগছে। শিশু আর ঋতু চলার সময় নারীর শরীরে লৌহের অভাব অতিরিক্ত হয়ে গেলে অবসাদ, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। লৌহের উৎস মাংস, মাছ, বীজ-জাতীয় খাবার, মটরশুঁটি এবং সবুজ শাকসবজি। ‘থাইরয়েড’ গ্রন্থির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে এবং‘থাইরয়েড’ হরমোনের স্বাভাবিক উৎপাদন সচল রাখতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আয়োডিন। বিশ্বব্যাপী এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই পুষ্টি উপাদানের অভাবে ভুগছে। শরীর ও হাড়ের বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য ‘থাইরয়েড’ হরমোন অত্যন্ত জরুরি। অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি, দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠাও আয়োডিনের অভাবের লক্ষণ। শিশুদের আয়োডিনের অভাবে মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় চিরস্থায়ীভাবে। আয়োডিনের উৎস সামুদ্রিক লতাগুল্ম, মাছ, দুগ্ধজাত খাবার, ডিম ইত্যাদি।

শরীরের হাড় ও দাঁত গঠনে এবং তাদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এ উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়ামের অভাব হলে হৃদযন্ত্র, পেশি এবং স্নায়ু কোনোটাই স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পারবে না। ক্যালসিয়ামের অভাবের লক্ষণ হলো ‘অস্টিওপোরোসিস’, যে রোগে হাড় নরম ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। ক্যালসিয়ামের উৎস হলো কাঁটাওয়ালা মাছ, দুগ্ধজাত খাবার, গাঢ় সবুজ সবজি। হাড় ও দাঁত সুগঠনের জন্য প্রয়োজন ম্যাগনেসিয়াম। টাইপ টু ডায়াবেটিস, বিপাকজনিত সমস্যা, হৃদরোগ ও বাত হতে পারে এই পুষ্টি উপাদানের অভাবে। হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিক তাল, পেশিতে ব্যথা, পা ব্যথা হয়ে যাওয়া, অবসাদ, মাইগ্রেইন ইত্যাদিও ম্যাগনেসিয়ামের অভাবজনিত লক্ষণ। ডিএনএ, আরএনএ এবং প্রোটিনের ‘সিনথেসিস’ প্রক্রিয়ায় এই পুষ্টি ‍উপাদান প্রয়োজন। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ’য়ের দেওয়া তথ্যমতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪২০ মিলিগ্রাম আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতিদিন ৩১০ থেকে ৩২০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন। ম্যাগনেসিয়ামের উৎস হলো শষ্যজাতীয় খাবার, বাদাম, ডার্ক চকলেট, গাঢ় সবুজ শাকসবজি।

পানিতে দ্রবণীয় এই ভিটামিন রক্ত তৈরিতে এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমস্যা হলো আমাদের শরীর ভিটামিন বি টুয়েলভ তৈরি করতে পারে না, তাই তা ভোজ্য উৎস থেকেই তা সংগ্রহ করতে হবে। এই উপাদানের প্রধান উৎস হলো প্রাণিজ খাবার। তাই নিরামিষাশীদের মাঝে এই উপাদানের ঘাটতি প্রায়শই দেখা যায়। ভিটামিন বি টুয়েলভয়ের অভাবে ‘মেগালোব্লাসটিক’ রক্তশূন্যতা হয়, যেই রোগে লোহিত রক্তকণিকাকে আকারে বড় করে দেয়। ভিটামিন বি টুয়েলভয়ের উৎস হলো মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার। এই ভিটামিনের প্রধান উৎস হলো সূর্যালোক, তাই এর অভাব দূর করতে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসা জরুরি। ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবণীয় এবং কাজ করে স্টেরয়েডের মতো। এটি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে বিভিন্ন কোষে পৌঁছে এবং জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি কোষে ভিটামিন ডির গ্রাহক থাকে। হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়া এবং পেশি ও হাড়ের দুর্বলতা বেড়ে যাওয়া এই ভিটামিনের অভাবজনিত একটি অন্যতম লক্ষণ।

শিশুদের ‘রিকেট’ রোগ হওয়ার পেছনেও ভিটামিন ডির অভাবের ভূমিকা রয়েছে। ভিটামিন ডিয়ের উৎস হলো কডলিভার অয়েল, স্যামন মাছ, ডিমের কুসুম। দ্য ল্যানসেটের প্রতিবেদনের বিষয়ে ইউনিসেফ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানদের একটি সতর্কবাণীতে তারা বলেছে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সারা বিশ্বে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের দেশগুলোয় এবং এর সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ভোগ করছে ছোট শিশুরা। নিম্নমানের খাবার, পুষ্টিসেবায় বিঘ্ন এবং মহামারি থেকে সৃষ্ট ভীতির কারণে অধিক সংখ্যক শিশু ও নারী অপুষ্টিতে আক্রান্ত হচ্ছে।  মানুষের বেঁচে থাকার জন্য শারীরিক, মানসিক ও কর্মদক্ষতা উন্নয়নে পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জনগণের পর্যাপ্ত পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই দেশের প্রতিটি নাগরিককে জাতীয় সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে নারী-পুরুষ ও শিশুদের জন্য মানসম্পন্ন পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।

"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।