কবে শেষ হবে এ অপেক্ষার পালা ?

করোনা। যত দিন যাচ্ছে সমস্যা যেন বাড়ছে, এর পাশাপাশি আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই এখন যেন রীতিমতো দোদুল্যমান অবস্থায় পড়েছে। দিনের পর দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে করোনাভাইরাস এবং বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসের মহামারি সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা নানা ধরনের তথ্যাদি এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রায় নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে। এখন এর মধ্যে কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা সেই নিয়ে মহাবিভ্রান্তিতে আছে মানুষ।

আমাদের দেশেও এ রকম নানা ধরনের মতামত প্রকাশের আর যেন শেষ নেই। প্রায় প্রতিদিনই নানাজনের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য এবং গণমাধ্যমগুলোতে নানা ধরনের প্রতিবেদন। বিবিসি জানিয়েছে, গত এক বছরে ফেসবুকে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুল তথ্য প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বার দেখা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আবাজ এক গবেষণায় দেখিয়েছে, করোনাভাইরাস চলাকালীন সময়ে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুল তথ্য প্রচার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। ফেসবুকে থাকা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পেজগুলোর ৪২টিতে ২৮ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে।
বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি থেকে পরিচালিত পেজগুলোর ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এসব গবেষণা তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ কী করবে ? বাস্তব ক্ষেত্রে বড় কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছে এই করোনাকাল।

যদিও শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র প্রচুর মানুষের চলাচল দেখা যাচ্ছে। মনে হবে, সেই আগের মতো স্বাভাবিক দিনগুলো যেন ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সত্যি কি আগের স্বাভাবিক দিনে ফিরে গেছি আমরা ?
আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো আরও অনেকে বলছেন, আমাদের দেশে করোনার প্রকোপ অন্যান্য দেশের তুলনায় কমে গেছে, দেশের মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে।দেশের সর্বত্র সব ধরনের দোকানপাট, অফিস-আদালত খুলে গেছে। যথারীতি শুধু অসুস্থ মানুষ ছাড়া আর সবাই নিজ নিজ কর্মস্থলে কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছেন। বাকি আছে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাও আগামী মাসেই চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে লকডাউন বা করোনা সম্পর্কিত কোনো ছুটিছাটা নেই। সরকারিভাবে সবটাই স্বাভাবিক বলে চালানোর একটা প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জনগণের জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সবাইকে নিয়ম মাফিক স্বাস্থ্যবিধি পালন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের এই নির্দেশ সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে মনিটরিংয়ের তেমন কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। ঢাকার মতো অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোর বিপণিবিতান, ছোটখাটো দোকানপাট এবং রাস্তাঘাটে প্রচুর মানুষের চলাফেরা দেখলে মনে হতে পারে আমাদের দেশ থেকে করোনা নামের অভিশাপ বিদায় হয়েছে। কিন্তু আসলে কি তাই?

কেননা, এখনও প্রতিদিন দেশে করোনার কারণে মারা যাচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ জন কিংবা তারও বেশি, আক্রান্ত হচ্ছে আড়াই হাজারের ওপরে মানুষ। এ থেকে সামগ্রিক করোনা পরিস্থিতিকে অনেকটা স্থিতিশীল বললেও স্বাভাবিক কি বলা যায় ? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরকে খুঁজে নিতে হবে। কারণ দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষ চলাফেরা করছে। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে তাদের বেশিরভাগেরই ক্লান্ত মুখাবয়বে স্পষ্ট বিষাদের আতঙ্কিত ছায়া।

কারণ বিগত চার-পাঁচ মাসে আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ, প্রধানত মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির, তাদের চাকরি হারিয়েছে দেশে এবং বিদেশে। এখন কবে আমাদের দেশসহ অন্যান্য দেশ করোনা মুক্ত হবে এবং আমাদের দেশের মানুষরা আবার তাদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারবে সেটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। নানা রকম ভয়-ভীতি, দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে হঠাৎ পতিত হওয়া এই জীবন অনেকের কাছে বড় কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছে। দিনযাপনের গ্লানি এখন বহু মানুষের কাছে রীতিমতো কষ্টকর হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের খাদ্য প্রতিদিন জোগাড় করা চট্টগ্রামের ডকইয়ার্ডের এক দিনমজুর তার চাকরি চলে যাওয়ার কয়েক দিন পরে চরম হতাশার মধ্যে নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে বিষ খাইয়ে মেরে শেষ পর্যন্ত নিজে আত্মঘাতী হয়ে এই পার্থিব জীবনের জ্বালা জুড়িয়েছে।পাশাপাশি আমাদের দেশ থেকে যারা সেসব দেশে কাজের সুবাদে পাড়ি জমিয়েছিল অনেক আগে থেকেই, তারাও এখন পড়েছে মহাবিপদ এবং দুর্ভোগে। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যেই যারা ফেরত এসেছে কর্মহীন হয়ে তাদের মধ্যে অনেকেই এখন বেকার এবং তারা আবার কবে যেতে পারবে বা চাকরি ফিরে পাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

জানা গেছে, বিশ্বের ২৩টি দেশ থেকে চাকরিচ্যুত হয়ে বিগত প্রায় পাঁচ মাসে দেশে ফিরে এসেছে কমপক্ষে ৮০ হাজার প্রবাসী কর্মজীবী। তবে এ ধরনের অকস্মাৎ  সমস্যা শুধু বিদেশেই নয়, আমাদের দেশের বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

সেই মার্চের শেষে শুরু হওয়া করোনা সংক্রমণ যত দিন গেছে ততই তার নিষ্ঠুর ছোবলে কেড়ে নিয়েছে আমাদের বহু জীবন ও জীবিকা। পাশাপাশি করোনার তীব্র সংক্রমণের ভয় মানুষকে তার প্রিয়জনের কাছ থেকেও দুঃসময়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, এমনকি তার মৃত্যুর সময়ও তাকে কাছে থাকতে দেয়নি। এই নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার কোনো তুলনা আছে কি ? তবু এতসবের পরেও আমরা নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনও বেঁচে আছি। আমরাও পৃথিবীর অন্যান্য  দেশের মানুষের মতো রীতিমতো কঠিন সময় অতিক্রম করছি । অনেকের  দিনের পর দিন কাটছে মহা অনিশ্চয়তার মধ্যে । যার মধ্যে মিশে আছে আতঙ্কের ছায়া। এই অবস্থার অবসান কবে হবে আমরা কেউ জানি না। কবে শেষ হবে এ অপেক্ষার পালা ?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.