ব্রেকিং নিউজ :

নিভৃতে নির্যাতিত পুরুষ !

সেদিন ২০ অক্টোবর সকাল বেলা। ফেসবুকে যেতে না যেতেই নজরে পড়লো অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে প্রকাশিত টাঙ্গাইলের গোপালপুরে একজন কলেজ ছাত্রীকে গণধর্ষণের সংবাদ। ধর্ষিতা টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরদিন লোকাল পত্রিকাসহ জাতীয় পত্রিকাতে ঘটনাটি ফলাও করে প্রকাশ পায়। কয়েকটি টিভি চ্যানেলও প্রতিবেদনটি গুরুত্বের সাথে প্রচার করে। প্রচার করাটাও স্বাভাবিক। সময়টা যাচ্ছে ধর্ষণের। বেশ কিছু আলোচিত ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল সারাদেশ। সম্প্রতি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডও বিধান করা হয়েছে। এই মুহুর্তে ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়াটাই স্বাভাবিক। ১৯ অক্টোবর সারারাত পালাক্রমে ধর্ষণের পর ফেলে রাখে ধর্ষিতাকে। পরদিন ২০ অক্টোবর ধর্ষিতা কলেজ ছাত্রীর মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে গোপালপুর থানায় একটি ধর্ষণ মামলা করেন। পুলিশ অভিযোগের সত্যতা নিয়ে তদন্ত করছেন। সংবাদকর্মীরাও অনুসন্ধান করছেন। মেডিকেল রিপোর্ট ছাড়া মামলা করা গেলেও প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে ডাক্তারি পরীক্ষার ফলাফল জানা প্রয়োজন।

এরপর উল্টো সুর। ২৩ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে গণধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা বানোয়াট মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের কাগুজিআটা মোড়ে নারীসহ সহস্রাধিক গ্রামবাসি মানববন্ধন করে। মানববন্ধনে আশ্চর্য্য সব তথ্য বেরিয়ে আসে বক্ত্যব্যে। ২০১৩ সালে কাগুজিআটা গ্রামের মৃত আনছের আলীর কন্যা বিথী খাতুনের সাথে একই গ্রামের মৃত আঃ সালামের পুত্র শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। বয়স কম থাকায় তখন রেজিস্টেশন (কাবিন) করা হয়নি। দাম্পত্য কলহের জের ধরে গত মার্চ মাসে মৌখিক তালাকে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অতঃপর শফিকুলের সাথে ঘাটাইল উপজেলার রৌহা গ্রামের এক যুবতীর বিয়ে ঠিক হয়। গত বুধবার এ বিয়ে হবার কথা ছিল। কিন্তু বিয়ের দুদিন আগে গত সোমবার বিকেলে বিথী প্রাক্তন স্বামী শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে উঠেন। এসময় বাড়ির লোকজন তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বিথীকে ঘরে উঠতে বাধা দেন। গ্রামবাসীর সহায়তায় সন্ধ্যা সাতটার পর তাকে একটি ইজিবাইকে তুলে বাবার বাড়ি নিয়ে মায়ের হেফাজতে দেয়া হয়। গ্রামের দুই শতাধিক মানুষ রাত দশটা পর্যন্ত বিথীদের বাড়িতে তালাক ও পুনঃবিবাহ নিয়ে সালিশ করেন। সালিশের একটি ভিডিও করা হয়। রাত হয়ে যাওয়ায় সালিশ অমিমাংশিত রাখা হয়। পরদিন মিমাংশা হওয়ার কথা। যদিও মামলার বাদী তাছলিমা বেগম এসব তথ্য অস্বীকার করেন। আলোচনার বিষয় কোন তথ্যটি সঠিক? ওইদিন যদি সত্যিই কলেজছাত্রী ধর্ষণ হয়ে থাকে তাহলে নেহায়েত অন্যায়। ধর্ষকের প্রচলতি আইনে বিচার জরুরী। আর যদি ওই পুরুষকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয় তাহলে অবশ্যই ওই পুরুষ নির্যাতিত। তবে শারিরীক পরীক্ষার পর মেয়েটির দেহে ধর্ষণের আলামত না পাওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। পরবর্তীতে আরও নিশ্চিত হতে ধর্ষিতার পড়নের কাপড় পরীক্ষার জন্য ঢাকার ফরেন্সি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
পুরুষ শাসিত সমাজে সবসময়ই আলোচনায় আসে নারী নির্যাতনের খবর। তবে কি শুধুই নারী তাদের স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছেন? বিভিন্ন মামলার পর্যালোচনা আর বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে, সমাজের অনেক পুরুষ তার নিজ ঘরে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছেন।

লোকলজ্জা আর পরিবারের কথা ভেবে দিনের পর দিন নির্যাতন-নিপীড়ন আর হুমকি-ধমকি নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। পুরুষ অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, সমাজে অনেক পুরুষই স্ত্রীর যন্ত্রণায় নীরবে কাঁদেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। বিরোধীদলীয় নেত্রী একজন নারী। দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধান একজন নারী। অর্থাৎ নারীরা পিছিয়ে আছে একথাটা এখন আর সেভাবে বলা যায় না। বরং নারী সমাজ পরাধীনতার খোলস ভেঙে, নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে গেছে অনেকটা পথ। এটা আমাদের গর্ব । তারপরও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারীরা স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন,ধর্ষণ, অত্যচার, যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে অহরহ। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বদলে যাওয়া সমাজেরই নতুন রূপ হচ্ছে পুরুষ নির্যাতন। নির্যাতিত পুরুষের কেউ শারীরিক, কেউ মানসিক, কেউ দৈহিক-আর্থিক, কেউ সামাজিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। তুলনামূলক কম হলেও নির্যাতিত পুরুষের সংখ্যা এদেশে নেহায়েত কম নয়। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান থাকলেও নেই পুরুষ নির্যাতনের সঠিক তথ্য। ফলে নারী নির্যাতনের খবর ফলাও করে প্রকাশ করা হলেও অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনাগুলো। তবে সাম্প্রতিককালে পুরুষ নির্যাতনকে কেন্দ্র করে বেশকিছু সংগঠন গড়ে উঠছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার বন্ধন আগের চেয়ে অনেকটা হালকা। এছাড়া সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিক অবক্ষয়, লোভ-লালসা, উচ্চবিলাসিতা, পরকীয়া, মাদকাসক্তি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিশ্বায়নের ক্ষতিকর প্রভাব, সাংস্কৃতিক প্রবাহসহ নানা কারণেই এমনটা ঘটছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্ত্রী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না পুরুষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা, চক্ষুলজ্জা, জেল-পুলিশ আর উল্টো মামলার ভয়ে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর নির্যাতন নীরবে সহ্য করে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। পুরুষ চাইলেও নির্যাতনের কথা বলতে পারছে না। অন্যদিকে একজন নারী আইনের অপব্যবহার করে ইচ্ছে করলেই ঘটনা সাজিয়ে পুরুষের বিরুদ্ধে থানা বা আদালতে সহজেই নারী নির্যাতনের মামলা বা যৌতুক মামলা দিতে পারছেন।
আমাদের সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ নং অনুচ্ছেদে নারীর অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে নারীর সুরক্ষার জন্য দেশে একাধিক আইন রয়েছে। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০, এসিড নিরোধ আইন-২০০২, পারিবারিক সহিংসতা ও দমন আইন-২০১০, যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ উলে¬খযোগ্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য নারীর সুরক্ষার জন্য আইনগুলো তৈরি হলেও বর্তমানে এ আইনগুলোকে কিছু নারী পুরুষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সামান্য কিছুতেই স্বার্থান্বেষী নারী স্বামীদের নাজেহাল করতে এসব আইনের অপপ্রয়োগ করছেন। অন্যদিকে দেশে ‘পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ’ আইন এখনও সৃষ্টি হয়নি। নেই পুরুষ নির্যাতনবিরোধী ট্রাইব্যুনালও। সংশি¬ষ্টরা বলছেন, এসব কারণে আইনি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভুক্তভোগী পুরুষ।

পুরুষ নির্যাতনের ক্ষেত্রে যৌতুক আইনের অপপ্রয়োগ সবচেয়ে বেশি। আইনজীবীরা বলছেন, যৌতুক আইনের অধিকাংশই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। পারিবারিক যে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত ঝগড়া হলে সেটি থানা পুলিশে গড়ালে পরিণত হয় যৌতুক মামলায়। কোনো কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হলে অথবা স্ত্রীকে তালাক দিলে অথবা উচ্ছৃঙ্খল স্ত্রীকে শাসন করলে অথবা স্ত্রীর পরকীয়ায় বাধা দিলে সেই স্ত্রী ও তার পরিবারের লোকজন থানায় বা আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০-এর ১১(খ) অথবা যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০-এর ৪ ধারায় একটি মামলা করেন। একজন পুরুষের জীবন অতিষ্ট করার জন্য এ একটি মামলাই যথেষ্ট।

আমাদের দেশে সাধারণত বিয়ের সময় পাত্রী পক্ষ জোরপূর্বক পাত্রকে সাধ্যের অতিরিক্ত টাকা কাবিন নামায় ধার্য করতে বাধ্য করেন। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কাবিন হয় বাকিতে। অর্থাৎ দেখা গেল কনে পক্ষের দাবি অনুযায়ী, কাবিন করা হল ৮ লাখ। এর মধ্যে গহনা ও অন্যান্য জিনিস বাবদ ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পরিশোধ দেখিয়ে পুরোটাই বাকি রাখা হয়। যদিও ইসলামী বিধান হল বিয়ের সময়ই দেনমোহর পুরোটা পরিশোধ করা। তবে এই কথা শোনে কে? বাকি থাকা বা বাড়তি এই দেনমোহরই পরে কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন কেস স্টাডি থেকে জানা গেছে, অতিরিক্ত দেনমোহরের কারণে স্বামী তার স্ত্রী ও তার পরিবারের লোকজনের অনৈতিক দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারার আয়াত নং-২২৯ অনুসারে যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে মুক্ত হতে চান তবে তাকে কোনো কিছুর বিনিময়ে হতে হবে। যা তার মোহরানার অতিরিক্ত হবে না। তাই ইসলাম অনুসারে দেখা যায়, স্ত্রী কর্তৃক স্বামী ক্ষতিগ্রস্থ হলে স্ত্রী স্বামীকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের দেশীয় আইন অনুযায়ী স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক প্রদান করা হলেও স্বামীকে দেনমোহর প্রদান করতে হয়; যা ইসলামের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয় আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। কবির সাথে একমত হয়ে বলতে হয়, যেহেতু পৃথিবীতে কল্যাণের অর্ধেক নারী অর্ধেক নর সেক্ষেত্রে নারী-পরুষের সমধিকার থাকা প্রয়োজন।
নারীরা সমধিকার নিয়ে এখনও আন্দোলন করে যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে অনেক আগেই নারীরা সমধিকার পার করে অধিক অধিকার ভোগ করছেন। আসা যাক, ইউনিয়ন বা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। নারী,পুরুষ ভোটে অংশ নেওয়ার সুযোগটা সমধিকার। অথচ একটি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থাকাটা হতে পারে অধিক অধিকার। চাকরির ক্ষেত্রেও তেমন। যেকোন চাকরিতে আবেদন করার অধিকার সমধিকার। অথচ নারীদের অগ্রাধিকার বা আলাদা কোটা থাকাটা অবশ্যই অধিক অধিকার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে নারীদের নির্বাচন করার অধিকার হল সমধিকার। ৫০টি অতিরিক্ত সংরক্ষিত আসন থাকাটা অধিক অধিকার। এছাড়া গাড়িতে মহিলা সংরক্ষিত আসন অথবা লাইনে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ বিল না দেওয়াটা নারীর প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবেই ধরে নিতে পারি। যদিও কথাগুলো পুরুষ নির্যাতনের সাথে ততোটা মিল নেই। তবে এতে অন্তত নারী অধিকার প্রাপ্তির নিশ্চিতটা প্রমান পায়।

শুরুতে যাই। ধর্ষণ। দেশে প্রতিনিয়ত তরুন-তরুণীদের সম্পর্ক হচ্ছে। কখনও কখন স্চ্ছোয় আবেগে শারীরিক সম্পর্ক হয়ে যাচ্ছে। যদিও ধর্মীয়, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কোন যুক্তিতেই এমন কার্য গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তবে যতোদিন সম্পর্ক চলমান ততোদিন শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কোন পক্ষই মুখ খোলেন না। সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেই পুরুষের বিরুদ্ধে দেওয়া হয় ধর্ষণ মামলা। এছাড়া হত্যায় আর চিকিৎসায় যেমন নারী নির্যাতন প্রকাশ পায় তেমনি আত্মহত্মায় পুরুষের ডিপ্রেশন বোঝা যায়। তবে স্বাভাবিকভাবে পুরুষ নির্যাতন প্রকাশ পায় না। নিভৃতে চলে এ নির্যাতন।

আসলে নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। এক পক্ষকে বাদ দিয়ে আরেক পক্ষের পূর্ণতা পায় না। সেক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষায় নারী অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নারী অধিকার নিশ্চিত করতে পুরুষ অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে কিনা সেটা ভুলে গেলেও পুরুষের প্রতি অবিচার করা হবে।

রেজাউল করিম

লেখকঃ শিক্ষক ও সংবাদকর্মী

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.