জাতি মেধাশূণ্য হচ্ছেনাতো ?

রেজাউল করিম: কোভিড-১৯। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে চীনের উহানে জন্ম নেওয়া একটি আতঙ্ক। এরপর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। যার থাবায় পুরো বিশ্ব এখনও থমকে আছে। আটকে আছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েক দফায় বেড়ে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত পুনরায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ২০২০ শিক্ষাবর্ষ প্রায় শেষ। সারাবছর শিক্ষার্থী পড়ার টেবিলে ততোটা সময় না দিলেও বছর শেষে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ে অংকটা মেলানোর চেষ্টা করছে কেমন কাটলো এবারের পড়াশোনা। লাভ ক্ষতির হিসেবটা সহজে মিলছে না। অনলাইন ক্লাস । আসলে অনলাইন ক্লাসে কি পেলো শিক্ষার্থীরা ? কজনের অনলাইন ব্যবহার করার মতো ডিভাইস ছিল? সামর্থই বা কজনের ছিল? এরপর এলো অটোপাস। অটোপাসে কি অটো মেধা আসবে? দুর্বলরা খুশি হলেও সবলরা কিন্তু হতাশ। পিইসি, জেএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় অটোপাস আরও নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। অনার্স চতুর্থ বছরের কি হবে ? মাস্টার্সও ঝুলে আছে। ওদেরই বা কি হবে ? এসএসসির নির্বচনী পরীক্ষা বা ফরম পূরণের সময় যাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। নির্ধারিত সময়ে কি এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে ? স্কুল খুলে দিলেই কি সিলেবাস শেষ না করে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব? কখনও না। কারণ শিক্ষার্থীরা বিষয়টি এতো সহজে মানবে না। পরীক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ করার সময় দিতে হবে। যাদের লেখাপড়া শেষ করে চাকরীর বয়সও শেষ পর্যায়ে তাদের কি চাকরীর বয়সসীমা বাড়ানো হবে? পরীক্ষা না নিয়ে অটো পাস, প্রয়োজনে চাকরীর বয়স বাড়ানো, এটাই বা কতোদিন সম্ভব ? তবে এইচএসসির পর এসএসসির শিক্ষার্থীরা যেমন অটো পাসের ভাবনায় বিভোর। তদ্রুপ এই ধারাবাহিকতায় অন্যান্য ক্লাসের একই ভাবনা ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সম্প্রতি জাতিসঙ্গও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার আহবান জানিয়েছেন। এভাবেই আর কতোদিন চলবে ? করোনাকে ভয় না করে শিক্ষার্থীদেরকে করোনা জয় করতে শিখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে করোনার সাথে মিলিয়ে চলতে শেখাতে হবে।

৭২ এ অটোপাস ছিল। কারন ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় পড়ালেখার সুযোগ ছিল না। তবে পাবলিক পরীক্ষার মেধা মূল্যায়ন হয় স্বল্প সিলেবাসে। তার ধারাবাহিকতায় সৃজনশীলতা পরিহার করে গাইড বই, নোট বই ব্যবহার করে জন্ম নেয় অভিশপ্ত ‘নকল’। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পাবলিক পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী বছর ৭২ সালে। একই বছর দুবার সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হয়। তখন শিক্ষাবিদরা বুঝে উঠতে পারেননি একদিন সেশনজট বাঁধবেই। দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ে ১৯৭৫ ও ’৭৬ সালে এইচএসসি পাস শিক্ষার্থীদের একই সেশনে ভর্তি হতে হয়েছিল। পড়ালেখায় পরীক্ষার বিকল্প নেই। সেই পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। দেওয়া হচ্ছে অটোপাস। এতে জাতির আগামী দিনগুলো অনিশ্চিৎ হয়ে পড়ছে। মেধাশূণ্য হয়ে পড়ছে জাতি। পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যম খুঁজতে হবে। পিইসি, জেএসসি , এইচএসসি পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রেও নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেওয়া যেত। অল্প শিক্ষাথীকে পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিলে স্বাস্থবিধি মেনে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব ছিল। স্বল্পপরিসরে দুটি ক্লাস একসাথে দুঘণ্টাব্যাপী শিফট করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রমও চালানো সম্ভব ছিল। ঢাকা বিশ্বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিকের ২০ শতাংশ এবং লিখিত ৫০ শতাংশ ও বহুনির্বাচনী পরীক্ষার ৩০ শতাংশের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানা গেছে। তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লিখিত পরীক্ষার সম্মুখীন শিক্ষার্থীদের হতেই হচ্ছে। সারাদেশে করোনার সময় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকমন্ডলী ছুটিতে ছিলেন এমন কি শ্রেণিকক্ষগুলো ফাঁকা ছিল। সেক্ষেত্রে উপকেন্দ্র বাড়িয়ে দেশব্যাপী পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া মোটেই কঠিন ছিল না।
বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশকে টিকে থাকার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে অটোপাস না দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে করোনার সাথে মানিয়ে চলা শেখাতে হবে । এছাড়া সরকার যদি অনলাইকে এতোটা গুরুত্ব দিয়ে থাকে সেক্ষেত্রে বারবার পাঠ্য বই প্রিন্ট না করে ২০২১ শিষাবর্ষে সম্পূর্ণ ই-বুক তৈরি করা যেতে পারে। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের তৃণমুলে পৌঁছানোর জন্য ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের স্বল্পমূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। সেক্ষেত্রে অটোপাসের পরিবর্তে অনলাইনে পরীক্ষা নিয়ে তাদের মুল্যায়ন করা যেতে পারে। পরীক্ষাহীন মেধাকে মূল্যায়িত করে এইচএসসির সার্টিফিকেট দেওয়া হবে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। অনেক শিক্ষার্থী জেএসসির পরীক্ষাকে গুরুত্বহীন মনে করে জিপিএ-৫ পায়নি। অনেকেই এসএসসি পরীক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের অনেক শিক্ষার্থীই মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেবে। তা ছাড়া যারা এসএসসিতে জিপিএ-৫ পায়নি, তারা এবার মরিয়া হয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে উচ্চশিক্ষায় ভালো করার জন্য অর্থাৎ এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য। জিপিএ-৫ প্রাপ্তিদের সঠিক মুল্যায়ন করবে কোন পদ্ধতিতে?

এইচএসসি পরীক্ষা আমাদের দেশের শিক্ষা কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলের উপরই মূলত উচ্চ শিক্ষা নিজের অবস্থান নির্ভর করে। ফলে এইচএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মূল্যায়ন অন্য যেকোন পাবলিক পরীক্ষার চেয়ে জরুরি। যে দুটি পরীক্ষার ( জেএসসি এবং এসএসসি) ফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল তৈরির কথা বলা হচ্ছে তার সিলেবাসের সাথে এইচএসসির সিলেবাসের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বয়সের পরিপক্কতার একটি পার্থক্য রয়েছে। আবার অনেকে এক পরীক্ষায় কাঙ্খিত ফল না করলেও পরবর্তীতে ভালো ফল করার সম্ভাবনা থাকে। ফলে এভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে বৈষম্য তৈরি হবে। সর্বোপরি শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখলো তা সঠিক পদ্ধতিতে মূল্যায়িত না হওয়ায় পড়ালেখার প্রতি আরও নিরুৎসাহিত হবে। শিক্ষা হয়ে পড়বে আরও সার্টিফিকেট নির্ভর। উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এটা হবে অন্তরায়। সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষা বাদ দিয়ে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করাটা কতোটুকু যৌক্তিক হবে সেটা ভাববার বিষয়। পেছনের সময়টা লক্ষ করলে স্পষ্ট হওয়া যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনও করোনা নিয়ে অস্পষ্ট রয়েছে। না পেরেছে রোগটি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা আনতে, না পেরেছে রোগটির কোন ঔষধ আবিষ্কার করতে। ভ্যাকসিন আসছে বলেও অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। অতএব অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, করোনা যুদ্ধ একটি লম্ভা প্রক্রিয়া। হতে পারে স্থায়ী যুদ্ধ। যেখানে ভয় না পেয়ে মানিয়ে চলাটাই যুক্তিযুক্ত হবে। পিইসি পরীক্ষা হচ্ছে না। এ ঘোষণার পর পিইসি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়ে এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কোন নির্দেশনা দেননি সরকার। পরীক্ষার্থীরা কিভাবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হবে এ বিষয়েও কোন তথ্য নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। জেএসসি বা সমমানের পরীক্ষার্থীদের কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে তারও কোন নির্দেশনা নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে। অটোপাসের সংবাদে এই দুটি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীরা টেবিল ছেড়েছে। কিন্তু তারা এখনও জানে না তাদের মূল্যায়ন কিভাবে হবে ? তদ্রুপ এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা অটোপাস নিশ্চিত জানলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি সম্পর্কে এখন ওরা অনিশ্চিত।

ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে তিনটি করে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে নবমম শ্রেণির প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অ্যাসাইনমেন্টে অংশগ্রহণ করতে হবে। অ্যাসাইনমেন্টের আওতায় ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন, সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্ন, সৃজনশীল প্রশ্ন, প্রতিবেদন প্রণয়ন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্তের কথা শোনা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সাদা কাগজে নিজের হাতে লেখা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। এখানে প্রশ্ন উঠছে, বাড়িতে তৈরি করা অ্যাসাইনমেন্টে শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশে কতোটা সহায়ক হবে। মূল্যায়নই বা কতোটা সঠিক হবে?
পৃথিবী একদিন স্বাভাবিক হবে। তবে সেটা কতো দুর তার নিশ্চয়তা নেই। তাহলে কতোদিন অপেক্ষা। সেক্ষেত্রে করোনার সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মানিয়ে চলতে না শিখিয়ে অটোপাসের সংবাদের শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়েছে। এতে পড়ালেখার প্রতি শিক্ষার্থী নিরুৎসাহিত হচ্ছে নাতো? এভাবে অটোপাসে সনদপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে একদিকে দেশে বেকার সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে জাতি মেধাশূণ্য হচ্ছে। মেধা গঠনে চাই নিয়মিত স্কুলের ক্লাস, যা আটমাস যাবত বন্ধ রয়েছে। চাই পড়ার টেবিলে চর্চা। অটোপাসের সংবাদে শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলের প্রতি অনাগ্রহ। অতঃপর চাই পরীক্ষায় অংশগ্রহন। সবগুলো অপশন যখন অকার্যকর তখন জাতি মেধাশূণ্য হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে জানাটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরী।

লেখক: সংবাদকর্মী

Rezaulpress.bd@gmail.com

টাঙ্গাইল জেলার খবর সবার আগে জানতে ভিজিট করুন www.newstangail.com। ফেসবুকে দ্রুত আপডেট মিস করতে না চাইলে এখনই News Tangail ফ্যান পেইজে (লিংক) Like দিন এবং Follow বাটনে ক্লিক করে Favourite করুন। এর ফলে আপনার স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে সয়ংক্রিয়ভাবে নিউজ আপডেট পৌঁছে যাবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.