সমবায়ের জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়, আর সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়ী মনোভাব

আজ জাতীয় সমবায় দিবস। প্রতিবছর নভেম্বর মাসের প্রথম শনিবার নানা আয়োজনে এ দিনটি পালিত হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমবায়ের ভূমিকাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সমবায়ের জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়, আর সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়ী মনোভাব। তাই সঞ্চয়ী প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে এলে অর্থনৈতিক ভিত্তি যে মজবুত হবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মৌমাছির কথাই ধরা যাক, সৃষ্টিকুলের সবচেয়ে পরিশ্রমী এই ক্ষুদ্র প্রাণীটি সারাদিন ফুলে ফুলে বিচরণ করে বিন্দু বিন্দু মধু সংগ্রহ করে। আবার অসময়ে সে মধু পান করে তারা জীবন ধারণ করে। সমবায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

আমরা জানি, সমবায়কে কাজে লাগিয়ে ভারত অবিস্মরণীয় সফলতা অর্জন করেছে। জাপান, স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের রাষ্ট্রে সমবায়কে অর্থনীতির তৃতীয় খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নরওয়ে, সুইডেনের মতো দেশেও সমবায়ের মাধ্যমে কল্যাণমুখী অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। কাজেই সমবায়কে কাজে লাগিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন এবং বিতরণ ক্ষেত্রে আশাতীত ফল পাওয়া এবং এর মাধ্যমে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। কর্মসংস্থান ও বাজারব্যবস্থা উন্নয়নে সমবায় এক বিশাল শক্তি। সারা পৃথিবীর যাবতীয় কৃষিপণ্যের অর্ধেক সমবায়ের মাধ্যমে বাজারজাত হয়। ভারতের দুগ্ধ সমবায় ১১ মিলিয়ন সদস্য নেটওয়ার্ক ২২টি রাজ্যে সমবায় ফেডারেশনের মাধ্যমে ২৮৫টি জেলার এক লাখের অধিক গ্রামের পণ্য বাজারজাত করছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী সমবায়ের মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রায় একশ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সমবায়ের সফল উদাহরণ বাংলাদেশেও আছে। বাংলাদেশি মিল্কভিটা ৩ লাখের অধিক সমবায়ী দুগ্ধ উৎপাদনকারীর আয় ১০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার তরুণ বন্ধুদের উদ্যোগে ৩৫০ টাকার সমবায় সমিতি করে ৩৫ বছরে বাংলাদেশে কয়েকশ কোটি টাকার সফল সমবায়ী প্রতিষ্ঠান কিংশুকের নাম সবারই জানা আছে।

আমরা দেখতে পাই, সমাজে শিক্ষার হার বাড়লেও সমবায়ী শিক্ষা বাড়েনি। তাই সমবায় সম্পর্কে অনেকের ধারণাই স্পষ্ট নয়। সমবায় সংগঠনে সব সদস্যের সমান অধিকার। এখানে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষের পার্থক্য নেই। সমবায়ের সদস্যরা পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করার লক্ষ্যে সমিতি গঠন করে। সংগঠনের সব সদস্যের একসঙ্গে সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। কেননা সদস্যরা একে অপরের মঙ্গলের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময় করে। সহযোগিতা ভোগী ও সহযোগিতা প্রদানকারী উভয়ই সংগঠনের অভিন্ন অংশ যার ফলে তাদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত থাকে না। সবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি ও শক্তি একত্রিত করে একে অপরের সহযোগিতার মাধ্যমে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সর্বোপরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। কাজেই সমবায়ী কার্যক্রমকে নীতিমালায় পরিচালনা করা গেলে সমবায়ে সমৃদ্ধি সম্ভব।

আমরা জানি, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সমবায়কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন প্রজাদরদি জমিদার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ তার নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়েছিলেন সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘সমবায়নীতি-১’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমাদের টাকার অভাব আছে এ কথা বলিলে সবটা বলা হয় না। আসল কথা, আমাদের ভরসার অভাব।
তাই আমরা যখন পেটের জ্বালায় মরি তখন কপালের দোষ দিই। আমাদের নিজের হাতে যে কোনো উপায় আছে এ কথা ভাবতেও পারি না। যে দেশে গরিব ধনী হইবার ভরসা রাখে সে দেশে সেই ভরসাই একটা মস্ত ধন।’ সমবায়ের মূলমন্ত্রও তাই। সমাজের সাধারণ, দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক প্রয়োজনে সমবায়কে নতুন রূপ দিয়েছেন আরেক বাঙালি ড. আখতার হামিদ খান। ১৯৫৯ সালে তিনি কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) প্রতিষ্ঠা করেন। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ের এই মডেলটি তাকে কিংবদন্তিতে পরিণত করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। তিনি সৃষ্টি করেছেন এমন একটি মডেল, যে ধারণায় সমাজের মানুষ নিজেরা নিজেদের সঞ্চয়কে পুঁজিতে পরিণত করে নিজেদের প্রয়োজনে বিনিয়োগ করতে পারে।

সমবায় বাংলাদেশে কোনো নতুন ধারণা নয়। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে সমবায়ের শতবর্ষ অতিক্রম হয়েছে। দেশে জাতীয়, কেন্দ্রীয় ও প্রাথমিক সমিতির সংখ্যা কমবেশি দুই লাখ। তারপরও তুলনামূলকভাবে সমবায়ের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। সমবায়ের মাধ্যমে বহু দেশ-জাতি তাদের ভাগ্যের চাকা, বহু মানুষ-গোষ্ঠী নিজের আর্থিক অবস্থার বিরাট উন্নত করতে পেরেছে। সমবায় সমিতির মাধ্যমে সুসংগঠিত উপায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও আমানতের সমন্বয়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয়ের সমন্বয় করে বহুমুখী কর্মক্ষেত্র তথা রোজগারী ক্ষেত্র সৃষ্টি করে প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক স্বাবলম্বনের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এর ফলে পরিবারের উন্নয়ন ঘটবে।
পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকল্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ফলে গ্রামের মানুষের শহরমুখী প্রবণতা কমবে। স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। মডেল গ্রাম হবে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মডেল প্রতিষ্ঠান হবে। সমাজে অপরাধ প্রবণতা, প্রতারণা, কলহ-বিভেদ কমে আসবে। সামাজিক পুঁজি বা সামাজিক শক্তি সুদৃঢ় হবে। এই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন ঘটবে গ্রামে, শহরে, সমাজে ও রাষ্ট্রে। যেহেতু সমবায় বহুমুখী কার্যক্রম সেহেতু এর সুফলও আসবে বহুমাত্রিক। একতা, জাগরণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন, বিতরণ এই প্রক্রিয়ায় দ্রুত আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বেকারত্ব নিরসন সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে।

 

"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.