ব্রেকিং নিউজ :

মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রের জোগানদাতা  বীরমুক্তিযোদ্ধা “পরশুরাম

কালের অতল গহীনে হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধে “কাদেরিয়া বাহিনী ও আফসার বাহিনীর” বিপুল পরিমান অস্ত্রের জোগান দাতা প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা “পরশুরাম মেম্বার”। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধা, গবেষক ও সাংবাদিক  শাহজান মিয়ার গবেষণায় উঠে এসেছে, কালের অতল গহীনে হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের কান্ডারী ”কাদেরিয়া বাহিনী ও আফসার বাহিনীর” বিপুল পরিমান অস্ত্রের জোগান দাতা প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা পরশুরাম মেম্বারের নাম।

“মুক্তিযুদ্ধে আফসার বাহিনী” গ্রন্থের সম্পাদক ও গবেষক মুক্তিযুদ্ধা  শাহাজান মিয়া বলেন, ভালুকা উপজেলার ডাকাতিয়া ইউনিয়নের আংগার গাড়া গ্রামের ফরেস্ট অফিসের এক মাইল উত্তরে পরশুরাম মেম্বারের বাড়ি। পাকিস্তান আমলের তিন মেয়াদের  বিডি মেম্বার  ছিলেন পরশুরাম মেম্বার। ২৭ শে মার্চ রাতে পলশুরাম মেম্বার অনেক লোকের শব্দ শুনতে পায়। ঘর থেকে বাহিরে এসে দেখে পুলিশ ই.পি.আর এবং তাদের সাথে নানা ধরণের অস্ত্র। তারা বলে আপনাদের ভয়ের কোন কারন নেই। আপনাদের ঘরে চিড়া-মুড়ি ও শুকনা থাকলে, খাবার দেন । পরশুরাম মেম্বার শুকনা খাবার চিড়া-মুড়ি দিল।  মুড়ি চিড়া  খাইয়া  বলল, আমাদের কাছে যে অস্ত্র রাইফেল, রকেট লাঞ্চার, হাত বোমা গুলি দেখছেন তা আপনার বাড়ির চারপাশে গর্ত করে রেখে যাব। দেশের জন্য যারা মুক্তিযুদ্ধ করবে তাদের কে এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিবেন।

পরশুরাম মেম্বার তার নিজ দায়িত্বে বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ তার বাড়ির চারপাশে গর্ত করে মজুত করে রাখেন। পরবর্তীতে আফসার বাহিনী ও কাদিরীয়া বাহিনীকে অস্ত্র, রাইফেল, রকেট লাঞ্চার, হাত বোমা গুলি গুলি দিয়েছেন।

 স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও পরশুরাম মেম্বারের মত মহান মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের কেউ খোজ রাখেনি। উনি যে বিপুল পরিমান অস্ত্রের যোগান তৎকালিন আফসার বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনীকে দিয়েছেন। তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অনেক সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করেন। অথচঃ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় সেই মহান ব্যত্তির নাম নেই। কেউ সেই পরিবারের খোজ-খবর রাখেনি। আজ স্বাধীনতার সূবর্ণ  জয়ন্তীতে সেই মহান ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম “স্বাধীনতা ৭১” বইয়ে “ই. পি. আর-দের সন্ধানে” শিরোনামে লেখেন যে, ই.পি.আর-দের অস্ত্রের সন্ধানে যখন হৈন্য হয়ে সখিপুর থেকে ভালুকা, মল্লিক বাড়ী, ডাকাতিয়া দিয়ে খুজাখুজি করে কান্ত হয়ে পড়ি। তখন আব্দুল মালেক ই.পি. আর-দের রেখে যাওয়া অস্ত্রের সন্ধান নিয়ে আসেন। ই.পি.আর-দের অস্ত্রের সন্ধান পেয়ে আমার ভিতর তখন আনন্দের বান ডেকেছে। আংগার গাড়া ফরেস্ট অফিসের এক মাইল উত্তরে পরশুরাম মেম্বারের বাড়ি। পরশুরাম মেম্বারের বাড়ীতে ই.পি. আর-রা তাদের অস্ত্র মাটিতে পুতে রেখে গেছে। ই.পি.আর-দের সেই অস্ত্রের কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে মনটা আনন্দে ভরে গেল। অস্ত্র তো নয় যেন গুপ্তধনের সন্ধান। এবার অস্ত্রগুলো পেতে আর বাধা নেই। জায়গা চিহ্নিত করার লোকেরও প্রয়োজন নেই। সেই সময় পরশুরাম মেম্বারকে প্রায় সবাই চিনত। আর.ও. সাহেব, শওকত মোমেন শাহজান ও মনিরকে অস্ত্র আনার দায়িত্ব দেওয়া হল। পরশুরাম মেম্বারের কাছে ই.পি.আর-দের রক্ষিত অস্ত্রগুলো টাঙ্গাইলের মুক্তিযু্দ্ধের ইতিহাসে কত বড় সাফল্য, কত বড় অবদান, তা বলে শেষ করা যাবে না।

পরশুরাম মেম্বারের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে দুটি রৃটিশ রকেট লাঞ্চার, তিনটি দুই ইঞ্চি মর্টার, তিনশ এর উপর হাত বোমা, চল্লিশ হাজার নানা ধরনের গুলি, কুড়িটি স্টেনগান, একশ চল্লিশটি রাইফেল, তিনটি বেরি লাইট এবং বারেটি বৃটিশ এল.এম.জি’র গুলিভর্তি ম্যাগাজিন বক্স। ই.পি.আর-দের  কাছে আটটি এল.এম.জি. আছে বলেই খবর পাওয়া গিয়েছিল। এল.এম.জি. যে তাদের কাছে বেশ কয়েটি ছিল, তা বারোটি এল,এম.জি. ম্যাগাজিন বক্স থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ স্বাভাবিক অবস্থায় একটি এল.এম.জি’র জন্য তিনটি ম্যাগাজিন বক্স থাকে। পরে সেই অস্ত্রগুলো গরুর গাড়িতে করে সখিপুরের ধূমখালীতে মুক্তিযুদ্ধা সালাম ফকিরের বাড়ি ও তার আশে পাশে গর্ত করে রাখা হয়।

( তথ্যসূত্যঃ স্বাধীনতা ৭১- লেখকঃ কাদেরিয়া বাহিনির সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। )

সখীপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম.ও. গণি বলেন, পরশুরাম মেম্বার তার নিজ দায়িত্বে বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ তার বাড়ির চারপাশে গর্ত করে মজুত করে রাখেন। সে সময় মুক্তিযোদ্ধারা যু্দ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে খবর পেয়ে পরশুরাম মেম্বার তার কাছে মজুতকৃত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও কৃষিবিদ শওকত মোমেন শাহজাহানের হাতে তোলে দেন। পরবর্তীতে সেই অস্ত্র দিয়ে কালিহাতী উপজেলার বল্লা বাজারে কাদেরীয়া বাহিনীর নেতৃত্বে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়।        ( তথ্যসূত্র বীরভূমি সখিপুর-সম্পাদনায়ঃ এম.ও. গণি। )

শিক্ষক, কবি, সমাজকর্মী শফিকুল ইসলাম খান “মুক্তিযুদ্ধে আফসার বাহিনী” বইয়ে “মেজর আফসারও অস্ত্র পেয়েছিল” শিরোনামে লেখেন, ৯ ই এপ্রিল শুক্রবার ১৯৭১ সালে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও কৃষিবিত শওকত মোমেন শাহজাহান সকাল ১১ টা দিকে ডাকাতিয়ার আড়াইপাড়া বাজারে আসেন। সেখানে আনোয়ারুল বাসেদ ও ইয়াকুব আলীর সাথে দেখা হয়। বাসেদ ও ইয়াকুব আলী পরশুরাম মেম্বারের পূর্ব পরিচিত ছিল। পরে তাদের মাধ্যমে পশুরাম মেম্বারের সাথে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও কৃষিবিদ শওকত মোমেনের সাক্ষাৎ হয়। পরশুরাম মেম্বার কাদেরিয়া বাহিনী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাছে ই.পি.আরের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তান্তর করেন। সেই অস্ত্রগুলো পরে গরুর গাড়িতে করে সখিপুরের ধূমখালীতে মুক্তিযুদ্ধা সালাম ফকিরের বাড়ি ও তার আশে পাশে গর্ত করে রাখা হয়।

কয়েকদিন পর মেজর আফসার উদ্দিন আহমেদ খবর পেয়ে ছুটে যান পরশুরাম মেম্বারের বাড়িতে। মেজর সাহেব বলেন, তার কাছে আরো কোন অস্ত্র রক্ষিত আছে কি না? পরে অনেক খোঁজা-খোজি করে একটি গর্ত থেকে বেশ কিছ অস্ত্র  পাওয়া যায়। যা আফসার বাহিনীর অস্ত্রাগারকে বৃদ্ধি করে। মেজর আফসার সাহেবকে ইতিমধ্যে পরশুরাম মেম্বারে মাধ্যমে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সাহেবের সাথে দেখা করতে বলেন। তার পর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও মেজর আফসার সাহেবের সাক্ষাৎ ঘটে। পরবর্তীতে সেই অস্ত্র দিয়ে কালিহাতী উপজেলার বল্লা বাজারে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদেরীয়া বাহিনীর সাথে পাক বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়।

(তথ্যসূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধে আফসার বাহিনী-সম্পাদনায়ঃ শাহজাহান মিয়া। )

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, পরশুরাম মেম্বারে বড় মেয়ে স্বর্ণলতা রানী বলেন, যুদ্ধের এক বছর আগে আমার বিয়ে হয়। যে রাত্রে ই.পি.আর.-রা আমারদের বাড়িতে অস্ত্র রেখে যান। তার চারদিন আগে আমি বাবার বাড়িতে যাই। সেই দিন রাতে আমারা খাবার খেয়ে আমার বাবা বাদে প্রায় সকলেই ঘুমিয়ে পরি। হঠাৎ মানুষের কোলাহল শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের উঠানে ও বাহিরে অনেক মানুষের সমাগম। আমার দুই কাকা মুড়ি-গুড় বের করে তাদেরকে নাস্তা খাওয়াচ্ছে। আমি আমার দুই কাকাকে জিজ্ঞাসা করি কার কি হয়েছে? আমাদের বাড়িতে এত লোকের সমাগম কেন ? তারা উত্তরের বলে, তুমি মুড়ি ও গুড় বের করে।  দাদা ওদেরকে তাড়াতাড়ি খেতে দিতে বলেছে, তাদের নাকি অনেক কাজ আছে। তারপর আমি মুড়ি বের করে নাস্তা রেডি করতে শুরু করি। পরে ওনারা খাবার খেয়ে অস্ত্রগুলো আমাদের বাড়ির চার পাশে গর্ত করে রেখে চলে যান। যাবার সময় বলে যান, এই অস্ত্র ও গোলারুদগুলো আপনার কোছে রেখে গেলাম। দেশ স্বাধীন করার কাজে এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ লাগবে। সেইদিন আমার বাবা জীবন বাজি রেখে অস্ত্র রেখেছে বলেই, মুক্তিবাহিনীরা অতি সহজেই অনেক অস্ত্র পেয়েছিল। কিন্তু কেউ আমাদের দুই বোনের খোজ-খবর রাখেনি। আজ স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকায় আমার বাবা পরশুরাম মেম্বারের নাম অন্তর্ভূক্তির দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।

পরিশেষ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত নিবেদন এই যে, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের যোগান দাতা, প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা পরশুরাম মেম্বারের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে তার নামে একটি স্মৃতি ফলক স্থাপন করার জন্য জোড় দাবি জানাচ্ছি।

তথ্যসূত্রঃ স্বাধীনতা ৭১- সম্পাদনায়ঃ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, মুক্তিযুদ্ধে আফসার বাহিনী-সম্পাদনায়ঃ শাহজাহান মিয়া, বীরভূমি সখিপুর-সম্পাদনায়ঃএম.ও. গণি।

"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.