শিক্ষা প্রশাসন আটকা পড়েছে অসঙ্গতির বেড়াজালে

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ নীতিমালায় ২০১৮-এর কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামোতে নতুন কিছু পদ সৃজন, পদের নাম পরিবর্তন; আবার দুয়েকটি পদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিবর্তন আনা হয়েছে। অথচ মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রসমূহে পরিবর্তন না আনায় দুটো বিভাগের জনবল কাঠামোর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া সব ধারার প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য অনেক নীতিমালা ও পরিপত্র জারির ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি লক্ষ করা যায়।
এর পেছনে শুধু দুটো বিভাগের সমন্বয়হীনতাই একমাত্র কারণ নয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়াধীন অধিদফতর ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি/প্রেষণে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সম্ভবত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরই একমাত্র অধিদফতর যেখানে শিক্ষা প্রশাসনে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়নি। শুধু তাই নয় অধিদফতর ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন ব্যানবেইস, শিক্ষা বোর্ড, এনসিটিবি, নায়েম, এনটিআরসিএসহ অন্যান্য দফতরে মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ দানের ঘটনাও একেবারেই বিরল। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য প্রযোজ্য নীতিমালা ও পরিপত্র প্রণয়নের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়টিও সমন্বয়হীনতা ও অসঙ্গতির অন্যতম কারণ বলে মনে হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর ও কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। কিন্তু উপজেলা পর্যন্ত প্রশাসনিক অফিস রয়েছে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। মাউশি’র জনবল দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ে ৩টি অধিদফতরের কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩টি অধিদফতরের কাজের মধ্যেও বিরাজ করছে নানা অসঙ্গতি। এতে শিক্ষা সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নে তৈরি হয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাব, রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকা, কিছু কিছু বিদ্যমান নীতিমালার অস্পষ্টতা এবং পূর্ণাঙ্গ নীতিমালার অভাব। এ চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেরও প্রয়োজন নেই। মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের সদিচ্ছা থাকলে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেও স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তির বছরেই চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে প্রজ্ঞাপন/পরিপত্র জারি বা কতিপয় পরিপত্রের সংশোধনী এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অনেক সংস্কার বা অসঙ্গতি দূর করা অসম্ভব কিছু নয়। এক্ষেত্রে কতিপয় প্রস্তাবনা ভেবে দেখা যেতে পারে।
জনবল কাঠামোর অসঙ্গতি দূরীকরণে সংশোধনী সংক্রান্ত : আন্তঃবিভাগের সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্প্রতি চূড়ান্ত করা দুটো বিভাগের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় বিদ্যমান অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা দূরীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং শিক্ষা গবেষকদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধিমালা সংশোধন : ২০০৯ সনে প্রণীত ম্যনেজিং কমিটি প্রবিধিমালা অনুসরণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠিত হয়ে আসছে। ২০০৯ সনে প্রবিধিমালা জারি হওয়ার পর এ পর্যন্ত অনেকগুলো সংশোধনী আনা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সনের ২২ ডিসেম্বর ২১টি সংশোধনীসহ একটি পরিপত্র জারি করা হয়। তারপরও প্রবিধিমালায় বিদ্যমান অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি নিরসন হয়নি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের শতভাগ সরকার বহন করছে এবং এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে না থাকার পরও ম্যানেজিং কমিটির কর্মপরিধি আজও পরিমার্জন হয়নি। বছর তিনেক আগে ম্যনেজিং কমিটি প্রবিধিমালা সংশোধনকল্পে পুনরায় উদ্যোগ নেওয়া হলেও এটি আজও দৃশ্যমান হয়নি।
 কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষর সংক্রান্ত : ১৯ আগস্ট ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ তারিখে জারিকৃত উপজেলা থেকে আঞ্চলিক কার্যালয় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের আদেশে কমিটিবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা অফিসারকে অর্পণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত আদেশে কমিটিবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা অফিসারকে অর্পণ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা বোর্ড এ ক্ষমতা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে প্রদান করে থাকে। ফলে একই বিষয়ে দুধরনের নির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ে জটিলতা তৈরি করে। এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড, মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য নীতিমালা প্রণয়ন ও পরিপত্র প্রণয়নের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমেই শিক্ষার চ্যালেঞ্জসমূহ অনেকাংশেই মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বিচারে বাংলাদেশে শিক্ষার অগ্রগতি সন্তোষজনক হলেও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে আমাদের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা অনেক বাকি। এ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হলে শিক্ষার অবিরত সংস্কারসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অসঙ্গতিসমূহ দূরীকরণে বিকল্প নেই। বাংলাদেশ অচিরেই উন্নয়নশীল দেশ হতে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। নিঃসন্দেহে শিক্ষা এক্ষেত্রে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।