ব্রেকিং নিউজ :

বহুমুখী শিক্ষাই উন্নতির কারিগর

ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন, ‘শিক্ষা সকল শক্তির মূল।’ প্রায় চারশ বছর পেরিয়ে আজও কেউ সে কথাটির ততটা অবমূল্যায়ন করতে পারেনি। যুগে যুগে যেন সে সত্যই প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়াও একটি প্রচলিত প্রবাদ বাক্য আছে, ‘Education is the bachbone of a nation- শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড।’ মানুষের মেরুদণ্ডের মতো শিক্ষাও একটি জাতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ। নুন ছাড়া যেমন তরকারি স্বাদযুক্ত হয় না তেমনি শিক্ষা ছাড়া একটি জাতি কখনও উন্নতির কল্পনা করতে পারে না। একটি জাতি উন্নতির ক্রমবর্ধমান পথে ধাবিত হতে হলে বা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাতে হলে শিক্ষা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই।
এ পর্যন্ত যে জাতি শিক্ষাকে যতটা অবহেলার চোখে দেখেছে, সে জাতি অন্যদের তুলনায় আজ ততটাই পিছিয়ে রয়েছে। প্রসঙ্গের আলোকে উদাহরণ টানা যায় বাংলাদেশ-চীনের কথা। চীন দেশটি যতটা শিক্ষাকে নিয়ে ভাবে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করে, শিক্ষাকে মূল্যায়ন করে, বাংলাদেশ তার আশপাশেও নেই বিধায় আজও বাংলাদেশ শিক্ষা সূচকে বহুদূর পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র কিংবা একটি জাতির উন্নয়নের পথকে ত্বরান্বিত করে। শিক্ষা একজন ব্যক্তির জীবনে যেমন পরিবর্তন বয়ে আনে, ঠিক তেমনি একটি সমাজকে করে আলোকিত, জাতি/দেশকে করে উন্নত। আধুনিক যুগে একজন ব্যক্তির জীবনে শিক্ষা ছাড়া চলার কোনো গতি নেই। কারণ কথায় আছে, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট আর মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ শিক্ষা ছাড়া জ্ঞানলাভের চিন্তা করা বোকামি। আর জ্ঞানহীন জীবনে না করা যাবে কোনো কাজে বুদ্ধির কাটাকাটি, না আসবে মুক্তি। অতঃপর আজীবন বন্দি হয়ে নীরবে সইতে হবে পরাধীনতার গ্লানি।
পুঁথিগত শিক্ষা বা একমুখী শিক্ষা ব্যক্তি/সমাজ/রাষ্ট্রীয় জীবনে সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে না, শুধু বহুমুখী শিক্ষাই সমৃদ্ধির পথকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আধুনিক সময়ে সব জায়গায় প্রতিযোগিতার ভিড়। এই ভিড়ে যে যত বিষয়ে বেশি পারদর্শী সে তত বেশি ভিড় ঠেলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য, আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু শিখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় পাস করা যায়, সর্বোচ্চ কত নাম্বার পাওয়া যায় ইত্যাদি অর্থাৎ পুঁথিগত শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষা তো দূরের কথা ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও হাতেনাতে শিখানো হয় না কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার বরং শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি জ্ঞানটিও গলদকরণ করতে উৎসাহিত করা হয়। যে কারণে আজ বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখেরও বেশি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, চাকরির বাজারে যতটা না পুঁথিগত শিক্ষার বিচার করা হয় তার চেয়ে বরং বেশি বিচার করা হয় নীতিগত ও কারিগরি শিক্ষা অর্থাৎ একজন প্রতিযোগীকে মূল্যায়ন করা হয় সে কি বহু শিক্ষায় শিক্ষিত, না কি। প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে কেন বাংলাদেশে চাকরির বাজারের মূল্যায়নের ধরন এক, আর শিক্ষা প্রয়োগের অবকাঠামো আরেক? কেন শিক্ষার্থীদের বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে না? এর জন্য দায়ী শিক্ষাতত্ত্বের ভুল প্রয়োগ, দুর্বল ও অপরিপক্ব শিক্ষানীতি এবং শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারীদের অবহেলা।
চাকরির ক্ষেত্রে সায়েন্স, কমার্স, আর্টস বলে কিছু নেই। আমরা যে বিভাগেই পড়াশোনা করি না কেন, আমাদের সব পারতে হয়, যেমন জানতে হয় ইতিহাস তেমনি জানতে হয় বিজ্ঞান, গণিত। আর প্রযুক্তি জ্ঞান থাকা তো বর্তমান সময়ের মুখ্য বিষয়, জানা আবশ্যক। তবে চাকরির বাইরেও বিভিন্ন পেশায় আমরা সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে জানতে হবে পুঁথিগত বিদ্যা, মাথায় রাখতে হবে প্রযুক্তি জ্ঞান, হতে হবে সৎ, পরিশ্রমী। আমরা অনার্স শ্রেণি শেষ করে যদি কৃষিপ্রধান দেশের ধান রোপণের কলাকৌশল না জানি তবে আমরা বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত না। আমরা যদি ইতিহাস পড়ে, সাধারণ বিজ্ঞানের বিষয়গুলো না জানি তবে আমরা বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত না। আমরা যদি রসায়ন পড়ে দেশের ইতিহাস, রাজনীতি সম্পর্কে না জানি তবে আমরা বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত না। বহুমুখী শিক্ষা সেটাই যে, যিনি ডাক্তার হয়েও জীবনের প্রয়োজনে ইলেকট্রনিক বিষয় বা তার পড়ার ক্যাটাগরির বাইরের বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন। আসলে বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হলে আমি, আপনি বা আমাদের কখনও জীবন সংগ্রামে বিপদে পড়তে হবে না। একদিকে হোঁচট খেলে অন্যদিকে হেঁটে যাওয়ার শক্তি খুঁজে পাব। কিন্তু আমরা আজ সেই পথে নেই, আছি শুধু একমুখী শিক্ষা নিয়ে।
ফলে আমরা সময়ে সময়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই এবং আর মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি খুঁজে পাই না। তা ছাড়াও আমরা একমুখী কর্ম খুঁজতে খুঁজতে দিশেহারা হয়ে যাই কিন্তু লক্ষ করিনি আমাদের পাশে থাকা বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষটি সহজেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। কিন্তু আমরা পারি ভাগ্যকে দোষারোপ করতে। সুতরাং আজকাল দেখা যাচ্ছে, কেউ যদি বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়, তবে সে চলার পথে বেশি বিপদে পড়ছে। অতএব, আসুন আমরা শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয় তার পাশাপাশি কারিগরি, নীতিগত বা অন্যান্য শিক্ষায় শিক্ষিত হই। তবেই ঘুচবে আমাদের বেকারত্ব সমস্যা, সমাজ বা দেশ হবে উন্নত। সুতরাং সময়ের সেরা দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত শিক্ষায় নয়, পাশাপাশি বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলুন।
"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।