ব্রেকিং নিউজ :

হাশরের মাঠে মানুষের অস্থিরতা ! কেউ কাউকে চিনবে না

নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক: মৃত্যুর পর মানুষ জীবিত হয়ে হিসাব-নিকাশের জন্য হাশরের ময়দানে একত্র হবে। হাশরের ময়দানটা দুনিয়ার মতো হৃদ্যতা-ভালোবাসাপূর্ণ হবে না। দুনিয়াতে যাদের জন্য নিজের জান বিসর্জন দিতে পর্যন্ত কুণ্ঠিত হতো না, হাশরে নিজেদের নিয়েই এমন ব্যতিব্যস্ত হবে যে, কেউ কাউকে চিনবে না। চিনলেও সামনে পড়ে গেলে মুখ লুকিয়ে রাখবে। কেউ কারও খোঁজখবর রাখবে না। দেখাবে না কেউ কারও প্রতি ন্যূনতম সহানুভূতি। সবাই ভয়ে তটস্থ থাকবে। তাই সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়টি খুবই হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন কানবিদীর্ণকারী প্রচণ্ড শব্দ আসবে, সেদিন মানুষ পালাবে নিজের ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও আপন পুত্রদের থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে।’ (সুরা আবাসা : ৩৩-৩৭)।

ঘনিষ্ঠতা বিবেচনায় আয়াতটিতে নিচ থেকে ওপরের দিকের আত্মীয়তার সম্পর্ক যথাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নিকটাত্মীয়রাও কেউ কারও পরিচয় দেবে না। পালানোর কারণ সম্পর্কে তাফসিরে কুরতুবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাফসিরকারীরা বলেছেন, যাতে তারা তার কাছে কিছু চাইতে না পারে এ জন্য পালিয়ে বেড়াবে। কোনো কোনো তাফসিরকারী বলেছেন, যাতে তারা না দেখতে পায় সে কি কঠিন অবস্থা পার করছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তারা তার কোনো উপকার এবং কোনো কাজে না আসার বিষয়টি জানা থাকার কারণেই পালিয়ে থাকবে। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন কেউ কারও কোনো কাজে আসবে না।’ (সুরা দুখান : ৪১)।

হাসান (রহ.) বলেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম পিতা থেকে পালাবেন ইবরাহিম (আ.), সর্বপ্রথম আপন পুত্র থেকে পালাবেন হজরত নুহ (আ.) এবং সর্বপ্রথম স্ত্রী থেকে পালাবেন হজরত লুত (আ.)। হজরত ইকরিমা (রহ.) বলেন, স্ত্রীর সঙ্গে স্বামী দেখা করে বলবে, ওহে, আমি দুনিয়াতে তোমার জন্য কেমন স্বামী ছিলাম? স্ত্রী বলবে, আপনি খুবই ভালো স্বামী ছিলেন। এবং তার যত পারে প্রশংসা করবে। তখন স্বামী তাকে বলবে, আজ তোমার কাছে একটি নেকি চাই। স্ত্রী বলবে, আপনি তো খুব সহজ জিনিস চেয়েছেন। কিন্তু আমি তা কিছুতেই আপনাকে দিতে পারছি না। কারণ, আপনি যার আশঙ্কা করেন, আমিও তার আশঙ্কা করি। ভালো সম্পর্ক রাখত এমন আপন পুত্রের সঙ্গে বাবা সাক্ষাৎ করে বলবে, হে বৎস, আমি তোমার কাছে কেমন বাবা ছিলাম? পুত্র খুব প্রশংসা করবে। বাবা বলবে, হে বৎস, তোমার নেকি থেকে আমার অল্প নেকি প্রয়োজন। যাতে আমাকে যে বিপদে দেখছ এর থেকে আমি উদ্ধার হতে পারি। পুত্র বলবে, বাবা! আপনি খুবই সহজ জিনিস আবদার করেছেন। কিন্তু আপনি যার আশঙ্কা করেন, আমিও তার আশঙ্কা করি। তাই আমি আপনাকে কিছুই দিতে পারব না।’ (তাফসিরে ইবনে কাসীর)।

কঠিন এই দিনে মানুষ অস্থির হয়ে উঠবে। দীর্ঘ অবস্থানের কারণে সবাই হাপিত্যেশ করতে থাকবে। তাই এর থেকে মুক্তির জন্য মানুষ আত্মহারা হয়ে যাবে। সবার কামনা হবে বিচারপর্ব শুরু হোক। পরে যা হওয়ার হবে। আপাতত এ অবস্থানের সমাপ্তি হোক। এখানে আর থাকা যাচ্ছে না। সূর্য মাথার ওপরে তেতে থাকায় ঘামের নদী বয়ে যাবে। এর প্রখরতায় সবাই পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটতে থাকবে। তবে মানুষ আশা ছাড়বে না আল্লাহর রহমতের। কারণ, তিনি বান্দাদের প্রতি খুবই দয়ালু। তাই আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য তারা অনেক নবী-রাসুলদের কাছে ছুটবে। সব নবী-রাসুলই ওজর পেশ করে দেবেন। নিজের কোনো ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিদায় দেবেন। নিজেরাও বলতে থাকবেন ইয়া নাফসি (আমার কী অবস্থা হবে) ইয়া নাফসি (আমার কী অবস্থা হবে)। তারপর সবাই মিলে আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর কাছে যাবে। তিনি শুধু উম্মতে মুহাম্মদির জন্য সুপারিশ করবেন না। তিনি সুপারিশ করবেন সবার জন্য। পুরো মানবজাতির জন্য।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবী (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি হব সব আদম সন্তানের সরদার এবং আমিই প্রথম কবর থেকে উঠব। আল্লাহর নিকট আমিই প্রথম সুপারিশ করব এবং আমার সুপারিশই প্রথম কবুল হবে।’ (মুসলিম : ২২৭৮)। মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাঁর সুপারিশ কবুল করবেন। মুক্তি দেবেন সবাইকে এ কঠিন পরিস্থিতি থেকে। বিচারপর্ব শুরু হওয়ার জন্য এটা হলো ব্যাপক সুপারিশ। আল্লাহ সবাইকে এর থেকে উদ্ধার করবেন। এখানে মুমিন মুসলমানের কোনো পার্থক্য হবে না। সবার জন্য হবে সুপারিশ। এটাকে বলে শাফায়াতে কুবরা। এদিন মানুষ সর্বমোট তিন দলে বিভক্ত হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে।’ (সুরা ওয়াকিয়া: ৭)।

আয়াতটির ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, কেয়ামতের দিন সব মানুষ তিন দলে বিভক্ত হবে। ১. একদল আরশের ডান পাশে থাকবে। তারা আদম (আ.)-এর ডান পার্শ্ব থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাদের আমলনামা তাদের ডান হাতে দেওয়া হবে। তারা সবাই জান্নাতি। ২. দ্বিতীয় দল আরশের বাম দিকে জমায়েত হবে। তারা আদম (আ.)-এর বাম পার্শ্ব থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে। তারা সবাই জাহান্নামি। ৩. তৃতীয় দল হবে অগ্রবর্তীদের দল। তারা আরশ অধিপতির সামনে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য ও নৈকট্যের আসনে থাকবে। তারা হবেন নবী, রাসুল, সিদ্দিক, শহীদ ও ওলি-আওলিয়ায়ে কেরাম। তাদের সংখ্যা প্রথমোক্ত দলের তুলনায় কম হবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির)।

"নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.