আল্লাহর ওপর ভরসার প্রাপ্তি ও তার সুফল

 আল্লাহ পৃথিবীর সবার পালনকর্তা। জীবনে চলার পথে যা কিছুর প্রয়োজন সবকিছুর ব্যবস্থা তিনিই করেন। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সৃষ্টিকুলের কোনো শক্তি নেই। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। মানুষ তাঁর দুর্বল সৃষ্টি। তাই প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষ আল্লাহর মুখাপেক্ষী। তাঁরই দেওয়া জীবন পাথেয় গ্রহণ করে দিন কাটাতে হয়- এটাই পৃথিবীর শাশ্বত বিধান। সে সঙ্গে আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, ভালো-মন্দের সবকিছু একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি কারও কল্যাণ চাইলে, তার অকল্যাণ করবে এমন শক্তি কারও নেই, পক্ষান্তরে আল্লাহর ক্রোধ কারও ওপর নিপতিত হলে, তা থেকে বাঁচানের সাধ্য কারও নেই। তাই আমাদের বিশ্বাসের জায়গা থেকেই সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর ভরসা করে পথ চলতে হবে।
দুনিয়ার জীবনে সব মানুষের ভরসা করতে হয়। কোথাও না কোথাও তাকে আত্মসমর্পণ করতেই হয়। সব দুঃখ-বেদনা কোথাও না কোথাও বলতেই হয়। সেই নির্ভরতার স্থান কোনটা? যারা ঈমান থেকে বঞ্চিত, ঈমানের শিক্ষা থেকে মাহরুম, তারা সেই স্থান এমন ব্যক্তি বা বস্তুকে বানিয়ে নেয়, বাস্তবে যাদের কল্যাণ-অকল্যাণের কোনোই ক্ষমতা নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহ যাদেরকে ঈমান দান করেছেন, তাওহিদের আলোয় আলোকিত করেছেন, তারা তাদের সব বেদনা, সব প্রার্থনা এমন একজনের কাছে পেশ করে, যিনি বাস্তবেই মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। আর যিনি সৃষ্টির প্রতি পরম দয়ালু। বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা ভরসা কর পরাক্রমশালী করুণাময়ের ওপর।’ (সুরা শুয়ারা : ২১৭)
এই নির্ভরতা ও ভরসাকেই আরবিতে বলা হয় তাওয়াক্কুল। জীবনের সব বিষয়ে, কল্যাণ লাভের ক্ষেত্রেও, অকল্যাণ থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রেও এটা জরুরি। আর তা এমন সত্তার ওপরই হতে পারে যিনি সব বস্তুর স্রষ্টা। বস্তুর গুণ ও বৈশিষ্ট্যের স্রষ্টা। যিনি গোটা জাহানের পালনকর্তা এবং যিনি
দুনিয়া-আখিরাতের সব কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক, এমন সত্তার ওপরই ভরসা করা যায়। তাঁর পরিবর্তে মানুষ যদি অন্য কারও ওপর ভরসা করে তা হলে তা হবে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি।
একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার, ভালোর যেমন স্তরভেদ আছে, তেমনি মন্দেরও আছে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওপর ভরসা করারও বিভিন্ন স্তর ও পর্যায় আছে। ভরসা করা অন্তরের কাজ। এটা আল্লাহর প্রতিই থাকতে হবে। এ কারণে অন্য কারও ওপর ভরসা করলে তা নিঃসন্দেহে তাওয়াক্কুল পরিপন্থি ও গুনাহের কাজ। এখন যদি এর সঙ্গে শিরকি কোনো আকিদা যুক্ত হয়, যেমন গায়রুল্লাহকে অলৌকিক ক্ষমতার মালিক মনে করে তার ওপর ভরসা করে তা হলে তা সরাসরি শিরক। আর যদি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বাস করে নয়; বরং পার্থিব অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতার কারণে ভরসা করে তবে তা সরাসরি শিরকে আকবর না হলেও মাসিয়াত ও তাওয়াক্কুলবিরোধী। এটা প্রকৃতপক্ষে পার্থিব উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা, যা নিষেধ। ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপরই করতে হবে।
আরও একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন, তা হচ্ছে ভরসা ও ব্যবহারের পার্থক্য। উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা করা যাবে না অর্থ এই নয় যে, তা ব্যবহারও করা যাবে না। বৈধ উপকরণ বৈধপন্থায় ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু ভরসা রাখতে হবে আল্লাহর ওপর। তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ দুনিয়ায় কাজকর্ম পরিত্যাগ করা নয়। ভরসা করা অন্তরের বিষয়। মুমিন অন্তর থেকে বিশ্বাস করে- আমার সব ভালো-মন্দ আল্লাহ পাকের হাতে, তবে দুনিয়ার জীবনের এবং আখিরাতের জীবনের সফলতা অর্জনের জন্য আল্লাহ পাক কিছু পথ ও পন্থা নির্ধারিত করেছেন। তা আমাকে অবলম্বন করতে হবে। ভালো-মন্দ আল্লাহর হাতে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সেই ভালো পাওয়ার জন্য এবং সেই মন্দ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ যে পথে চলার আদেশ করেছেন সে পথেই আমাকে চলতে হবে। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য। কর্মহীন বসে থাকার কথা আল্লাহ পাক দুনিয়ার ব্যাপারেও বলেননি, আখিরাতের ব্যাপারেও বলেননি। প্রথমে আখিরাতের বিষয়টি দেখুন। ইসলামে তো বলা হয়নি যে, আখিরাতে যেহেতু আল্লাহই নাজাত দেবেন তাই কোনো আমল করতে হবে না- নামাজ পড়তে হবে না, রোজা রাখতে হবে না, পর্দা করতে হবে না, হালাল মোতাবেক চলতে হবে না, হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে না। এ কথা তো ইসলাম বলেনি; বরং গুরুত্বের সঙ্গে এসব হুকুম-আহকামের পাবন্দি করতে বলেছে।
তাওয়াক্কুলের সুফল অনেক। তাওয়াক্কুল যত শক্তিশালী হবে সুফলও তত বেশি পরিলক্ষিত হবে। এক সুফল এই যে, এই বান্দা হালাল উপায় ছেড়ে হারাম উপায়ের দিকে যাবে না। আমার ভরসা যেহেতু আল্লাহ পাকের ওপর, তা হলে হারাম উপায়ের দিকে কেন আমি যাব? আমি যেহেতু আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করে এবং পৃথিবীতে আল্লাহর ব্যবস্থার অধীন হয়েই উপায় অবলম্বন করেছি, তাই সেই উপায়ই অবলম্বন করব, যা হালাল। এর মাধ্যমেই আল্লাহ আমাকে রিজিক দেবেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো প্রাণ তার রিজিক পূর্ণ না করে মারা যাবে না। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তমপন্থায় অন্বেষণ করো।’ (ইবনে মাজা : ২১৪৪)
বান্দা যখন আল্লাহর ওপর ভরসা করে তো এর বিনিময়ে সে কী পায়? এর বিনিময়ে সে আল্লাহর ভালোবাসা পায়। আল্লাহর নৈকট্য পায়। বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৫৯)। আল্লাহ তার অন্তরে শান্তি ও প্রশান্তি দান করেন এবং আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। বর্ণিত হয়েছে, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক : ৩)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাওয়াক্কুলের সঠিক শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফিক দিন। আমিন।
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.