শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের নৈতিক শিক্ষা বাড়াতে হবে

মানব জীবনের উন্নয়নে ও কল্যাণের সব বিষয়ের প্রধান নির্ণায়ক হলো নৈতিকতা। নৈতিকতার অভাবে শিক্ষক সঠিকভাবে শিক্ষাদান করেন না, অফিসের কাজ ঠিকমতো হয় না, মানবসেবা হয় না, অন্যের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয় না, মানুষকে পদে পদে হয়রানি করা হয়, ঠকানো হয়। মানুষ কোথায় শিখবে এ নৈতিকতা? মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বড় পার্থক্য হলো, মানুষ নৈতিকতাসম্পন্ন জীব, অন্য প্রাণী তা নয়। ন্যায় আর সত্যের পথ অনুসরণ করে অন্যের ক্ষতি না করে যতটুকু সম্ভব উপকার করা, অপরের কল্যাণ করা প্রতিটি নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষের কাজ। প্রতিটি ধর্মেই তাই নৈতিকতার কথা বলা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে; কারণ নৈতিকতাবিহীন মানুষ ধর্মীয় কাজ করে কী করবেন? নৈতিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সততা, মহত্ত্ব, ন্যায়পরায়ণতা, আদর্শবাদিতা। লোভ-লালসা, উচ্চাভিলাষ ও বিবেচনাহীন জৈবিক কামনা মানুষকে অসৎ পথে পরিচালিত করে। ফলে সমাজ ও দেশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
আমরা দেশের বড় বড় শহরের দিকে তাকালেই দেখতে পাই সুবিশাল অট্টালিকা। মনে হয় যেন দেশ এগোচ্ছে হু-হু করে; তবে সামাজিক মূল্যবোধ যে অবক্ষয়ের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে তা যদিও চোখে দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। আর তার ফলে যা হয় আমরা তা প্রত্যক্ষও করছি ব্যক্তি এবং সমাজ জীবনে; কিন্তু বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি কম। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি- এটি নৈতিকতার অবক্ষয়েরই প্রমাণ। দেশের বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে নৈতিকতার অধঃপতন নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা চিন্তিত। কয়েক যুগ আগে যেসব অপরাধের কথা চিন্তা করা যেত না, এখন সে ধরনের অপরাধ সমাজে সংঘটিত হচ্ছে দেদার।
একসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোচিং ছিল খুবই কম। কিন্তু প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর শিশুশিক্ষায় ব্যাপক হারে বেড়েছে কোচিং। বছর দুয়েক আগের গণসাক্ষরতা অভিযানের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দেশের ৮৬.০৩ শতাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে হয়েছে। ৭৮ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোচিং ছিল বাধ্যতামূলক। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, পাসের হার বাড়াতে খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া, বিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনিয়ম হচ্ছে। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই মাসিক অর্থ দিয়ে বাধ্যতামূলক কোচিং করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে কোচিং না করলেও টাকা দিতে হয়। ৪৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় না। ৭০ শতাংশ বিদ্যালয়ে স্কাউটিং হয় না। অনেকের বিপথে যাওয়ার যাত্রা এখান থেকেই শুরু হয়। একজন মানুষ অবৈধ অর্থ কেন নেবেন না সে বিষয়ে তার কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ আছে কি?
দেখা যায়, অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ যতটুকু এগিয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বরং সামাজিক সুরক্ষা ও সুশাসনের চরম অবনতি ঘটেছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে দুর্নীতি। ফলে অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, যা টেকসই উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের প্রতাপে সবুজ চত্বর, খেলার মাঠ শুধু সামাজিক চারণক্ষেত্র থেকে নয় বরং কিন্ডারগার্টেন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যন্ত হারিয়ে যেতে বসেছে। অবাধ আকাশ সংস্কৃতির নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে পড়ে সুস্থ বিনোদনের অস্তিত্ব আজ খুঁজে পাওয়া দায়। কিশোর ও তরুণরা ভালো বই পড়ে না, ভালো সিনেমা দেখে না। বন্ধুত্বের যথার্থতা তারা বোঝে না। পরিবার শিক্ষার বড় অঙ্গন। সেখান থেকে তারা এ শিক্ষা পায়নি। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, সন্তানদের প্রতি উদাসীনতা, কিংবা তাদের অনৈতিক উপায়ে অর্জিত অর্থ এসব কিশোরকে অনৈতিক কাজে উৎসাহ জোগায়।
শিক্ষা মানুষের দায়িত্ববোধকে এবং মানুষের মধ্যে ঘুমন্ত মানবতাকে জাগ্রত করে, আর তা না করতে পারলে সে শিক্ষার মূল্য কী? একটি বৃক্ষকে সবল ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে হলে তার সব পর্যায়ে পরিচর্যা প্রয়োজন। আমরা শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে, ডিগ্রি দিয়ে সমাজে ছেড়ে দিচ্ছি। তারা নিজ পরিবার, সমাজ, মানুষ ও দেশকে কী দেবে তার কোনো শিক্ষা দিচ্ছি না, নীতি-নৈতিকতার কোনো শিক্ষা দিচ্ছি না। তাহলে তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আমরা কী আশা করতে পারি?
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.