মধুপুরে কৃষি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়; হুমকির মুখে পরিবেশ-ফসলিজমি ও রাস্তাঘাট 

ধনবাড়ী (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি : টাঙ্গাইলের মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের ফাঁদে ফেলে কৃষি জমির উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করছে ইটভাটায়। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক শ্রেণির দালল চক্র দীর্ঘদিন যাবত এ ব্যাবসা করে আসছে। কোন ভাবেই থামানো যাচ্ছে না তাদের এ ব্যাবসা। কৃষকরা বলছেন, মাটি বিক্রির ফলে এখন ওই জমিতে আগের মত ফসল হচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা হারাচ্ছে অপদিকে এসব মাটি ট্রাক দিয়ে ইটভাটায় নেয়ার ফলে গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়কগুলো নষ্ট হচ্ছে। হুমকীর মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র ও পরিবেশ।

উপজেলার জটাবাড়ী গ্রামের আবেদ আলী, দুর্গাপুরের সোহরাব আলী ও নাগবাড়ীর কাদের মিয়াসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, বিত্তিবাড়ি এলাকার তাজ ব্রিকস, শিবরাম বাড়ীর মদিনা ব্রিকস, দুর্গাপুরের হানিফ ব্রিকস, আকাশির আশা ব্রিকসসহ উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় ইট তৈরির জন্য এলাকার কৃষকদের টাকার ফাঁদে ফেলে তাদের কৃষি জমির মাটি ইটভাটার দালাল চক্রের মাধ্যমে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে সেই জমিগুলোতে আগের মত ফসল ফলানো যাচ্ছে না। চব্বিশ ঘন্টা মাটি বহনের জন্য গ্রামীন কাঁচা-পাকা সড়ক চাকায় পৃষ্ট হয়ে এক থেকে দেড় ফুট দেবে যাচ্ছে।

জটাবাড়ী গ্রামের বাদশা তালুকদাসহ স্থানীয়রা জানান, উপজেলার বিপ্রবাড়ীর আলম, জটাবাড়ীর গিয়াস, আশ্রা গ্রামের আজিজুল হক, হলুদিয়ার ফরমান আলী, মোটেরবাজারের শামীম হোসেনসহ বিভিন্ন এলাকার ২০/২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র এলাকায় মাটি লুটের রাজত্ব কায়েম করেছে। স্থানীয়রা তাদের দাপটে মুখ খুলতে সাহস পায় না। ব্রাহ্মণবাড়ী, ভবানীটেকি, জটাবাড়ী, বৃত্তিবাড়ী, নাগবাড়ী, দুর্গাপুর, জয়নাতলী, ধামালিয়া, ধরাটিসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে এসব মাটি কাটা হচ্ছে। এতে পার্শ^বর্তী জমির মালিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, প্রতিবছর ব্যাপক পরিমানে ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। যার কারণে দিনদিন ধান, গম, সরিষা আনারস, সবজি ও কলাসহ কৃষি ফসলের আবাদী জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক সময় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে দিনের আঁলোতে নয়, রাতের আঁধারেও চলে মাটি কাটার কাজ।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার জটাবাড়ী গ্রামের কৃষক আ. সালাম, আল-আমিন ও জহুর আলীসহ কৃষকদের জমি থেকে এস্কেভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকে বহন করে বিভিন্ন ইটভাটা, বাসাবাড়ী ও জলাশয় ভরাটের জন্য নেয়া হচ্ছে। এ উপজেলায় ২০ টি ইটভাটা থাকলেও পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র একটির।

এদিকে সংবাদকর্মী উপস্থিতি টের পেয়ে ভেকু চালক ভেকু রেখে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়।

মধুপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর বাদশা তালুকদার বলেন, ‘জটাবাড়ী গ্রামের তিনটি পয়েন্টসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় নিচ্ছে। এতে করে ইটভাটার মালিক ও দালালরা লাভবান হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা।’

মির্জাবড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান তালুকদার বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তবে, নবনির্বাচিত মির্জাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল মঙ্গলবার আমার প্রতিনিধি পাঠিয়ে ছিলাম খৈলাকুড়া এলাকায়। মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত অন্তত ১৫/ ২০ টি ট্রাক দাড় করানো ছিল মাঠে। আমি বিষয়টি উর্ধ্বতন মহলকে জানাবো।’

মহিষমারা ছলিমের বাজারের মাটি ব্যবসায়ী গাজীবর রহমান জানান, তিনি ইট ভাটায় মাটি কাটার জমি বন্দোবস্ত করে দেওয়ার সুবাদে কমিশন পান। বর্তমানে বড়বাইদ এলাকায় তার এস্কেভেটর ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতি হাইড্রোলিক ট্রাক মাটি ৬শ থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি করি।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আল-মামুন রাসেল বলেন, ‘টপ সয়েল হল কৃষি জমির প্রাণ। কৃষি জমরি উর্বর এ মাটি কেটে বিক্রি করলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রস পাবে। এতে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি খুঁজ নিয়ে দেখবো।’

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা ইয়াসমীন বলেন, ‘মাটি কাটার বিষয়টি আমি শুনেছি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.