শুক্রবার, জুন ১৯, ২০২৬
Homeটাঙ্গাইল জেলাটাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়ে ছোট ভাইয়ের প্রতারণার অভিযোগ

টাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়ে ছোট ভাইয়ের প্রতারণার অভিযোগ

শুভ্র মজুমদার, টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার এক অজ্ঞাতনামা গ্রামে ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক কাহিনী। ফুলকি মধ্যপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম ওরফে খসরু, দেশের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু, তার শেষ জীবন যেন এক নিরব কান্নায় আচ্ছন্ন। ২৫ বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, আর এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার আপন ছোট ভাই নবাব আলী কৌশলে তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আত্মসাৎ করে আসছেন।

এই ঘটনা কেবলমাত্র একটি প্রতারণার নয়, বরং এক মানবিকতার চরম পরাজয়ের গল্প। খোরশেদ আলম যখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে নিজের জীবনযুদ্ধের সাথে লড়ছিলেন, তখন তিনি তার ছোট ভাই নবাব আলীর হাতে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন। ভাইয়ের প্রতি এই নির্ভরতা, বিশ্বাসের যে বন্ধন, সেটাই হয়ে উঠেছিল তার প্রতারণার সূচনা।

নবাব আলী নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বড় ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধা কার্ডে নিজের ছবি লাগিয়ে, নিজেকে খোরশেদ আলম হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিয়মিতভাবে ভাতা তুলতে থাকেন। দীর্ঘদিন এই প্রতারণার খবর ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু যখন এই ঘটনা ফাঁস হয়, তখন গ্রামবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করে। তারা বিস্মিত যে, এমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি নিজের জীবনের সেরা দিনগুলো দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, তার শেষ জীবন এমন প্রতারণার শিকার হয়ে কাটাতে হবে।

খোরশেদ আলমের ছেলে মান্নান মিয়া ২০১৮ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এই প্রতারণার বিষয়ে অভিযোগ করেন। তৎকালীন সময়ে এক বছরের জন্য ভাতা স্থগিত করা হলেও, অজানা কারণে পরে আবার চালু হয়। অবশেষে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে, খোরশেদ আলম নিজেই টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাসাইল আমলি আদালতে মামলা করতে বাধ্য হন।

এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ভাঙনের গল্প নয়, বরং এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধের এক চরম পরীক্ষা। একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাকে এমন করুণ অবস্থায় দেখতে পেয়ে এলাকার মানুষ শোকাহত। তারা দ্রুত সঠিক তদন্ত এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক আতাউল গনি এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মাদ মোশারফ হোসেন খান বিষয়টি নিয়ে সুন্দর একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন। এছাড়া, উপজেলা মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডার নূরুল ইসলাম এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান শামছুর রহমান খান বিজু প্রতারণার এই ঘটনাটি সত্যতা স্বীকার করে প্রত্যায়নপত্র দিয়েছেন। একটি সূত্র জানায়, উপজেলা সমাজসেবা অফিসের কিছু কর্মী এই প্রতারণার পিছনে থেকে সহযোগিতা করেছে।

একটি দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা, যিনি জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য লড়েছেন, তাকে যদি শেষ জীবনে এমন প্রতারণার শিকার হতে হয়, তবে আমাদের সমাজের মানবিক মূল্যবোধের অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই। আমরা আশা করি, সমাজের সকল স্তরের মানুষ এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই প্রতারণার অবসান ঘটাবেন।

সমাজের এই অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে আমাদের সকলের একসঙ্গে রুখে দাঁড়ানো উচিত। কারণ, একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবনের চূড়ান্ত সম্মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Previous article
Next article
টাঙ্গাইলে নারী শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং, প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থীদের উপর পরিবহন শ্রমিকদের হামলা নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে নারী শিক্ষার্থীদের ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও লাঞ্ছিতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহত শিক্ষার্থীদের উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে হাসপাতালে করানো হয়। সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা পৌর শহরের ভূঞাপুর বাসস্ট্যান্ডে এ ঘটনা ঘটে। ইভটিজিংকারীদের বিচারের দাবিতে ভূঞাপুর-তারাকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে। জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুনুর রশীদের বদলির প্রত্যাহারের দাবিতে ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদ গেটের সামনে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। পরে সেখান থেকে কর্মসূচি শেষে শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাওয়ার সময় পরিবহন শ্রমিকরা নারী শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং করে। এনিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে গেলে পৌর শহরের ফসলান্দি এলাকার পরিবহন শ্রমিক জিয়া, শফিকুল, আলীম, খলিল ও ইউসুফের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত ও মারধর করে। এতে বেশ কয়েক শিক্ষার্থী আহত হন। পরে বাসস্ট্যান্ড চত্বরে জিয়াসহ জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে সড়কে বসে ঘণ্টাব্যাপি বিক্ষোভ করে। ইভটিজিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা জানায়, আমাদের উপজেলার ইউএনও’র প্রত্যাহারের দাবিতে কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচি শেষ করে চলে যাওয়ার সময় ট্রাক শ্রমিক নেতা জিয়া ও তার সহযোগিতা অশালীন মন্তব্য করে। পরে আমার সহকর্মীরা তাদের মধ্যে একজন আটক করলে পরিবহন শ্রমিকরা এসে হামলা চালায় এবং কয়েকজন আহত হন। তারা জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার দাবি এদিকে, সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ ও ভূঞাপুর থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টহল সদস্যরা আসে। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাদের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় জন্য আশ্বাস প্রদান করলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ থেকে সরে যায়। এই ঘটনার ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষক/শিক্ষিকারা আহত শিক্ষার্থীকে দেখতে হাসপাতালে যান এবং বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশীদ জানান, শিক্ষার্থীদের উপর হামলাকারী দোষীদের গ্রেফতারপূর্বক আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেয়া হলে তারা অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহার করে সড়ক ছেড়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular