ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি মজলুম মানুষের দরদি নেতা। মওলানা ভাসানী যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন উপমহাদেশের মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার আন্দোলন সংগ্রামের ব্রতে অগ্রসর হচ্ছিল। আর তাই জননেতা ভাসানী একদিকে যেমন জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন , অন্যদিকে তেমনি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। আমাদের লাইনপ্রথা, দেশবিভাগের পর পাকিস্তানের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ ।
মাওলানা ভাসানীকে মজলুম জননেতা বলার কারণ :
মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তার দীর্ঘ জীবনে সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, কৃষক, শ্রমিক, মজুরের দুঃখ-দুর্দশা, জমিদারদের অত্যাচার, ব্রিটিশ এ সাম্রাজ্যবাদের শাসন-শােষণের বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি চেয়েছেন সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী সরকার বিরােধী আন্দোলনে অগ্রসর হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিভিন্ন দাবি দাওয়া সরকারের কাছে তুলে ধরেন। তিনি ১৯৫২ সালের চলে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালের সংবিধানের বিরােধিতা করেন এই কারণে যে, এই সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সম্ভব হবে না। তিনি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে অটল থাকেন
এবং সংসদীয় গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কায়েমের আহ্বান জানান। অবহেলিত, শােষিত ও বঞ্চিত পূর্ব বাংলার পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও পাকিস্তান সরকারের সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিল করে জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের জন্য ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন করেন। ১৯৫৮ সালের সামরিক আইনের বিরােধিতার জন্য কারাবরণ করেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন এবং কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। তিনি অসহায়, নিরস্ত্র, অশিক্ষিত কৃষকদের অধিকার সচেতন করে তােলার লক্ষ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের নিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করেন। সমাজের অবহেলিত শ্রেণির মুক্তির জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। বাংলা ও আসামের কৃষক সমাজ এই বিপ্লবী নেতাকে ‘ মজলুম জননেতা’ উপাধিতে ভুষিত করেন। মাওলানা ভাসানী তার কর্মের মাধ্যমে বাংলার গণমানুষের কাছে একজন মুক্তিসংগ্রামের মজলুম জননেতা হিসাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
