১৯৭১ সালের গ্রীষ্মকাল। কয়েক মাস ধরে দেশে চলছে স্বাধীনতার যুদ্ধ। এ কয়েক মাসে ঢাকায় শুরু হওয়া যুদ্ধের ঢেউ এসে লেগেছে পদ্মা পাড়ের রাজশাহীতে। নূর জাহানের বয়স তখন ১৪। যেদিন নূর জাহানদের বাড়ির গেইটে পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়িটি এসে দাঁড়ায়, ছোট বোনের সঙ্গে বাড়ির উঠানে তখন খেলছিল নূর জাহান।
অস্ত্রধারী সেনারা যখন নূর জাহান ও তার বোনকে ট্রাকে তোলে, তখন তারা সেখানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আরও কয়েকজন নারীকে দেখতে পায়।
নূর জাহানের বয়স এখন ৬৫। বয়সের ভারে স্মৃতিশক্তি কমে এসেছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে নূর জাহান বলেন, ‘তারা আমাদের নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ থাকতে বলেছিল।’
ট্রাকটি ছোট শহরের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। মাঝে মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে আরও কয়েকজনকে ট্রাকে তোলে পাকিস্তানি সেনারা।
নূর জাহান বলেন, ‘মনে হচ্ছিল গবাদি পশু তোলা হচ্ছে ট্রাকে। সবাই নীরবে কান্নাকাটি করছিল। ভয়ে শব্দও করছিল না কেউ।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কোন ধারণা ছিল না যে তারা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি আর চোখে দেখেছিলাম যে আমাদের চিরচেনা রাস্তা ধীরে ধীরে ধূলোয় মিশে যাচ্ছে। আমি আমার বোনের হাত শক্ত করে ধরেছিলাম এবং পুরো সময় ভয়ে কাঁপছিলাম। আমরা সবাই বাংলার কসাই ও তাদের লোকদের কথা শুনেছি। এখন মনে হচ্ছে তাদের পাল্লাই পড়েছি।’
পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার জেনারেল টিক্কা খানকে দেওয়া ডাকনাম হলো ‘বাংলার কসাই’। এই টিক্কা খানের নির্দেশেই ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালিত হয়।
নূর জাহান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আরেকটি নৃশংস কৌশলের শিকার হতে চলেছেন। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সেনারা বাঙালি নারী ও মেয়েদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো অপরাধ শুরু করে। অনেক ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন, টিক্কা খানের সরাসরি নির্দেশে এই নীতি গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি সেনারা।
অবশেষে যখন ট্রাক থামল। মেয়েরা নিজেদের সামরিক ব্যারাকে আবিষ্কার করলো। নূর জাহান বলেন, ‘আমরা সেখানে লাশের মতো পড়ে থাকতাম। অন্ধকার একটা রুমে ২০-৩০ জন ছিলাম। সেনারা যখন আমাদের ধর্ষণ করতে আসত কেবল তখনই দরজা খুলত। ওই একটু সময়ের জন্য আমরা সূর্যের আলো দেখতে পেতাম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সামরিক ধাঁচের ধর্ষণ শিবির সারাদেশে স্থাপন করা হয়েছিল। সরকারি অনুমানে, ২০ থেকে ৪০ লাখ বাঙালি নারী ধর্ষিত হয়েছিল।
সামাজিক কুসংস্কার
ধর্ষণের শিকার নারীদের সমাজে গ্রহণ করা হয় না। সামাজিক চাপে অনেকেই তাদের নিপীড়নের কথা চেপে গেছেন। লুকানো এই কষ্টের খুব বেশি রেকর্ড নেই। তবুও বাংলাদেশের প্রতিটি কোণে, ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য নিয়ে বেঁচে আছেন এসব নারী।
১৯৭১ সালের আগস্টে রাজিয়া বেগম তার স্বামী আবু সরকারকে খুঁজতে গিয়েছিলেন, যিনি কয়েকদিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন। তিনি ঢাকার তেজতুরী বাজারের পরিত্যক্ত রাস্তায় উদ্বিগ্নভাবে ঘুরে বেড়াতেন। এই রাস্তায় ফল বিক্রি করতেন আবু সরকার। কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া যায়নি। সেই রাস্তায় একদিন পাকিস্তানি সেনাদের দেখতে পান বেগম। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এর আগেই তার মাথায় রাইফেল দিয়ে আঘাত করে পাকিস্তানি বাহিনী, যে দাগ এখনও বহন কর আসছেন তিনি।
বেগমকে কাছের একটি জঙ্গলে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে তাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে ধর্ষণ করা হয়। সেনারা কাছাকাছি অবস্থান করত এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে ফিরে আসত।
বেগমের বয়স এখন ৭৮। তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। অবসরে তারা আমাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করত। একদিন ধর্ষণের পর তারা আমাকে একটি অগভীর খাদে ফেলে দেয়।’
একজন পথচারী অবশেষে তাকে খুঁজে পেয়ে একটি আশ্রয়ে নিয়ে যান। এ ধরনের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রায় জেলায় স্থাপন করা হয়েছিল।
বেগম বলেন, ‘যা হয়েছে তা নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু এত বছর পরও সেসব দিনের কথা ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে কঠিন। আমি এখনও দুঃস্বপ্ন দেখি।’
উদ্ধার অভিযান
বাংলাদেশ গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সেক্রেটারি মালেকা খানকে যুদ্ধ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় সাহায্য করার জন্য নারী স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঢাকার জাহাঙ্গীর গেটের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকারে ধর্ষিত ও বন্দি নারীদের আবিষ্কারের কথা জানার পর, মালেকা সেখানে উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মালেকা বলেন, ‘সেখানে যেসব নারী ছিল যারা সম্পূর্ণ নগ্ন ছিল। তাদের বাংকারে করা হয়েছিল। যুদ্ধের সময় তাদের সেখানেই নির্যাতন করা হত।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা হতবাক ছিল, কথা বলতে পারেনি। অনেকের চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল। অনেকে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।’
নারীদের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রদত্ত নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ধর্ষণের শিকার নারীদের সমাজে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বীরাঙ্গনা (যুদ্ধের বীরাঙ্গনা) সম্মান প্রদান করেন এবং নারীদের জন্য একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করেন।
মালেকা বলেন, ‘পুনর্বাসন কর্মসূচি বেঁচে যাওয়াদের জন্য আশ্রয়, কাউন্সেলিং এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এখানে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ মোকাবিলা করার দায়িত্ব মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনারদের দেওয়া হয়।’
তারপর দুটি জিনিস ঘটেছিল। পরবর্তীতে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়ার জন্য অস্থায়ী আইন এবং তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক দত্তক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে।
নিউজ টাঙ্গাইলের সর্বশেষ খবর পেতে গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি অনুসরণ করুন - "নিউজ টাঙ্গাইল"র ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।