নিউজ টাঙ্গাইল ডেস্ক,, ঘটনার সূত্রপাত সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায়। রাজধানী ঢাকা মেডিকেল কলেজের নতুন ভবনের (ঢামেক) নিচতলায় এলোমেলো পড়ে রয়েছে রোগীর বিছানা ও সব জিনিসপত্র। পাশে বসে ফোনে কথা বলছেন বৃদ্ধ হাফিজুর রহমান। ‘চিকিৎসা শেষে চলে যাচ্ছেন কি না’ জিজ্ঞাসা করতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। গুরুতর অভিযোগ করেন মেডিকেলের এক ওয়ার্ডের নার্সের বিরুদ্ধে। পরে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়।
গত শনিবার রাজধানীর রামপুরা থেকে ডেঙ্গু সন্দেহে ভাইয়ের মেয়েকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসেন চাচা হাফিজুর রহমান। যথারীতি পরীক্ষার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেহজাবিন ঝুমকার। প্রথমে সিট না পেয়ে ৫০২ নম্বর ইউনিটের ৭ নম্বর রুমের ফ্লোরে থাকে। তবে রোববার ওই রুমের ৩৮ নম্বর বেড পান। সোমবার রোগীর বড় বোন সাদিয়া আক্তারকে হাসপাতালের বেডে রেখে রোগীকে নিয়ে ‘রক্তের প্লাটিলেট’ পরীক্ষা করাতে যান চাচা হাফিজুর। ঢামেকে পরীক্ষা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চলে যান। পরীক্ষায় দেখা যায়, প্লাটিলেট কমে ৭১ হাজারে চলে আসে।
রোগী যখন পাশের হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে ব্যস্ত, তখন ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবনের পাঁচতলায় রোগীর বেড নিয়ে ঘটে যায় এক অমানবিক কান্ড। রোগীর বেডে থাকা চিকিৎসাপত্র, কাপড়সহ সব কিছু বাইরে ছুড়ে ফেলে দেন ৫০২ নম্বর ইউনিটের এক নার্স। রোগীর বোন সাদিয়ার অভিযোগ, ‘তার সামনে অন্য রোগীর আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা খেয়ে ওই বেড থেকে তাদের উঠিয়ে দেন। ৩৮ নম্বর বেডে অন্য আরেক রোগীকে দেন। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরও বেডে থাকা সব জিনিস নার্স ফেলে দেন। সাদিয়া বলেন, আমার কোনো কথাই নার্স শুনতে চাননি। আমি বারবার বলেছি ডাক্তার আমাদের হাসপাতালের বেডে থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা করতে বলেছেন। কিন্তু উনি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। মারমুখী আচরণ করেন।
ওই ঘটনার সময় রোগীর বোন সাদিয়া বেডে একাই ছিলেন। মেয়েকে পরীক্ষা করাতে তার মাও ব্যস্ত ছিলেন। পরে বাধ্য হয়েই বেড ছেড়ে জিনিসপত্র নিয়ে নিচে চলে আসেন। রোগী এসে দেখে তার বেড আরেকজনের দখলে। যিনি তার থেকে অপেক্ষাকৃত অনেক ভালো ও অন্য আরেকটি রোগে আক্রান্ত।
ভয়াবহ ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে আমাদের দুজন সাংবাদিক পাঁচতলার ওই কক্ষটিতে যান। যে নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই নার্সকে সামনাসামনি পাওয়া যায়। রোগীর বড় বোন ও চাচাকে সঙ্গে নিয়ে ওই নার্সের কাছে ঘটনাটি জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব না দিয়ে প্রথমে নার্সদের রুমে চলে যান। পরে এ বিষয়ে তিনি কিছু ‘জানেন না’ বলে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ঘাড়ে দায় চেপে এক রকম দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাইলে সাংবাদিক ও উপস্থিত ভুক্তভোগীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন চিকিৎসক। এ সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার এলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে দায়িত্বরত অন্য নার্স সদস্যরা জানান, ‘অভিযুক্ত ওই নার্সকে তারা চেনেন না। তার নাম ও ফোন নাম্বারও জানেন না’। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে এবং অনেকেই মুখ বুঝে মেনে নেন বলে জানান ওই ইউনিটের একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনরা।
বিষয়টি জানানোর জন্য ভুক্তভোগীর রোগীর বোনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালকের রুমে যাওয়া হয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম নাসির উদ্দিন পুরো বিষয়টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। হাসপাতালে এখন ডেঙ্গু রোগদের প্রচন্ড চাপ উল্লেখ করে পরিচালক বলেন, আমাদের এখন আর জায়গা সঙ্কুলান হচ্ছে না। তবুও আমরা জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সোমবার একদিনেই ৫০৬ জনের মতো রোগী আসে। আগে থেকেই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা হাজারের ওপরে। এতকিছুর ভিড়ে এমন ঘটনা অনাকাঙ্খিত।
পরিচালক নিজ উদ্যোগে ভুক্তভোগী রোগীকে তার আগের বেড ফিরিয়ে দেন এবং যথাযথ সেবা নিশ্চিতে হাসপাতালের প্রধান সেবা তত্ত্বাবধায়ক খায়রুন নাহার বেগমকে ওই ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। পুরো ঘটনাটি জেনে সেবা তত্ত্বাবধায়ক নিউজ টাঙ্গাইলকে জানান, ‘অভিযুক্ত ওই নার্সকে পরিচালক নিজে শাসিয়েছেন এবং নার্স পরিচালকের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।’
রোগীর মা সাহিদা পারভীন সীমা বলেন, ছোট মেয়েটা ৪-৫ দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। সরকারি হাসপাতালে ভরসা করি বলেই সরাসরি এখানে নিয়ে আসি। কিন্তু তাদের ব্যবহার এমন হলে আমরা তো মরার আগেই মরে যাব।
সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ঝুমকার অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। আজ সকাল কিংবা সন্ধ্যায় তার রক্তের প্লাটিলেটের শেষ আপডেট জানা যাবে।
